ঢাকা, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ঘিরে পাঁচ বছরের সেই আইনি লড়াই

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৪ ২১:৩৬:০৩
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ঘিরে পাঁচ বছরের সেই আইনি লড়াই

একটি মামলায় আট দফা জামিনের লড়াই, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা, সম্পদ আটকে থাকা এবং বছরের পর বছর আদালতের চক্কর—তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জীবনের ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়টা কেটেছে এমনই এক কঠিন বাস্তবতায়। তাঁকে কারাগারে পাঠানোর হুমকিও এসেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই হুমকি বাস্তবায়িত হয়নি; মামলাও বাতিল হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের অর্থও পরে আনফ্রিজ হয়েছে। কিন্তু আইনি লড়াই শেষ হলেও পাঁচ বছরে তৈরি হওয়া মানসিক চাপের ক্ষত কি এত সহজে শেষ হয়? তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর পর তাঁর আইনজীবী নোমান হোসাইন তালুকদারের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই প্রশ্নই।

আদালতের বাইরে যে লড়াই দেখা যায় না

কোনো মামলা মানেই শুধু আদালতে গিয়ে শুনানি করা নয়—তৌফিকের মামলাগুলো পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে এমনটাই তুলে ধরেছেন নোমান। প্রতিটি ধাপে নিতে হয়েছে আলাদা প্রস্তুতি। কোন আদালতে কখন যেতে হবে, কখন কী আবেদন করা হবে, কোন পর্যায়ে কী আইনি কৌশল নেওয়া দরকার—সবকিছুই আগে থেকে ঠিক করতে হয়েছে।

তৌফিকের ব্রিফ নেওয়া থেকে শুনানির প্রস্তুতি, পুরো আইনজীবী দলের সমন্বয়, কোন দিন কোন সিনিয়র আইনজীবী থাকবেন এবং শুনানির কোন অংশে কে বক্তব্য দেবেন—প্রতিটি বিষয় পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হয়েছে।

এই পুরো কাজের সমন্বয় করেছে এনএইচ তালুকদার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস।

দীর্ঘ প্রস্তুতির পর কোনো শুনানিতে স্বস্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালত থেকে বের হওয়ার অনুভূতি যেমন ছিল, তেমনি পরবর্তী লড়াই আরও কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কাও ছিল কখনও কখনও।

শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে

এই মামলার দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনাটিও ছিল নোমানের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা। তাঁর বড় ভাই সুলাইমান নিলয় একদিন তাঁকে ফোন করে দেখা করতে বলেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে সুলাইমান নিলয় জ্যেষ্ঠ আইন প্রতিবেদক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকতা করেছেন এবং পরে প্রতিষ্ঠানটির মাল্টিমিডিয়া বিভাগের প্রধান হন।

তাঁর পরিচিত অনেক সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন। তৌফিক ভাইয়ের মামলাটি নিয়ে তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথাও হয়েছিল। কিন্তু কেউ তখনই মামলা নিতে সম্মতি দেননি। কেউ আবার কিছুটা সময় নিয়ে পরে জানিয়ে দেন, তাঁরা মামলাটি নিতে পারবেন না।

এরপর নোমানের সামনে সরাসরি প্রশ্ন রাখা হয়—ঝুঁকি জেনেও তিনি কি এই মামলা পরিচালনা করতে চান?

তাঁর উত্তর ছিল দ্বিধাহীন। তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে তিনি নির্ভীক সাংবাদিকতার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে দেখতেন। সেই কারণে তাঁর পাশে দাঁড়ানোকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে হয়েছিল।

পরে অবশ্য বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি কতটা কঠিন পথে নিয়ে যাবে তাঁকে।

অভিযোগের ধরন নিয়েও ছিল প্রশ্ন

২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তৌফিকের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। শেয়ার বিক্রির টাকা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ আনে দুদক। পরে মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়ও আসে। পাশাপাশি বিভিন্ন দিক থেকে মানহানির অভিযোগও ওঠে।

তবে নোমানের কাছে মামলাগুলোর কিছু বিষয় বিশেষভাবে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলার এজাহারেই সম্পত্তির উৎসের কথা উল্লেখ করা ছিল। তাহলে সেই সম্পত্তি কীভাবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত হলো—আদালতে এমন প্রশ্ন তোলা হয়।

এ ছাড়া অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই তৌফিকের বিরুদ্ধে ওই মামলা করা হয়েছিল বলেও আইনি প্রশ্ন সামনে আনা হয়।

গ্রেপ্তারের হুমকিও এসেছিল

আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি তৌফিককে হয়রানি করা হবে—এমন হুমকিও এসেছিল বলে স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন নোমান। সংশ্লিষ্ট একজন তাঁকে একদিনের জন্য হলেও কারাগারে পাঠানোর কথা বলেছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি মামলায় তৌফিকের জামিন নিশ্চিত করতে সক্ষম হন তাঁরা।

প্রথমবার গ্রেপ্তারের হুমকির প্রেক্ষাপটে আগাম জামিন নেওয়া হয় হাইকোর্ট বিভাগ থেকে। এরপর সেই জামিন বাতিলের আবেদন নিয়ে আপিল বিভাগে যায় দুদক।

নোমানের বর্ণনায়, শুনানির এক পর্যায়ে আপিল বিভাগের বেঞ্চ দুদকের আইনজীবীকে আদালতের সময় নষ্ট না করার বিষয়ে সতর্ক করেন। একইভাবে চলতে থাকলে কস্ট ইমপোজ করার কথাও আদালত থেকে বলা হয়েছিল।

শুধু এক মামলাতেই আটবার আদালতে

তৌফিকের জামিন নিয়ে এখানেই বিষয়টি থামেনি। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত—দুই জায়গাতেই তাঁর জামিন বাতিলের চেষ্টা হয়েছে একাধিকবার।

একটি দুদক মামলাকে কেন্দ্র করেই আটটি পর্যায়ে জামিনের জন্য আদালতে যেতে হয়েছে বলে জানান নোমান।

তাঁর কাছে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর ছিল এ কারণে যে, তৌফিক পালিয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তি ছিলেন না। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে বারবার জামিনের প্রশ্ন তৈরি হওয়াটাই নোমানের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।

আইনি জয় এল, কিন্তু সময় ফিরল না

দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তৌফিককে কারাগারে যেতে হয়নি। সংশ্লিষ্ট মামলাটিও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়। যে বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে এত জটিলতা তৈরি হয়েছিল, সেটিও পরে আনফ্রিজ করা হয়।

আইনের বিচারে এখানেই মামলার অধ্যায় শেষ। কিন্তু নোমানের প্রশ্ন অন্য জায়গায়।

পাঁচ বছর ধরে একজন মানুষকে যে মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে, তার হিসাব কী? মামলা, আদালতে হাজিরা, গ্রেপ্তারের ভয়, বারবার জামিনের প্রস্তুতি এবং সম্পদ আটকে থাকার উদ্বেগ—এসবের প্রভাব কি শুধু মামলা শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়ে যায়?

তৌফিকের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজের সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার কাজের পাশাপাশি আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।

চাপ ছিল বিডিনিউজের কর্মীদের ওপরও

নোমানের মতে, পরিস্থিতির প্রভাব শুধু তৌফিকের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কর্মীরাও এই সময়ের ভোগান্তির মধ্যে ছিলেন।

একটি সংবাদমাধ্যমের বিনিয়োগ আটকে গেলে এবং মালিকানা ও সম্পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব নিউজরুমে পৌঁছানো স্বাভাবিক—এমনটাই উঠে এসেছে তাঁর স্মৃতিচারণে। সাংবাদিক, সম্পাদক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কোনো না কোনোভাবে সেই চাপের মুখোমুখি হয়েছেন।

তাই পাঁচ বছর পর শুধু মামলা শেষ হওয়ার হিসাব করলেই কি সবকিছুর হিসাব শেষ হয়ে যায়—এই প্রশ্নও রেখেছেন নোমান।

আদালতের সম্পর্ক পেরিয়ে ব্যক্তিগত আড্ডা

মামলাগুলোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকায় তৌফিকের সঙ্গে নোমানের দীর্ঘ সময় কেটেছে। আদালতের কাজ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তাঁদের কথাবার্তা চলে গেছে অনেক দূর।

সাংবাদিকতা, রাজনীতি, রাষ্ট্র ও ইতিহাস—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁদের আলোচনা হয়েছে। সেই সময়েই নোমান খুব কাছ থেকে দেখেছেন তৌফিকের মেধা, চিন্তার গভীরতা, আদর্শ, রসবোধ ও স্মার্টনেস।

তাঁর মূল্যায়ন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তৌফিকের সমকক্ষ কেউ আবার আসবেন কি না, তিনি জানেন না।

একটি কথাই আজও মনে আছে

তৌফিকের সঙ্গে হওয়া অসংখ্য কথোপকথনের মধ্যে একটি বাক্য নোমানের মনে বিশেষভাবে রয়ে গেছে। একদিন নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তৌফিক তাঁকে বলেছিলেন, “নোমান, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে, এটা আমার দুঃখ নয়। দুঃখ হলো, যখন মিথ্যা মামলা হয়েছে, তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ।”

কথাটি আজও তাঁর মনে আছে বলে জানিয়েছেন নোমান।

তৌফিকের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে গত কয়েকদিনে অনেকেই লিখছেন। তাঁর কাজ, অবদান এবং স্মৃতিচারণ সামনে আসছে। তবে নোমানের কাছে সেই স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে আরেকটি সময়—যখন বছরের পর বছর আইনি লড়াইয়ের মধ্যে থাকা তৌফিকের পাশে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যায়নি।

সাংবাদিকতার জায়গা থেকে সরে যাননি

তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ঘিরে মতপার্থক্য থাকার সুযোগ রয়েছে। তাঁর সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিয়েও কারও ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু নোমানের কাছে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল একজন সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করা।

মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং মুক্তচিন্তার পক্ষে নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে তিনি কখনও দ্বিধা করেননি। ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেও নিজের ঘোষিত সম্পাদকীয় আদর্শ ও নীতি থেকে তিনি সরে যাননি বলে মনে করেন নোমান।

তাঁর আরও মনে হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের পর আওয়ামী লীগ তাদের অনেক প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারও একটি বড় পরিণতি দেখা গেছে।

স্মৃতিতে থেকে যাবেন তৌফিক

নোমানের কাছে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন না শুধুই একজন মক্কেল। আদালতের বারান্দায় তাঁর সঙ্গে আইনি লড়াই নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিকতা ও বাংলাদেশ নিয়েও আড্ডা হয়েছে।

আজ সেই মানুষটি নেই। কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান এবং তাঁকে কাছ থেকে দেখা মানুষের স্মৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার ইতিহাসে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জায়গা থেকে যাবে।

তাঁর আইনজীবীর স্মৃতিতে পাঁচ বছরের সেই লড়াই তাই শুধু কয়েকটি মামলার বিবরণ নয়; এটি একজন সাংবাদিকের ওপর দীর্ঘ আইনি চাপ, একজন আইনজীবীর পেশাগত লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের স্মৃতিকে ধরে রাখার গল্প।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ