ওয়ারিশি জমি নিজের নামে নিতে কী করবেন? জানুন নিয়ম
পরিবারের কোনো সদস্য মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া জমির মালিকানা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আইন অনুযায়ী বণ্টিত হয়। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে জমির অংশ পাওয়ার পর শুধু ওয়ারিশ হলেই সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নাম যুক্ত হয়ে যায় না। এ জন্য প্রথমে সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয় ও প্রাপ্য অংশ নিশ্চিত করতে হবে, জমির কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে এবং এরপর নামজারির উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় জানা বিশেষভাবে জরুরি। ওয়ারিশদের মধ্যে জমির ভাগ-বাটোয়ারা না হলেও বর্তমানে সবার নামে যৌথ নামজারি করার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, আলাদা বণ্টননামা ছাড়াই মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম তাঁদের আইনগত হিস্যা অনুযায়ী একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
তাই উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর কোন কাজটি আগে করবেন, কীভাবে ওয়ারিশদের অংশ নির্ধারণ করবেন এবং কখন নামজারি বা বণ্টননামা করতে হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
প্রথম কাজ: সব বৈধ ওয়ারিশের তালিকা তৈরি করুন
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর প্রথমেই মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশ কারা, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পরিবারের যাঁরা বর্তমানে জমির দেখাশোনা করছেন, তাঁদের নাম লিখলেই হবে না। উত্তরাধিকার আইনে যাঁরা অংশ পাওয়ার অধিকারী, তাঁদের সবাইকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এ জন্য মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাবা-মাসহ অন্য উত্তরাধিকারীদের পরিচয় ও সম্পর্ক যাচাই করতে হবে। কোনো ওয়ারিশ আগে মারা গিয়ে থাকলে তাঁর উত্তরাধিকারীদের বিষয়টিও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে।
সব ওয়ারিশের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ঠিকানা এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের তথ্য এক জায়গায় লিখে রাখুন। এতে পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশ সনদ তৈরি এবং নামজারির আবেদন করতে সুবিধা হবে।
দ্বিতীয় কাজ: মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করুন
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করা উচিত। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ নিতে হবে।
ওয়ারিশ সনদে মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশের নাম ও প্রয়োজনীয় পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কি না, তা যাচাই করুন। কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে বা ভুল থাকলে নামজারির আবেদন নিষ্পত্তিতে সমস্যা হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ওয়ারিশ সনদ উত্তরাধিকারীদের পরিচয় ও সম্পর্কের তথ্য দেয়; এটি নিজে থেকে জমির চূড়ান্ত বণ্টননামা নয়। প্রত্যেকের আইনগত অংশ নির্ধারণ করতে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত প্রযোজ্য আইন অনুসরণ করতে হবে।
তৃতীয় কাজ: জমির মালিকানা ও কাগজপত্র যাচাই করুন
ওয়ারিশদের তালিকা তৈরির পর মৃত ব্যক্তির নামে থাকা জমির প্রকৃত পরিমাণ ও মালিকানা যাচাই করা জরুরি। অনেক সময় পরিবারের ধারণার চেয়ে সরকারি রেকর্ডে জমির পরিমাণ বা দাগের তথ্য ভিন্ন থাকতে পারে।
এ জন্য সংগ্রহে রাখুন—
মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা।
জমির মূল দলিল অথবা সার্টিফায়েড কপি।
আগের মালিকানার দলিল বা বায়া দলিল, যদি প্রয়োজন হয়।
জমির দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণের তথ্য।
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদ।
ওয়ারিশদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
আদালতের কোনো রায় বা ডিক্রি থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র।
জমির রেকর্ড, দলিল ও দাগ নম্বরের মধ্যে কোনো অমিল আছে কি না, তা আগে থেকেই পরীক্ষা করা ভালো। কারণ জমির মালিকানা বা পরিমাণ নিয়ে অসংগতি থাকলে নামজারির সময় অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
চতুর্থ কাজ: ওয়ারিশদের অংশ আইন অনুযায়ী নির্ধারণ করুন
সব ওয়ারিশের নাম জানার পর কে কতটুকু জমি পাবেন, তা নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মৌখিক সিদ্ধান্ত বা প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ধর্ম ও প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী হিস্যা নির্ধারিত হয়। ফলে সব পরিবারের জন্য একই ভাগের নিয়ম প্রযোজ্য নয়। মৃত ব্যক্তির জীবিত উত্তরাধিকারী কারা, তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করে অংশ হিসাব করতে হবে।
হিস্যা নিয়ে দ্বিমত থাকলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। ভুল হিস্যা ধরে জমির বণ্টন বা নামজারির আবেদন করলে পরবর্তী সময়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
পঞ্চম কাজ: যৌথ নামজারি করবেন, নাকি জমি ভাগ করে আলাদা খতিয়ান নেবেন?
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে নামজারি করার আগে ওয়ারিশদের মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি—সবাই যৌথ মালিক হিসেবে একই খতিয়ানে থাকবেন, নাকি জমি ভাগ করে আলাদা খতিয়ান করবেন।
বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে দুটি পথ রয়েছে।
১. জমি ভাগ না করে যৌথ নামজারি
ওয়ারিশরা যদি এখনই জমি ভাগ করতে না চান, তাহলে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে উল্লেখ করে যৌথ নামজারির আবেদন করতে পারবেন। প্রত্যেকের আইনগত হিস্যা অনুযায়ী একই খতিয়ানে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে।
এ ক্ষেত্রে আলাদা বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন নেই। শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করার কথা নয়। তবে আবেদনে সব ওয়ারিশের তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে হবে।
২. জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান
ওয়ারিশরা যদি নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট অংশ বুঝে নিতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে। এই দলিলে কার ভাগে কোন জমি পড়েছে, তা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতিতে নিবন্ধন করতে হয়।
এরপর নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারি ও খতিয়ানের আবেদন করা যায়।
অর্থাৎ, জমি ভাগ না করেও যৌথ নামজারি সম্ভব; কিন্তু আলাদা আলাদা খতিয়ান পেতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা গুরুত্বপূর্ণ।
ষষ্ঠ কাজ: অনলাইনে নামজারির আবেদন করুন
ওয়ারিশদের পরিচয়, জমির কাগজপত্র ও প্রাপ্য হিস্যা নিশ্চিত করার পর ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে আবেদন করা যায়।
আবেদনের জন্য mutation.land.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। এরপর—
১. নামজারি আবেদনের অপশন নির্বাচন করুন।
২. আবেদনকারী ও জমির প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করুন।
৩. মৃত ব্যক্তির জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা ও জমির পরিমাণের তথ্য দিন।
৪. উত্তরাধিকার সূত্রে আবেদন করার ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের তথ্য এবং ওয়ারিশ সনদ সংযুক্ত করুন।
৫. প্রয়োজনীয় দলিল, খতিয়ান, দাখিলা ও অন্যান্য প্রমাণক আপলোড করুন।
৬. নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে আবেদন জমা দিন।
৭. আবেদন নম্বর বা রসিদ সংরক্ষণ করুন, যাতে পরবর্তী সময়ে আবেদনের অবস্থা যাচাই করা যায়।
আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কাগজপত্র যাচাই করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত, শুনানি ও অন্যান্য কার্যক্রম শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
নামজারি হওয়ার পর কী করবেন?
নামজারির আবেদন অনুমোদিত হলে নতুন খতিয়ান প্রস্তুত ও পরবর্তী প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এরপর নামজারি খতিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট রসিদ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করুন।
পাশাপাশি নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন করের হিসাব হালনাগাদ হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন। জমির রেকর্ড, দাগ নম্বর ও প্রাপ্য অংশে কোনো ভুল থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
নামজারি হয়ে গেলেই জমি নিয়ে সব ধরনের বিরোধের অবসান হয় না। মালিকানা, উত্তরাধিকার বা বণ্টন নিয়ে বিরোধ থাকলে তা আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর যেসব ভুল করবেন না
জমির মালিকানা নিয়ে ভবিষ্যতে জটিলতা এড়াতে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে এককভাবে পুরো জমির নামজারির চেষ্টা করবেন না।
ওয়ারিশ সনদে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম আছে কি না, যাচাই না করে আবেদন করবেন না।
আইনগত হিস্যা নির্ধারণ না করে জমি ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না।
নিবন্ধিত বণ্টননামা ছাড়া আলাদা খতিয়ান পাওয়ার প্রত্যাশা করবেন না।
জমির দাগ, খতিয়ান ও পরিমাণ যাচাই না করে কোনো দলিলে স্বাক্ষর করবেন না।
জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে জোর করে দখল বা একতরফা বণ্টনের পথে না গিয়ে আইনগত পরামর্শ নিন।
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সব বৈধ ওয়ারিশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জমির সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করা। তাই প্রথমে ওয়ারিশদের তালিকা ও সনদ প্রস্তুত করুন, জমির দলিল-খতিয়ান যাচাই করুন এবং আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের হিস্যা নির্ধারণ করুন। এরপর পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যৌথ নামজারি অথবা নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে পৃথক নামজারির পথে এগোন।
শুরুতেই সঠিক নিয়ম অনুসরণ করলে ভবিষ্যতে জমির মালিকানা, কর পরিশোধ ও বণ্টন নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
প্রাসঙ্গিক FAQ
১. উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার পর প্রথমে কী করতে হবে?
প্রথমে মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশের তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করে জমির দলিল, খতিয়ান এবং মালিকানার তথ্য যাচাই করতে হবে।
২. ওয়ারিশি জমির নামজারি করতে কি বণ্টননামা লাগে?
সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করতে বণ্টননামা প্রয়োজন নেই। তবে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
৩. একজন ওয়ারিশ কি অন্যদের বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারি করতে পারবেন?
না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারিতে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম ও তাঁদের আইনগত হিস্যা উল্লেখ করতে হয়। একজনের নামে অন্যদের অংশ অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।
৪. ওয়ারিশ সনদ কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে?
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করা যায়।
৫. ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ নিয়ে বিরোধ থাকলে কী করবেন?
প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। সমঝোতা না হলে জমির কাগজপত্র নিয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে আদালতের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
আল-মামুন/