শেয়ারবাজারে পতন, তবু জেড ক্যাটাগরির ৮ শেয়ারে বড় উত্থান
একদিকে পুঞ্জীভূত লোকসান, অন্যদিকে বছরের পর বছর লভ্যাংশ না দেওয়ার ইতিহাস। এমন আর্থিক অবস্থার মধ্যেও শেয়ারবাজারে দরবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে একাধিক জেড ক্যাটাগরির কোম্পানি। বিদায়ী সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ও লেনদেন কমার পাশাপাশি বাজার মূলধন থেকে হারিয়েছে প্রায় ৭ হাজার ১১১ কোটি টাকা। অথচ এই পতনের বাজারেই সাপ্তাহিক দরবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে আটটি ছিল দুর্বল মৌলভিত্তির জেড ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠান।
এই তালিকায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে লিব্রা ইনফিউশনস লিমিটেড। মাত্র এক সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ৯৭ টাকা ৩০ পয়সা। একই তালিকায় রয়েছে প্রিমিয়ার লিজিং ফাইন্যান্স, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানির কয়েকটির আর্থিক ও লভ্যাংশের তথ্যেও রয়েছে ভিন্ন চিত্র।
বাজারের সার্বিক চিত্রের সঙ্গে মিলছে না আট কোম্পানির উত্থান
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে বিনিয়োগকারীদের জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি ছিল নেতিবাচক। প্রধান সূচকের পতনের পাশাপাশি কমেছে লেনদেন। বাজার মূলধনও কমেছে প্রায় ৭ হাজার ১১১ কোটি টাকা। অনেক মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারদর হারানোর কারণে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের চাপ বেড়েছে।
তবে এই পরিস্থিতিতে দরবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকা বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে আটটি প্রতিষ্ঠানই জেড ক্যাটাগরির। কোম্পানিগুলো হচ্ছে লিব্রা ইনফিউশনস, প্রিমিয়ার লিজিং ফাইন্যান্স, মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ, হামিদ ফেব্রিক্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, প্রাইম ফাইন্যান্স, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি (কেপিসিএল) এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)।
লিব্রা ইনফিউশনসের শেয়ারে এক সপ্তাহে প্রায় ১০০ টাকার উত্থান
দরবৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা লিব্রা ইনফিউশনসের শেয়ারদর এক সপ্তাহে ১৯.৩৭ শতাংশ বেড়েছে। টাকার অঙ্কে এই বৃদ্ধি ৯৭ টাকা ৩০ পয়সা। ফলে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি দাম দাঁড়িয়েছে ৫৯৯ টাকা ৬০ পয়সায়। গত এক মাসের মধ্যে এই দাম সর্বোচ্চ।
তবে কোম্পানিটির আর্থিক কাঠামোর দিকে তাকালে পাওয়া যায় ভিন্ন ধরনের তথ্য। ১৯৯৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ২ কোটি ২৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বিপরীতে রিজার্ভ রয়েছে ১৮৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ বিরতি রয়েছে কোম্পানিটির। ২০২১ সালে সর্বশেষ ৩০ শতাংশ নগদ ও ৫০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এরপর আর কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে এর মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও ১১২.৪৩ পয়েন্ট।
এতসব তথ্যের মধ্যে শেয়ারদরের সাম্প্রতিক উত্থান বিশেষভাবে নজরে এসেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এমন উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধির পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রিমিয়ার লিজিং: লোকসান ১ হাজার ৪৫৭ কোটি, শেয়ারদর ২ টাকা
জেড ক্যাটাগরির আলোচিত আরেক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার লিজিং ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড। বিদায়ী সপ্তাহে এর শেয়ারপ্রতি দাম ৩০ পয়সা বেড়েছে। ১৭.৬৫ শতাংশ বৃদ্ধির পর শেয়ারটির মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ টাকায়, যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০০৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১৩২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। কিন্তু এর পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকা।
লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ ঘোষণা বেশ পুরোনো। ২০১৫ সালে বিনিয়োগকারীদের ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি। এরপর থেকে আর কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি।
মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের দাম বেড়েছে ৪ টাকা ৩০ পয়সা
দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকার চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সপ্তাহের শুরু ও শেষের দামের ব্যবধান অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মূল্য বেড়েছে ৪ টাকা ৩০ পয়সা। শতাংশের হিসাবে উত্থান ১৬.৪৮ শতাংশ। এতে শেয়ারটির দাম পৌঁছেছে ৩০ টাকা ৪০ পয়সায়, যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০০০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বর্তমানে কোম্পানিটির রিজার্ভের পরিমাণ ৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ সর্বশেষ ২০২০ সালে ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে আর কোনো লভ্যাংশ দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
বাকি পাঁচ কোম্পানির দরবৃদ্ধি ১০ থেকে ১৩ শতাংশের বেশি
শীর্ষ ১০-এর মধ্যে থাকা অন্য পাঁচটি কোম্পানির শেয়ারেও বিদায়ী সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে। শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে হামিদ ফেব্রিক্সের দর। কোম্পানিটির শেয়ারদর বৃদ্ধির পরিমাণ ১৩.২৭ শতাংশ।
এ ছাড়া পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের শেয়ারদর বেড়েছে ১২.৫০ শতাংশ। প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ক্ষেত্রে এই হার ১২ শতাংশ।
অন্যদিকে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ারদর ১১.১১ শতাংশ এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির দর ১০.৯৮ শতাংশ বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের নজরে কেন এই দরবৃদ্ধি?
এক সপ্তাহে জেড ক্যাটাগরির আটটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়ার বিষয়টি সামগ্রিক বাজারের প্রবণতার সঙ্গে পুরোপুরি বিপরীত। কারণ একই সময়ে ডিএসইর সূচক, লেনদেন ও বাজার মূলধন—তিনটি সূচকেই পতন হয়েছে।
বিশেষ করে লিব্রা ইনফিউশনসের শেয়ারদর ১৯.৩৭ শতাংশ বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০২১ সালে লভ্যাংশ দিয়েছে। এর পিই রেশিও ১১২.৪৩ পয়েন্ট। আবার প্রিমিয়ার লিজিংয়ের পুঞ্জীভূত লোকসান ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকা। এসব তথ্যের সঙ্গে শেয়ারদরের উত্থানের চিত্র মিলিয়ে দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, বাজারের সামগ্রিক দরপতনের মধ্যেও জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর এমন উত্থান বিদায়ী সপ্তাহের শেয়ারবাজারে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বিশেষ করে লিব্রা ইনফিউশনসের দরবৃদ্ধির পেছনের কারণ অনুসন্ধানের বিষয়টি বাজারসংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
FAQ
১. বিদায়ী সপ্তাহে দরবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে কতটি জেড ক্যাটাগরির?
১০টি কোম্পানির মধ্যে ৮টি জেড ক্যাটাগরির।
২. লিব্রা ইনফিউশনসের শেয়ারদর কত টাকা বেড়েছে?
এক সপ্তাহে ৯৭ টাকা ৩০ পয়সা বা ১৯.৩৭ শতাংশ বেড়েছে।
৩. প্রিমিয়ার লিজিংয়ের পুঞ্জীভূত লোকসান কত?
কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকা।
৪. মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর কত হয়েছে?
১৬.৪৮ শতাংশ বৃদ্ধির পর শেয়ারটির দাম দাঁড়িয়েছে ৩০ টাকা ৪০ পয়সায়।
৫. বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কত কমেছে?
প্রায় ৭ হাজার ১১১ কোটি টাকা কমেছে।
তানভির ইসলাম/