ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

Alamin Islam

Senior Reporter

শবে বরাতে যা করবেন আর যা করবেন না: জেনে নিন সঠিক আমলগুলো

ধর্ম ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৩ ১৬:৩৪:০৪
শবে বরাতে যা করবেন আর যা করবেন না: জেনে নিন সঠিক আমলগুলো

হিজরি বর্ষপঞ্জির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ রজনী ‘নিসফা মিন শাবান’ বা শবে বরাত আমাদের সামনে সমাগত। এটি মূলত ক্ষমা, তওবা এবং আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ মুহূর্ত। মুসলিম উম্মাহর বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং অগণিত মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন।

ঐশী বাণীর আলোকে শবে বরাতের গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন, যখন শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত উপস্থিত হয়, তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং পরদিন রোজা রাখো। সূর্যাস্তের পর মহান রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত বান্দাদের উদ্দেশে ঘোষণা করতে থাকেন— ‘কে আছ ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কে আছ রিজিকপ্রার্থী? আমি তাকে প্রাচুর্য দেব। কে আছ বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে মুক্তি দেব।’ (ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮)।

তবে এই রাতে ক্ষমা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু শর্ত রয়েছে। সহিহ ইবনে হিব্বানের (৫৬৬৫) বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা এই রাতে সবাইকে ক্ষমা করলেও ‘মুশরিক’ (শিরককারী) এবং ‘মুশাহিন’ (বিদ্বেষ পোষণকারী) ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না।

ইবাদতের বসন্ত: শবে বরাতে আপনার করণীয়

এই পুণ্যময় রাতকে অর্থবহ করে তুলতে আপনি নিচের আমলগুলো পালন করতে পারেন:

ঐকান্তিক তওবা: বছরের জানা-অজানা সব পাপের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ করা এই রাতের প্রধান কাজ। ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় শপথই হলো প্রকৃত তওবা।

নফল ইবাদত: নির্দিষ্ট কোনো রাকাত সংখ্যা নেই, বরং সামর্থ্য অনুযায়ী দীর্ঘ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে নফল নামাজ আদায় করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

কুরআনের সান্নিধ্য: অন্তরের প্রশান্তি ও ইমানি শক্তি বৃদ্ধির জন্য অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত এই রাতের অন্যতম সেরা আমল হতে পারে।

মুনাজাত ও প্রার্থনা: নিজের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ, মৃত স্বজনদের মাগফিরাত এবং মুসলিম উম্মাহর শান্তির জন্য দীর্ঘ সময় নিয়ে দোয়া করা।

কবর জিয়ারত: প্রিয় নবী (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছিলেন। সেই সুন্নাহ অনুসরণে মৃত আত্মীয়দের রুহের মাগফিরাত কামনা করা উচিত।

পরদিন রোজা পালন: শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোজা রাখা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত, যা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

পবিত্রতা রক্ষায় বর্জনীয় বিষয়সমূহ

শবে বরাতের মতো একটি ইবাদতের রাত যেন উৎসবে পরিণত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। পটকা ফোটানো, আতশবাজি বা ফানুস ওড়ানোর মতো কাজগুলো এই রাতের গাম্ভীর্য নষ্ট করে। এছাড়া অহেতুক আড্ডা কিংবা ভিত্তিহীন কোনো প্রথা বা কুসংস্কারে লিপ্ত হওয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখা ইমানের দাবি।

পরম করুণাময়ের নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ হলো শবে বরাত। আত্মসমালোচনা ও নিভৃত ইবাদতের মাধ্যমে এই রাতকে কাজে লাগাতে পারলে তা আমাদের পরকালীন পাথেয় হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক আমল করার তাওফিক দান করুন।

শবে বরাত নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. শবে বরাত বা নিসফা মিন শাবান বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: শাবান মাসের ১৫তম রাতকে ইসলামি পরিভাষায় ‘নিসফা মিন শাবান’ এবং ফারসি ভাষায় ‘শবে বরাত’ বলা হয়। এটি মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি রাত, যে রাতে মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন।

২. শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে কী বলা হয়েছে?

উত্তর: হাদিসে এসেছে, এই রাতে সূর্যাস্তের পর মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ক্ষমা, রিজিক ও রোগমুক্তির জন্য ডাকতে থাকেন। এছাড়া আল্লাহ এই রাতে মুশরিক ও অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।

৩. এই রাতে কত রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়?

উত্তর: শবে বরাত উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো রাকাত বা বিশেষ নিয়মের নফল নামাজ বাধ্যতামূলক নয়। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খুশু-খুজুর সঙ্গে দুই রাকাত করে নফল নামাজ আদায় করা উত্তম।

৪. শবে বরাতে রোজা রাখার নিয়ম কী?

উত্তর: শবে বরাতের পরদিন অর্থাৎ শাবান মাসের ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন এবং প্রতি মাসের ১৫ তারিখেও রোজা রাখতেন, যা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।

৫. এই রাতে কাদের ক্ষমা করা হয় না?

উত্তর: সহিহ ইবনে হিব্বানের হাদিস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ শবে বরাতের রাতে মুশরিক (আল্লাহর সাথে শরিককারী) এবং মুশাহিন (অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী) ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।

৬. শবে বরাতে কি কবর জিয়ারত করা সুন্নাহ?

উত্তর: হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। তাই এই রাতে মৃত আত্মীয়-স্বজনদের মাগফিরাত কামনায় কবর জিয়ারত করা বা ঘরে বসে দোয়া করা একটি উত্তম আমল।

৭. শবে বরাতে কোন কাজগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত?

উত্তর: এই রাতে আতশবাজি ফোটানো, ফানুস ওড়ানো, অনর্থক আড্ডা দেওয়া এবং সকল প্রকার বিদআত বা ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ এগুলো ইবাদতের পবিত্রতা নষ্ট করে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ