শেখ হাসিনা এখন কোথায়, দেশে ফেরার পথে কী বাধা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার অধ্যায় এখন এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর টানা প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়েন তিনি এবং দেশ ত্যাগ করে ভারতে অবস্থান নেন। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে; ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। একই সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলার রায়, ভারতে অবস্থান এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত আনার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
শেখ হাসিনা কে
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ১৯৯৬ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর তিনি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানা সরকার পরিচালনা করেন।
তার দুই দফার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কাল ছিল ১৯৯৬–২০০১ এবং ২০০৯–২০২৪। ২০০৯ সালের পর তিনি টানা চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
রাজনীতিতে উত্থান
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে না পারলেও শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা হন। এরপর ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
প্রথম মেয়াদে তার সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অর্জনের মধ্যে ছিল ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। তবে সেই সরকারের মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়।
২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট বড় জয় পাওয়ার পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও তিনি সরকার গঠন করেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, যার মধ্যে চারবার ছিল টানা।
তার দ্বিতীয় দীর্ঘ মেয়াদের শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সময়ে বিরোধী দল দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বাচন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনাও তৈরি হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের ওপর বিধিনিষেধের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছিল।
২০২৪ সালের আন্দোলন ও ক্ষমতার পরিবর্তন
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুত বড় রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনা বাড়তে থাকে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। একই প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের শক্তিশালী ইঙ্গিতের কথাও বলা হয়।
পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। এরপর তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে যান। তার দেশত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলুপ্ত করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বর্তমানে কোথায় শেখ হাসিনা?
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। তার অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হলেও ভারত সরকার তাকে নিয়ে অনুমানভিত্তিক মন্তব্য এড়িয়ে এসেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া তার নিজের বিষয় বলে জানিয়েছিল।
২০২৬ সালেও তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে। ভারত ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আবারও জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও বলেছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার কী অবস্থা?
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। ১৭ নভেম্বর ২০২৫ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না; ভারতে অবস্থানরত অবস্থায় অনুপস্থিতিতে এই রায় দেওয়া হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলাটিতে আদালত তাকে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার জন্য দায়ী সাব্যস্ত করে। শেখ হাসিনা অবশ্য রায় প্রত্যাখ্যান করে আদালতকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রায় এবং শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয় দুটি আলাদা আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। ট্রাইব্যুনালের রায় থাকলেও তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। ফলে তাকে দেশে ফেরাতে ভারতের সহযোগিতা বা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রত্যর্পণ নিয়ে এখন কী হচ্ছে?
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুরোধটি তাদের কাছে রয়েছে এবং আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরও বলেছেন, ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করা হলে তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি প্রযোজ্য হবে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত ভারতের নিজস্ব আইনি ব্যবস্থার বিষয়।
অর্থাৎ, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে সর্বশেষ প্রকাশ্য অবস্থান হলো—বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নির্বাচন, মানবাধিকার এবং বিরোধী মত দমনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানও ব্যাপকভাবে বদলে যায়। এরপর ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভূমিকা এখন আর শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; তার শাসনকাল, ২০২৪ সালের ক্ষমতার পরিবর্তন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শেখ হাসিনা নিয়ে FAQ
১. শেখ হাসিনা এখন কোথায়?
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ছাড়ার পর ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারত সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাওয়া তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ এখনো পরীক্ষা করা হচ্ছে।
২. শেখ হাসিনা কবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন?
তিনি প্রথমবার ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। পরে ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
৩. শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কী রায় হয়েছে?
১৭ নভেম্বর ২০২৫ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি অনুপস্থিত অবস্থায় এই রায়ের মুখোমুখি হন।
৪. বাংলাদেশ কি শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে?
হ্যাঁ। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ করেছে। ভারত জানিয়েছে, অনুরোধটি আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
৫. ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী কে?
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তানভির ইসলাম/