ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্রাজিলের ভোটে ফ্লাভিওর চমক, দ্বিতীয় দফায় লুলার মুখোমুখি

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৫:০৮:৪০
ব্রাজিলের ভোটে ফ্লাভিওর চমক, দ্বিতীয় দফায় লুলার মুখোমুখি

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি তিনি। ফলে আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার মুখোমুখি হবেন ফ্লাভিও।

ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ রোববার নিশ্চিত করেছে, প্রথম দফায় প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেউ অর্জন করতে না পারায় লুলা ও ফ্লাভিওই দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার সময় ফ্লাভিওর ভোট ছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ, আর লুলার ছিল ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

এবারের নির্বাচন শুধু ব্রাজিলের ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্নেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের মধ্যেই ভোট হয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ডানপন্থীদের উত্থানের প্রেক্ষাপটেও ব্রাজিলের নির্বাচন বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

২৫ অক্টোবর আবার লুলা-বলসোনারো লড়াই

প্রথম দফায় প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার হিসাবে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন প্রায় ৪৭ শতাংশ বৈধ ভোট। লুলার পক্ষে পড়েছে ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে প্রথম দফায় প্রয়োজন ছিল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট। সেই সীমায় কেউ পৌঁছাতে না পারায় দ্বিতীয় দফার ভোটের পথ তৈরি হয়েছে।

ফলে চার বছর আগের নির্বাচনের পর আবারও বলসোনারো পরিবারের একজন প্রার্থীকে লুলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো নন, তার বড় ছেলে ফ্লাভিও।

প্রথম দফার অন্য ১০ প্রার্থীর ভোটও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ তাদের সমর্থকদের একটি অংশ দ্বিতীয় দফায় কোন প্রার্থীকে সমর্থন করবেন, সেটিই পরবর্তী লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোনালদো কাইয়াদো ও রেনান সান্তোস মিলে প্রথম দফায় প্রায় ৫৩ লাখ ভোট পেয়েছেন। তারা আগে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফায় কোনো প্রার্থীকেই সমর্থন করবেন না।

জরিপকে পেছনে ফেলেছেন ফ্লাভিও

প্রথম দফার আগে প্রকাশিত বেশির ভাগ জরিপেই ধারণা করা হয়েছিল, লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে দ্বিতীয় দফার লড়াই হবে। তবে জরিপগুলোর অনেকটিতে লুলাকে প্রথম দফায় এগিয়ে রাখা হয়েছিল।

ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, সেই চিত্র পুরোপুরি মেলেনি। বরং ফ্লাভিও প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে প্রথম দফায় এগিয়ে গেছেন।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জরিপগুলো কেন ফ্লাভিওর সমর্থনকে কম করে দেখেছিল।

রোববার ফল প্রকাশের পর ফ্লাভিও বলেন, এই ফলাফল দেখিয়েছে যে ব্রাজিলের মানুষ পরিবর্তন চায়।

রয়টার্সকে দেওয়া বিশ্লেষণে রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাফায়েল ফাভেত্তি বলেন, ফ্লাভিও হয়তো এমন কিছু ‘প্রতিবাদী ভোট’ পেয়েছেন, যেসব ভোটার অন্য প্রার্থীকে পছন্দ করলেও লুলাকে হারানোকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেছেন। আগে ধারণা করা হয়েছিল, দ্বিতীয় দফায় এই ভোটারদের একটি অংশ ফ্লাভিওর দিকে যেতে পারে।

ফাভেত্তির মতে, এই ভোট দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য চিত্রের একটি ইঙ্গিত দিলেও ফ্লাভিওর সমর্থনের যে অংশ দ্বিতীয় দফার আগেই চলে এসেছে, তার কারণে পরবর্তী পর্যায়ে নতুন সমর্থন বাড়ানোর সুযোগ কমে যেতে পারে।

ফলাফলকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বললেন লুলা

প্রথম দফার ফল ঘোষণার পর লুলা স্বীকার করেন, ফলাফল তার প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। তবে দ্বিতীয় দফায় আরও শক্তভাবে ফিরে আসার কথা জানান তিনি।

৮০ বছর বয়সী লুলা বলেন, তিনি মনে করেছিলেন প্রথম দফাতেই জয় পাবেন। এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং দ্বিতীয় দফায় ব্রাজিলের জনগণের সমর্থন পাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

লুলা এবার নিজের রাজনৈতিক জীবনে চতুর্থবারের মতো, তবে পরপর নয়, প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় পাঁচ দশকজুড়ে বিস্তৃত।

অন্যদিকে ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বড় ছেলে। বাবার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ডানপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনকে আবারও ক্ষমতায় নেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন।

শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, কংগ্রেসেও ডানপন্থীদের উত্থান

প্রথম দফায় ফ্লাভিওর ফলাফলই একমাত্র বিষয় নয়; কংগ্রেসের নির্বাচনেও ডানপন্থী দলগুলোর শক্ত অবস্থান দেখা গেছে।

ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি বা PL চেম্বার অব ডেপুটিজে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসার পথে রয়েছে এবং সিনেটেও আসন বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি আইনসভাতেও বলসোনারো-সমর্থিত রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বলসোনারো পরিবারের আরও সদস্য নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। সাবেক ফার্স্ট লেডি এবং ফ্লাভিওর সৎমা মিশেল বলসোনারো ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। এটি তার প্রথম নির্বাচিত রাজনৈতিক পদ।

ফ্লাভিওর ভাই কার্লোস বলসোনারোও সান্তা ক্যাটারিনা থেকে সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন।

জাইর বলসোনারো নির্বাচনে নেই, তবু তার রাজনৈতিক প্রভাব রয়ে গেছে

সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে তিনি ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

তার অনুপস্থিতিতেও প্রথম দফা ও কংগ্রেস নির্বাচনের ফলাফলে তার রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। বলসোনারো-সমর্থিত এই রাজনৈতিক ধারাকে ‘bolsonarista’ নামে উল্লেখ করা হয়।

লুলাকে নিয়ে বইয়ের লেখক ও লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক আন্দ্রে পাগলিয়ারিনি আল জাজিরাকে বলেন, আইনসভায় ডানপন্থী প্রার্থীদের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল বলসোনারো-সমর্থিত রাজনৈতিক প্রকল্পের জনভিত্তি নিয়ে নতুন করে ভাবার কারণ তৈরি করেছে।

তার মতে, বিপুলসংখ্যক ব্রাজিলিয়ান এখনো দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ডানপন্থী রাজনীতিকে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করছেন।

দ্বিতীয় দফায় কংগ্রেসের সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি কংগ্রেসের শক্তির ভারসাম্যও পরবর্তী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইতোমধ্যেই কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের প্রাধান্য রয়েছে। সেখানে ডানপন্থী শক্তি আরও বাড়লে লুলা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরলেও তার রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে নিজের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনসভার এই সমীকরণ থেকে সুবিধা পেতে পারেন। এর মধ্যে তার বাবার জন্য সাধারণ ক্ষমা চাওয়ার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

এখন নজর দ্বিতীয় দফার ভোটে

প্রথম দফার ফল ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইকে আরও এক ধাপে নিয়ে গেছে। আগামী ২৫ অক্টোবর লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে হবে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

প্রথম দফায় যারা অন্য প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন, তাদের অবস্থান তাই এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কংগ্রেসে ডানপন্থীদের শক্তিশালী অবস্থানও দ্বিতীয় দফার পর ব্রাজিলের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থাৎ প্রথম দফার ভোটে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আগামী ২৫ অক্টোবরের লড়াইয়ের আগে ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত: