ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কী কী লাগে, আবেদন করার আগে জেনে নিন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৩ ১৮:৪৩:০৫
ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কী কী লাগে, আবেদন করার আগে জেনে নিন

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে শুধু গাড়ি চালানো জানলেই হয় না—আবেদন করার আগে শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, জাতীয় পরিচয়পত্র, মেডিকেল সার্টিফিকেট, ঠিকানার প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় ফি প্রস্তুত রাখতে হয়। বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রথম ধাপ হলো লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া। এরপর নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অনলাইন BRTA Service Portal (BSP)-এর মাধ্যমে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং ফি পরিশোধের সুবিধা দিচ্ছে। ফলে আবেদন করার আগে কোন নথি লাগবে, যোগ্যতা কত এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে এগোয়—এসব জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা এড়ানো সম্ভব।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে প্রথমে লার্নার লাইসেন্স

বাংলাদেশে সরাসরি স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায় না। ড্রাইভিং লাইসেন্সের পূর্বশর্ত হিসেবে প্রথমে লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হয়। লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রশিক্ষণ নিয়ে নির্ধারিত সময়ে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। পাশাপাশি ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস এবং আবেদনকারীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে।

এক নজরে যোগ্যতা

লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কী কী লাগে?

বিআরটিএর বর্তমান সিটিজেন চার্টারে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথির কথা বলা হয়েছে। অনলাইনে আবেদন করার সময় এসব কাগজের স্ক্যান কপি প্রস্তুত রাখতে হয়।

প্রধান কাগজপত্রগুলো হলো—

রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট

জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) স্ক্যান কপি

ইউটিলিটি বিলের স্ক্যান কপি—যেমন বিদ্যুৎ, টেলিফোন বা পানির বিল

ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদ বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ

প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বর্তমান ঠিকানার অতিরিক্ত প্রমাণপত্র

নির্ধারিত ফি পরিশোধের ব্যবস্থা

বিআরটিএর সিটিজেন চার্টারে বলা হয়েছে, আবেদনকারীর বর্তমান ঠিকানা ও NID-এর ঠিকানা আলাদা হলে বর্তমান ঠিকানার ইউটিলিটি বিল বা যথাযথ ঠিকানার প্রমাণপত্র সংযুক্ত করতে হবে।

ঠিকানার প্রমাণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অনেক আবেদনকারী শুধু NID থাকলেই আবেদন সম্পন্ন হবে বলে মনে করেন। কিন্তু লার্নার লাইসেন্সের আবেদনে ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য ইউটিলিটি বিল বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য প্রমাণপত্র লাগতে পারে।

বিশেষ করে NID-এর ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা আলাদা হলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমান ঠিকানার ইউটিলিটি বিল অথবা ওয়ার্ড কাউন্সিলর/ইউনিয়ন পরিষদের যথাযথ প্রমাণপত্র দিতে হতে পারে।

অনলাইনে আবেদন কীভাবে করবেন?

ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রাথমিক আবেদন এখন বিআরটিএর সার্ভিস পোর্টাল (BSP) ব্যবহার করে করা যায়। পোর্টালে নিবন্ধন করে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি জমা দিতে হয়।

BSP-তে অ্যাকাউন্ট তৈরির সময় জন্মতারিখ, NID নম্বর ও NID-তে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের তথ্য চাওয়া হয়।

BRTA Service Portal (BSP)

লার্নার লাইসেন্সের ফি কত?

বিআরটিএর প্রকাশিত সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে একটি ক্যাটাগরির জন্য ৫১৮ টাকা এবং নির্দিষ্ট দুই ক্যাটাগরির জন্য ৭৪৮ টাকা ফি উল্লেখ রয়েছে। অনলাইন পেমেন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য গেটওয়ে চার্জ আলাদা হতে পারে।

ফি ও পেমেন্টের পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় BSP-তে প্রদর্শিত বর্তমান ফি যাচাই করে টাকা পরিশোধ করাই নিরাপদ।

লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার পর কী করতে হবে?

লার্নার লাইসেন্স হাতে পাওয়ার পর নির্ধারিত সময় প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এরপর বিআরটিএ নির্ধারিত তারিখ ও কেন্দ্রে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক/ফিল্ড টেস্ট রয়েছে।

পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ক্যাটাগরির চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য BSP অ্যাকাউন্ট থেকে আবেদন ও ফি পরিশোধ করা যায়।

অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কী লাগে?

লার্নার লাইসেন্সের ধাপ এবং দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য চূড়ান্ত আবেদন করা যায়।

বিআরটিএর সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর BSP অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে নির্ধারিত ফি দিয়ে চূড়ান্ত আবেদন করা যায়। বর্তমানে চার্টারে অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর ফি ৪,৬২৮ টাকা উল্লেখ রয়েছে; অনলাইন পেমেন্টের ক্ষেত্রে গেটওয়ে চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে।

পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কী লাগে?

পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য বয়স ও লাইসেন্সের শ্রেণি অনুযায়ী অতিরিক্ত শর্ত রয়েছে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, পেশাদার হালকা লাইসেন্সের জন্য বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। এরপর মধ্যম ও ভারী শ্রেণির লাইসেন্সের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী শ্রেণির লাইসেন্স ব্যবহারের অভিজ্ঞতার শর্ত রয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমান বিআরটিএ সিটিজেন চার্টারে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর সময় ডোপ টেস্ট সনদ সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পেশাদার লাইসেন্সের জন্য চার্টারে ২,৮৩৮ টাকা ফি উল্লেখ রয়েছে।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার আগে যে বিষয়গুলো দেখবেন

আবেদন জমা দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করে নেওয়া জরুরি—

১. NID-এর তথ্য ঠিক আছে কি না: নাম, জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য ভুল থাকলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে।

২. ঠিকানার তথ্য মিলছে কি না: NID ও বর্তমান ঠিকানা আলাদা হলে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখুন।

৩. শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ আছে কি না: কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদ বা সমমানের প্রমাণপত্র প্রয়োজন।

৪. মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রস্তুত আছে কি না: রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের দেওয়া নির্ধারিত মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগবে।

৫. সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন: মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার বা হালকা মোটরযানের মতো ক্যাটাগরি অনুযায়ী আবেদন করতে হবে।

৬. ফি দেওয়ার আগে পরিমাণ যাচাই: সরকারি ফি পরিবর্তিত হতে পারে, তাই BSP-তে দেখানো বর্তমান ফি দেখে পেমেন্ট করা উচিত।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত সময় লাগে?

লার্নার লাইসেন্সের আবেদন অনলাইনে জমা দেওয়ার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করা যায়। তাই পুরো প্রক্রিয়াকে শুধু একটি অনলাইন আবেদন হিসেবে দেখলে হবে না; লার্নার লাইসেন্স → প্রশিক্ষণ → দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা → চূড়ান্ত লাইসেন্স—এই ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হয়।

বিআরটিএর সিটিজেন চার্টারে ই-ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সেবা সময়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে পরীক্ষার তারিখ, অনুমোদন ও কার্ড/ডেলিভারির সময় আলাদা হতে পারে।

আবেদনকারীদের জন্য শেষ মুহূর্তের চেকলিস্ট

ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার আগে একবার দেখে নিন—

বয়স যোগ্যতার মধ্যে আছে কি না

অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের শিক্ষাগত সনদ আছে কি না

NID প্রস্তুত আছে কি না

রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের মেডিকেল সার্টিফিকেট আছে কি না

প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি বিল বা ঠিকানার প্রমাণ আছে কি না

BSP অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে কি না

সঠিক লাইসেন্স ক্যাটাগরি নির্বাচন করা হয়েছে কি না

বর্তমান সরকারি ফি যাচাই করে পেমেন্ট করা হয়েছে কি না

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরোনো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে ফি কিংবা কাগজপত্রের তালিকা অনুসরণ না করে আবেদন করার সময় বিআরটিএর সর্বশেষ নির্দেশনা ও BSP-তে প্রদর্শিত তথ্য যাচাই করা। কারণ ফি, প্রক্রিয়া বা প্রয়োজনীয় নথির বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা পরিবর্তিত হতে পারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (BRTA) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে সর্বনিম্ন বয়স কত?

অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ২১ বছর।

২. ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কতটুকু পড়াশোনা লাগবে?

বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস বা সমমান।

৩. লার্নার লাইসেন্স ছাড়া কি সরাসরি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়?

না। লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার পূর্বশর্ত। এরপর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার ধাপ রয়েছে।

৪. ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন কি অনলাইনে করা যায়?

হ্যাঁ। বিআরটিএর Service Portal বা BSP-এর মাধ্যমে লার্নার লাইসেন্সের আবেদন, প্রয়োজনীয় নথি জমা এবং অনলাইন ফি পরিশোধের সুবিধা রয়েছে।

৫. ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগে?

হ্যাঁ। লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনের জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে রয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: