ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

আয়কর রিটার্নে ৫% ছাড়, কারা পেলেন এই সুবিধা?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৮:৩৫:২৮
আয়কর রিটার্নে ৫% ছাড়, কারা পেলেন এই সুবিধা?

আয়কর রিটার্ন জমায় করদাতাদের আগ্রহ বাড়াতে সরকারের দেওয়া বিশেষ ছাড়ে মিলেছে উল্লেখযোগ্য সাড়া। ২০২৬-২৭ করবর্ষের প্রথম তিন মাসে ব্যক্তিশ্রেণির ১২ লাখ ৫৩ হাজার করদাতা আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৭ শতাংশ বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে প্রায় ৩ লাখ করদাতা পেয়েছেন কর ছাড়ের সুবিধা।

সরকারের এই উদ্যোগে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ছাড় পাওয়ার সুযোগ ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, আর্থিক সুবিধার এই সুযোগই অনেককে শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে আগেভাগে রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত করেছে।

তিন মাসে রিটার্ন জমা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে

এনবিআরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কাছ থেকে ৭ লাখ ৯ হাজার আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছিল। চলতি করবর্ষের একই সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২ লাখ ৫৩ হাজার।

এক বছরের ব্যবধানে রিটার্ন জমার এই বৃদ্ধি করদাতাদের সময়মতো করসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার প্রবণতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কর কর্মকর্তাদের মতে, আগে অনেকেই নির্ধারিত সময়সীমার শেষ দিকে রিটার্ন জমা দিতেন। এবার কর ছাড়ের সুযোগ থাকায় তুলনামূলক আগে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে আর্থিক সুবিধা যুক্ত হওয়ায় করদাতারা সময়সীমা মেনে চলার বিষয়ে আরও আগ্রহী হয়েছেন। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রথম তিন মাসের রিটার্ন জমার পরিসংখ্যানে।

প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ছাড়

এবারের প্রণোদনায় যোগ্য করদাতারা প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে একজন করদাতার ক্ষেত্রে এই সুবিধার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। এনবিআর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩ লাখ করদাতা এই সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

ছাড়ের অর্থ করদাতার মোট কর দায়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা তাঁদের প্রদেয় করের হিসাবেই এই সুবিধা পেয়েছেন।

সরকারের এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো করদাতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমায় উৎসাহিত করা। কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সময়মতো কর পরিশোধের অভ্যাস গড়ে তুলতেও সহায়ক হতে পারে।

নির্ধারিত সময় পেরোলে পাওয়া যাবে না কর ছাড়

কর ছাড়ের সুবিধাটি নির্দিষ্ট সময়সীমার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে না পারা করদাতারা এই প্রণোদনার আওতায় পড়বেন না। একইভাবে, ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়া রিটার্নের ক্ষেত্রেও এই ছাড় প্রযোজ্য হবে না।

অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে কর ছাড় পাওয়ার সুযোগ শেষ হওয়ার পরবর্তী সময়ে করদাতাদের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিধান রয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেরিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ দুই ধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৭ সালে দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানা কত

নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অর্থ জরিমানা হিসেবে দিতে হবে।

অন্যদিকে, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানার অঙ্ক বাড়বে। এ ক্ষেত্রে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার মাধ্যমে কর ছাড় পাওয়ার সুযোগ থাকলেও পরে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতাকে জরিমানার আর্থিক দায় বহন করতে হবে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও পেয়েছেন কর ছাড়ের সুবিধা

সরকারের এই প্রণোদনা ক্ষুদ্র করদাতাদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসমাইল ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে ২০ হাজার টাকা কর দায়ের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার টাকা ছাড় পেয়েছেন।

ইসমাইল জানিয়েছেন, সরকারের এই সুবিধা তাঁকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত করেছে। তাঁর মতে, ছাড়ের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও সময়মতো কর পরিশোধে আগ্রহ তৈরির জন্য উদ্যোগটি ইতিবাচক।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র করদাতাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সুবিধা কর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়াতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

দীর্ঘমেয়াদে কর দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর ছাড়ের মতো আর্থিক প্রণোদনা স্বল্পমেয়াদে আয়কর রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে করদাতাদের নিয়মিত রিটার্ন জমায় অভ্যস্ত করতে হলে শুধু সাময়িক সুবিধা যথেষ্ট নয়।

এ জন্য করদাতাদের রিটার্ন জমার প্রক্রিয়া সহজ করা, কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

সরকারের লক্ষ্য কেবল বেশি সংখ্যক আয়কর রিটার্ন সংগ্রহ করা নয়; সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। চলতি করবর্ষের প্রথম তিন মাসে রিটার্ন জমার ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সেই প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে এই ইতিবাচক প্রবণতা ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে করদাতাদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. ২০২৬-২৭ করবর্ষের প্রথম তিন মাসে কতজন আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন?

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ লাখ ৫৩ হাজার ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা রিটার্ন জমা দিয়েছেন।

২. আয়কর রিটার্ন জমা কত শতাংশ বেড়েছে?

আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রিটার্ন জমার সংখ্যা ৭৭ শতাংশ বেড়েছে।

৩. কর ছাড়ের সুবিধা কতজন পেয়েছেন?

এনবিআর সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৩ লাখ করদাতা এই সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

৪. আয়কর রিটার্ন জমা দিলে সর্বোচ্চ কত টাকা ছাড় পাওয়া যায়?

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া যোগ্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা প্রদেয় করের ওপর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ, সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

৫. ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে জুনে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানা কত?

১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: