ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম নিয়ে নতুন গবেষণায় বড় প্রশ্ন

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৬ ১৯:৩৯:১০
পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম নিয়ে নতুন গবেষণায় বড় প্রশ্ন

পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা ঘটাতে ধূমকেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের এই ধারণার ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে নতুন গবেষণা। গবেষকদের কম্পিউটার বিশ্লেষণ বলছে, প্রাচীন পৃথিবীতে ধূমকেতু আছড়ে পড়ার সময় তৈরি হওয়া প্রচণ্ড তাপ ও চাপে প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় জৈব অণু নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে মহাকাশ থেকে আসা এসব বস্তু পৃথিবীতে প্রাণের রাসায়নিক উপাদান পৌঁছে দিয়েছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক রিচার্ড আনস্লো। তাঁর দলের গবেষণার ফল বুধবার প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে।

গবেষণায় আদি পৃথিবীতে ধূমকেতুর সংঘর্ষের পরিস্থিতি পুনর্গঠন করে দেখা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ৪ বিলিয়ন বছরেরও বেশি আগে ১০০ মিটারের চেয়ে বড় ১ লাখেরও বেশি ধূমকেতু পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল। এত বিপুল সংখ্যক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও প্রাণের উপযোগী জৈব উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুব কম ছিল বলে উঠে এসেছে নতুন বিশ্লেষণে।

১০ হাজার পরীক্ষায় মিলল না সফলতার প্রমাণ

ধূমকেতুর আঘাত প্রাণ সৃষ্টির উপাদান সরবরাহে কতটা কার্যকর হতে পারত, তা যাচাই করতে গবেষকেরা আদি পৃথিবীর পরিবেশের ওপর ১০ হাজারটি কম্পিউটার সিমুলেশন চালান। এসব পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে গড়ে কোনো সফল সংঘর্ষের ঘটনাই পাওয়া যায়নি।

রিচার্ড আনস্লোর ব্যাখ্যা, ধূমকেতুগুলো পৃথিবীতে আছড়ে পড়ত অত্যন্ত উচ্চ গতিতে। সেই সংঘর্ষের শক্তি এত বেশি ছিল যে, সেগুলোর বহন করা জৈব অণু অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকার সুযোগ প্রায় ছিল না। এ কারণে প্রাণের উৎপত্তির আগে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ধূমকেতুর অবদান এতটা কার্যকর ছিল—আগের সেই ধারণা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরির উপাদানও টিকতে পারত না

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হাইড্রোজেন সায়ানাইড। অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরিতে সহায়তাকারী এই অণু প্রাণের উৎপত্তি-সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। হ্যালির ধূমকেতু ও হেল-বপ ধূমকেতুতেও এর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছিল।

ধূমকেতুর মাধ্যমে পৃথিবীতে হাইড্রোজেন সায়ানাইড পৌঁছানোর সম্ভাবনা তাই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় ছিল। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সংঘর্ষের সময় উৎপন্ন অতিরিক্ত তাপ ও চাপের কারণে এই অণুগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ধূমকেতুতে উপাদানটির উপস্থিতি থাকলেও তা পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির কাজে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় পৌঁছেছিল কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রাণের উপাদান তৈরির বিকল্প ব্যাখ্যা

ধূমকেতু থেকে জৈব অণু আসার সম্ভাবনা কমে গেলেও প্রাণের উৎপত্তির ব্যাখ্যা হিসেবে অন্য দুটি পথ বিবেচনায় রয়েছে।

প্রথমটি হলো, প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় অণুগুলো আদি পৃথিবীর পরিবেশেই তৈরি হয়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি গ্রহাণুকে ঘিরে। ধূমকেতুর তুলনায় গ্রহাণু কম গতিতে পৃথিবীতে আঘাত করায় সেগুলোর বহন করা রাসায়নিক উপাদান ধ্বংস না হয়ে টিকে থাকার সুযোগ বেশি থাকতে পারে।

এই ব্যাখ্যার পক্ষে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে এসেছে ‘বেনু’ ও ‘রিউগু’ গ্রহাণু। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই গ্রহাণুর নমুনা পরীক্ষা করে প্রোটিন তৈরিতে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া গেছে।

পৃথিবীর চেয়ে মঙ্গলে আলাদা পরিস্থিতি ছিল?

গবেষণার ফল শুধু পৃথিবীর প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না, মঙ্গলের অতীত সম্পর্কেও নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রিচার্ড আনস্লোর মতে, মঙ্গলের ভর কম এবং সূর্য থেকে দূরে অবস্থানের কারণে সেখানে ধূমকেতুর আঘাতের গতি পৃথিবীর তুলনায় কম ছিল।

এই পার্থক্যের কারণে পৃথিবীতে সংঘর্ষের সময় যে হাইড্রোজেন সায়ানাইড অণু নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা, মঙ্গলে সেগুলো হয়তো অক্ষত থাকতে পেরেছিল। এমন সম্ভাবনা সত্য হলে লাল গ্রহে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই গবেষণায় নতুন প্রশ্ন যুক্ত হবে।

ধূমকেতুকে পুরোপুরি বাদ দিতে নারাজ বিজ্ঞানীরা

নতুন গবেষণার ফল নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন অন্য কয়েকজন বিজ্ঞানী। লন্ডনের রয়াল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কুইনি চ্যান মনে করেন, ধূমকেতুর উপাদান পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগেই অন্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। সেই প্রক্রিয়ায় এগুলো এমন জৈব যৌগে পরিণত হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে, যা পরবর্তী সংঘর্ষেও টিকে থাকবে।

অ্যালবিয়ন কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিকোল জেলনারও ধূমকেতুর ভূমিকা একেবারে বাতিল করার পক্ষে নন। তাঁর মতে, নতুন গবেষণায় ধূমকেতুর অবদান নিয়ে একটি যুক্তিসংগত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফলে পৃথিবীতে প্রাণের সূচনায় ধূমকেতুর ভূমিকা ছিল কি না, সেই বিতর্কের অবসান ঘটেনি। তবে নতুন সিমুলেশন দেখিয়েছে, শুধু ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জৈব অণু পৃথিবীতে পৌঁছানোর ব্যাখ্যা আগের মতো সহজভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

FAQ

১. নতুন গবেষণায় পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে কী দাবি করা হয়েছে?

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাচীন পৃথিবীতে ধূমকেতুর সংঘর্ষের সময় অতিরিক্ত তাপ ও চাপে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব অণু ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

২. গবেষকেরা কতবার কম্পিউটার সিমুলেশন করেছেন?

আদি পৃথিবীর পরিবেশ পুনর্গঠন করে ১০ হাজারবার সিমুলেশন চালানো হয়েছে। এতে গড়ে কোনো সফল সংঘর্ষের ঘটনা পাওয়া যায়নি।

৩. হাইড্রোজেন সায়ানাইডের ভূমিকা কী?

এই অণু অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরিতে সহায়তা করে। হ্যালির ধূমকেতু ও হেল-বপ ধূমকেতুতেও এটি পাওয়া গিয়েছিল।

৪. গ্রহাণু কি প্রাণের উপাদান পৃথিবীতে পৌঁছে দিতে পারে?

এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। ‘বেনু’ ও ‘রিউগু’ গ্রহাণুর নমুনায় প্রোটিন তৈরির অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া গেছে।

৫. মঙ্গলে প্রাণের উপাদান টিকে থাকার সম্ভাবনা কেন?

মঙ্গলে ধূমকেতুর আঘাতের গতি পৃথিবীর তুলনায় কম ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সংঘর্ষের সময় হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো অণু সেখানে টিকে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো নিশ্চিত প্রমাণ নয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ