ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

সেপ্টেম্বরে হঠাৎ বদলে গেল বিদেশিদের শেয়ার কেনাবেচা

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৭ ১৯:৫২:১৪
সেপ্টেম্বরে হঠাৎ বদলে গেল বিদেশিদের শেয়ার কেনাবেচা

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণে এবার পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দীর্ঘ সময় ধরে শেয়ার বিক্রি ও অর্থ প্রত্যাহারের প্রবণতা দেখা গেলেও সেপ্টেম্বরের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। মাসের প্রথম ২৪ কার্যদিবসের হিসাবে নয়, ১ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যে মোট ১৬ কার্যদিবসের তথ্য বলছে—বিদেশিরা বিক্রির চেয়ে শেয়ার কিনেছেন বেশি। ফলে ওই সময়েই তাদের নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) হিসাবে, সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। একই সময়ে তারা বিক্রি করেছেন প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ১৬ কার্যদিবসের ১৩ দিনেই বিক্রির তুলনায় কেনার পরিমাণ বেশি ছিল।

বিদেশিদের এই পরিবর্তিত অবস্থানের পেছনে বাজার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, আইপিও সংক্রান্ত বিধিমালা সংস্কারের উদ্যোগ, মার্জিন রুলস সহজ করার পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী সংস্থা এমএসসিআইয়ের নিয়মিত পর্যালোচনায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত—এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় পরিবর্তন আসছে বলে তাদের মত।

লেনদেনের পরিসরেও ফিরেছে গতি

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তার পরিবর্তন শুধু সেপ্টেম্বরের নিট বিনিয়োগের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের বিভিন্ন মাসের লেনদেনের তথ্যেও এর ওঠানামা স্পষ্ট।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বিদেশিদের মোট লেনদেন মাত্র ৭৩.৯২ কোটি টাকায় নেমে গিয়েছিল। পরের দুই মাসে পরিস্থিতি বদলায়। জুনে তাদের লেনদেন বেড়ে ৫৪০ কোটি টাকা এবং জুলাইয়ে ৫২৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

আগস্টে অবশ্য লেনদেনের পরিমাণ কমে ৩১৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই বিদেশিদের মোট লেনদেন ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

বাজারে আস্থার পরিবর্তনের পেছনে যে উদ্যোগগুলো

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক পর্যায়ের সিদ্ধান্তগুলোও আলোচনায় এসেছে। নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া কয়েকটি ইতিবাচক ও নমনীয় নীতিমালায় বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

বিএসইসি ইতোমধ্যে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেছে। পাশাপাশি ভালো মৌলিক ভিত্তির কোম্পানি এবং বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত করার সুযোগ দিতে নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এর সঙ্গে মার্জিন রুলস আরও সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এসব পরিবর্তনের ফলে বাজারে বিদেশিদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ভিন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এমএসসিআইয়ের সিদ্ধান্তে মিলেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত

আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআইয়ের বাংলাদেশসংক্রান্ত সিদ্ধান্তও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের আলোচনায় এসেছে।

২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ ইনডেক্সের নিয়মিত পর্যালোচনা আবার শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে এমএসসিআই। এর আগে ২০২৩ সালে ফ্লোর প্রাইসসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাংলাদেশকে ‘বিশেষ নজরদারি’-তে রাখা হয়েছিল।

এবার সেই নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

টাকা বিদেশে নেওয়ার প্রক্রিয়ায়ও কমেছে জটিলতা

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শুধু বাজারে প্রবেশের পরিবেশ নয়, বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন এসেছে।

শেয়ার বিক্রি করে পাওয়া অর্থ বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে আগে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হতো। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করেছে।

আরেকটি পরিবর্তন এসেছে প্রয়োজনীয় সনদের ক্ষেত্রে। প্রতিটি লেনদেনের জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্মের সার্টিফিকেট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো সরাসরি কর কেটে অর্থ স্থানান্তর করতে পারবে। এর ফলে প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রক্রিয়াগত সময়—দুই ক্ষেত্রেই চাপ কমেছে।

বিদেশিদের বিনিয়োগ কোথায় বেশি

বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ১৩,০০০ কোটি টাকা। তবে বাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির সবগুলোতে বিদেশিদের অংশগ্রহণ নেই। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র ১৩২টি কোম্পানিতে বিদেশিদের শেয়ারধারণ রয়েছে।

বিদেশি মালিকানার হিসাবে সবচেয়ে বেশি অংশ রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকে—প্রায় ৩৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, যেখানে বিদেশিদের শেয়ারধারণ ২৫ শতাংশের বেশি।

এ ছাড়া বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং রেনাটা লিমিটেডেও বিদেশিদের উল্লেখযোগ্য শেয়ার রয়েছে।

বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব

দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ (সিডিবিএল)-এর হিসাবে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) নামে মোট বিও হিসাব রয়েছে ৪১,৯৩৭টি।

সেপ্টেম্বরের শেয়ার কেনাবেচার প্রবণতা, সাম্প্রতিক মাসগুলোর লেনদেনের পরিবর্তন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত নিয়মে বিভিন্ন সংস্কার—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রমে নতুন করে সক্রিয়তার চিত্র সামনে এসেছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: