জরিমানা থেকে অব্যাহতি চেয়ে বিএসইসির কাছে প্রাইম ফাইন্যান্স
দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের মধ্যে থাকা প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সামনে এবার যুক্ত হয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ১ কোটি ৪০ লাখ ৪৫ হাজার টাকার জরিমানা। এই অর্থের দায় থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ওই আবেদনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জানা যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার দুর্বলতার চিত্র শেয়ারবাজারের তথ্যেও রয়েছে। বর্তমানে প্রাইম ফাইন্যান্স ডিএসইর ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ২০১৯ অর্থবছরের পর থেকে কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি কোম্পানিটি। ২০২৩ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা। আবার ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৮৫ পয়সা।
সর্বশেষ তথ্যে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ঋণাত্মক ৩৯ পয়সা। সর্বশেষ লেনদেনে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ২ টাকা ৯০ পয়সা।
মালিকানার বড় অংশ স্পনসর-পরিচালকদের হাতে
আগস্ট ২০২৬-এর মালিকানা তথ্য অনুযায়ী, প্রাইম ফাইন্যান্সের মোট শেয়ারের ৫৯ দশমিক ১৪ শতাংশ রয়েছে স্পনসর ও পরিচালকদের কাছে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩৬ শতাংশ শেয়ার। অবশিষ্ট শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক দুরবস্থার পেছনে উচ্চ খেলাপি ঋণ, বড় ধরনের ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান এবং মূলধন ঘাটতির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো তুলে ধরেছে। আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে সক্ষমতা এবং মূলধন পরিস্থিতি নিয়েও কোম্পানিটি চাপে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রাইম ফাইন্যান্সও রয়েছে।
জরিমানার কারণ ছিল আর্থিক প্রতিবেদন জমায় দেরি
এই আর্থিক বাস্তবতার মধ্যেই নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক বিবরণী জমা দিতে না পারায় ডিএসইর জরিমানার মুখে পড়ে কোম্পানিটি।
ডিএসই সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণী, ২০২৩ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী এবং ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণী নির্ধারিত সময়ে জমা দিতে পারেনি প্রাইম ফাইন্যান্স।
এর পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির ওপর ১ কোটি ৪০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ।
এফআইসিএলের প্রতিবেদন না পাওয়াকে দায়ী করছে প্রতিষ্ঠান
জরিমানাটি মওকুফের জন্য বিএসইসির কাছে করা আবেদনে প্রাইম ফাইন্যান্স নিজেদের অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ বা এফআইসিএল থেকে পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং ‘কুইক সামারি’ পেতে সময় লেগেছিল। এই বিলম্বের কারণে নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে ২০২১-২২ ও ২০২৩ সালের এজিএম সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু আগের সময়ের তৈরি হওয়া জটিলতা পরবর্তী পর্যায়ের আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার কাজেও প্রভাব ফেলে বলে আবেদনে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাইম ফাইন্যান্সের দাবি, আর্থিক বিবরণী নির্ধারিত সময়ে জমা দিতে না পারার পেছনে এফআইসিএলের পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পাওয়ার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কাজ করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিলম্ব কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত ছিল না।
বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে জরিমানা মওকুফের আবেদন করেছেন প্রাইম ফাইন্যান্সের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
অর্থাৎ ডিএসইর আরোপ করা জরিমানার দায় থেকে অব্যাহতি পেতে এখন বিএসইসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাভেদ লাকিয়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এখন বিএসইসির পর্যালোচনার পর জরিমানাটি মওকুফ করা হবে, নাকি এ বিষয়ে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—সেদিকেই নজর রয়েছে।
তানভির ইসলাম/