ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

আপনার নামে কত জমি আছে, কোথায় কোথায় আছে—অনলাইনে জানবেন যেভাবে

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১০ ১২:৫০:১৪
আপনার নামে কত জমি আছে, কোথায় কোথায় আছে—অনলাইনে জানবেন যেভাবে

বাংলাদেশে নিজের নামে কতটুকু জমি রয়েছে, কোন মৌজায় জমি আছে কিংবা পুরোনো জমির রেকর্ডে নিজের নাম রয়েছে কি না—এসব তথ্য এখন ঘরে বসেই অনলাইনে যাচাই করা সম্ভব। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে মালিকের নাম, জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বরের মতো তথ্য ব্যবহার করে জমির রেকর্ড খোঁজা যায়। পাশাপাশি ভূমি উন্নয়ন করের অনলাইন সেবায় নিবন্ধিত খতিয়ান ও হোল্ডিংয়ের তথ্যও যাচাই করা সম্ভব।

তবে নিজের নাম লিখে একবারেই দেশের সব জেলায় থাকা জমির সম্পূর্ণ তালিকা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। জমির রেকর্ড কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার তথ্য অনলাইনে আছে কি না এবং মালিকানার রেকর্ড হালনাগাদ হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর অনুসন্ধানের ফল নির্ভর করে। তাই নিজের নামে জমির পরিমাণ ও অবস্থান জানতে কয়েকটি সরকারি সেবা ব্যবহার করে তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

নিজের নামে জমি আছে কি না, অনলাইনে দেখবেন যেভাবে

জমির রেকর্ড খোঁজার জন্য প্রথমেই ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অনলাইন খতিয়ান অনুসন্ধান সেবা ব্যবহার করতে পারেন। এ জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

ধাপ ১: সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে অনলাইন খতিয়ান অনুসন্ধান ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। এটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি সেবা।

ধাপ ২: জমির এলাকার তথ্য নির্বাচন করুন

ওয়েবসাইটে বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা থানা, জরিপ এবং মৌজার তথ্য নির্বাচন করুন। জমি কোন এলাকায় রয়েছে, তা জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হবে। পুরোনো দলিল বা খতিয়ান থাকলে সেখান থেকে মৌজা ও দাগ নম্বর সংগ্রহ করতে পারেন।

ধাপ ৩: মালিকের নাম দিয়ে খতিয়ান খুঁজুন

অনুসন্ধান ফর্মে মালিকের নাম লিখুন। প্রয়োজন অনুযায়ী পিতা বা মাতার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, বর্তমান বা সাবেক খতিয়ান নম্বর এবং দাগ নম্বর দিয়েও অনুসন্ধান করা যায়। কোন তথ্যগুলো প্রয়োজন, তা ফর্মের নির্দেশনা অনুযায়ী পূরণ করুন।

ধাপ ৪: অনুসন্ধানের ফলাফল যাচাই করুন

অনুসন্ধানে কোনো খতিয়ান পাওয়া গেলে সেখানে প্রদর্শিত মালিকের নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং অন্যান্য তথ্য নিজের কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন। তাই শুধু নামের মিল দেখে কোনো জমিকে নিজের বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

ধাপ ৫: প্রয়োজন হলে খতিয়ান সংগ্রহ করুন

রেকর্ডের বিস্তারিত তথ্য বা সরকারি খতিয়ানের কপি প্রয়োজন হলে ওয়েবসাইটে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করুন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি দিয়ে অনলাইনে খতিয়ানের জন্য আবেদন করা যায়।

আমার নামে কোথায় কোথায় জমি আছে, জানবেন যেভাবে

একাধিক জেলা বা উপজেলায় জমি থাকলে একটি এলাকার তথ্য অনুসন্ধান করেই সব জমির খোঁজ পাওয়া নাও যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিটি এলাকার রেকর্ড আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

এ জন্য তিনটি সরকারি সেবা কাজে লাগতে পারে।

১. ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর

ওয়েবসাইট:https://settlement.gov.bd/

এখানে সংশ্লিষ্ট এলাকার খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়। তবে সব এলাকার সব ধরনের রেকর্ড একইভাবে অনলাইনে পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। চলমান জরিপের কিছু রেকর্ড খসড়া হতে পারে।

২. ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল

ওয়েবসাইট:https://land.gov.bd/

ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল থেকে ভূমি রেকর্ড, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর এবং অন্যান্য ভূমিসেবা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। নিজের জমির রেকর্ড যাচাই করতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সেবায় প্রবেশ করুন।

৩. অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর সেবা

ওয়েবসাইট:https://ldtax.gov.bd/

এই সেবায় নিবন্ধিত প্রোফাইলের সঙ্গে যুক্ত খতিয়ান ও হোল্ডিংয়ের তথ্য যাচাই করা যায়। নিবন্ধনের জন্য সচল মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ এবং দাখিলা বা খারিজ খতিয়ানের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, ভূমি উন্নয়ন করের প্রোফাইলে যে জমির তথ্য রয়েছে, সেটিই আপনার নামে থাকা সব জমির সম্পূর্ণ তালিকা—এমন নয়। অন্য এলাকায় থাকা জমি বা প্রোফাইলে যুক্ত না হওয়া রেকর্ড সেখানে অনুপস্থিত থাকতে পারে।

অনলাইনে নিজের নামে মোট কত জমি আছে, হিসাব করবেন কীভাবে?

নিজের নামে মোট জমির পরিমাণ জানতে হলে বিভিন্ন এলাকার রেকর্ড, দলিল ও মালিকানার অংশ একত্র করে হিসাব করতে হবে। এ জন্য প্রথমে নিজের জমির কাগজপত্র সংগ্রহ করুন। এরপর নিচের পদ্ধতি অনুসরণ করুন।

আরও পড়ুন:

জমি কেনার আগে দাগ নম্বর দিয়ে যে তথ্যগুলো যাচাই করবেন

ঘরে বসেই জমির খাজনা দেবেন যেভাবে, জানুন পুরো নিয়ম

ওয়ারিশ সনদ পাওয়ার পর জমির নামজারি করবেন যেভাবে

১. নিজের নামে থাকা জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারির কাগজ, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি এক জায়গায় রাখুন।

২. প্রতিটি জমির জেলা, উপজেলা, মৌজা, খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর আলাদা করে লিখে নিন।

৩. সরকারি খতিয়ান অনুসন্ধান সেবায় সংশ্লিষ্ট এলাকার তথ্য দিয়ে রেকর্ড খুঁজুন।

৪. ভূমি উন্নয়ন করের প্রোফাইলে থাকা খতিয়ান ও হোল্ডিংয়ের তথ্যের সঙ্গে অন্যান্য নথি মিলিয়ে দেখুন।

৫. প্রতিটি জমিতে আপনার মালিকানার অংশ কতটুকু, তা যাচাই করুন। যৌথ মালিকানার জমির পুরো পরিমাণ নিজের জমি হিসেবে গণনা করবেন না।

৬. সব জমির পরিমাণ একই এককে রূপান্তর করে যোগ করুন। যেমন, সব জমির পরিমাণ শতকে হিসাব করলে মোট জমির পরিমাণ বের করা সহজ হবে।

উদাহরণ: কোনো খতিয়ানে মোট ৩০ শতক জমি থাকলেও সেখানে আপনার মালিকানার অংশ যদি এক-তৃতীয়াংশ হয়, তাহলে আপনার অংশ হবে ১০ শতক। অন্য জমিতে আপনার মালিকানার অংশও একইভাবে হিসাব করে যোগ করলে মোট জমির পরিমাণ পাওয়া যাবে।

তবে এই হিসাব নির্ভুল করতে খতিয়ানের তথ্যের পাশাপাশি দলিল, উত্তরাধিকার ও মালিকানার অংশ যাচাই করা প্রয়োজন।

অনলাইনে নিজের নামে জমি না পেলে কী করবেন?

অনলাইনে নিজের নাম লিখে কোনো জমির রেকর্ড না পাওয়া মানেই আপনার নামে জমি নেই—এমন নয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

জমির রেকর্ড এখনো সংশ্লিষ্ট অনলাইন ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

খতিয়ানে নামের বানান বা পিতা-মাতার নামের সঙ্গে বর্তমান পরিচয়পত্রের তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।

জমিটি অন্য মৌজা, উপজেলা বা জেলায় অবস্থিত।

উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলেও রেকর্ড বা নামজারি হালনাগাদ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ড অনলাইনে অনুসন্ধানের জন্য এখনো উপলভ্য নয়।

এমন পরিস্থিতিতে পুরোনো দলিল, খতিয়ান ও দাগ নম্বর ধরে আবার অনুসন্ধান করুন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস বা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে রেকর্ড যাচাই করুন। ভূমিসংক্রান্ত সহায়তার জন্য সরকারি হটলাইন ১৬১২২-এও যোগাযোগ করা যায়।

খতিয়ানে নাম থাকলেই কি জমির মালিকানা নিশ্চিত?

খতিয়ান জমির রেকর্ড যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি। তবে শুধু খতিয়ানে নাম থাকলেই সব পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। জমির দলিল, উত্তরাধিকার, নামজারি, দখল এবং প্রযোজ্য অন্যান্য নথিও প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করতে হয়।

একইভাবে ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা জমিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি হলেও সেটি একাই সব ক্ষেত্রে জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করে না। জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার বণ্টন বা মালিকানা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি মিলিয়ে দেখা জরুরি।

জমির তথ্য যাচাইয়ের সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

নিজের নামে জমির রেকর্ড খোঁজার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।

জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য শুধু সরকারি ওয়েবসাইটে প্রয়োজন অনুযায়ী দিন।

অপরিচিত ব্যক্তি বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে জমির দলিল কিংবা পরিচয়পত্রের তথ্য দেবেন না।

একই নামের একাধিক ব্যক্তির রেকর্ড পাওয়া গেলে পিতা বা মাতার নাম, মৌজা, দাগ ও খতিয়ান নম্বর মিলিয়ে নিশ্চিত হোন।

অনলাইনে পাওয়া খসড়া রেকর্ডকে চূড়ান্ত রেকর্ড ধরে নেবেন না।

জমি কেনাবেচা বা মালিকানা নিয়ে বিরোধের আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করুন।

নিজের নামে কত জমি রয়েছে এবং কোথায় কোথায় জমি আছে, তা জানতে অনলাইনে খতিয়ান অনুসন্ধান দিয়ে শুরু করা যায়। তবে একটি ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে মোট জমির পরিমাণ চূড়ান্ত করা ঠিক নয়। সরকারি খতিয়ান, দলিল, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি মিলিয়ে যাচাই করলেই নিজের জমির হিসাব সম্পর্কে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে কি আমার নামে সব জমি দেখা যাবে?

না। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের পাশাপাশি জেলা, উপজেলা, মৌজা, জরিপ বা খতিয়ানসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। শুধু এনআইডি দিয়ে দেশের সব জমির পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

২. আমার নামে বিভিন্ন জেলায় জমি থাকলে সব একসঙ্গে দেখতে পারব?

সব জমি এক জায়গায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখানোর সুবিধা সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। সম্ভাব্য প্রতিটি এলাকার রেকর্ড আলাদাভাবে অনুসন্ধান করে তথ্য একত্র করতে হতে পারে।

৩. অনলাইনে নিজের নামে জমি না পেলে কি জমি নেই?

না। রেকর্ড ডিজিটাল না হওয়া, নামের বানানগত পার্থক্য কিংবা জরিপের অবস্থার কারণে রেকর্ড না-ও পাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যাচাই করুন।

৪. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি কি অনলাইনে দেখা যায়?

জমির রেকর্ড অনলাইনে উপলভ্য থাকলে দেখা যেতে পারে। তবে মালিকানা ও নিজের অংশ নিশ্চিত করতে উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নামজারি এবং অন্যান্য নথি যাচাই করতে হবে।

৫. জমিসংক্রান্ত সহায়তার জন্য কোথায় যোগাযোগ করব?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি হটলাইন ১৬১২২-এ যোগাযোগ করতে পারেন। সরকারি ভূমি তথ্য পোর্টাল https://land.gov.bd/ থেকেও প্রয়োজনীয় সেবার তথ্য পাওয়া যাবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: