ঢাকা, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে চান? জেনে নিন অনলাইনে আবেদনের নিয়ম

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১০ ২২:৪৩:২৭
ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে চান? জেনে নিন অনলাইনে আবেদনের নিয়ম

বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে এখন ঘরে বসেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভিস পোর্টালে নিবন্ধন, শিক্ষানবিশ বা লার্নার লাইসেন্সের আবেদন এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা যায়। তবে অনলাইনে আবেদন করলেই সরাসরি স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। প্রথমে লার্নার লাইসেন্স নিতে হয়, এরপর নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ও লিখিত, মৌখিক এবং ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ

যাঁরা প্রথমবার মোটরসাইকেল বা গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে চান, তাঁদের জন্য আবেদনের আগে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি সম্পর্কে জানা জরুরি। এসব বিষয়ে ভুল থাকলে আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এই প্রতিবেদনে অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার নিয়ম, লার্নার লাইসেন্সের প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি এবং পরীক্ষার ধাপ সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করবেন কোথায়?

ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করতে বিআরটিএর সরকারি সার্ভিস পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে।

বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (BSP)

লার্নার লাইসেন্স, স্মার্ট কার্ড, নবায়ন ও অন্যান্য সেবা

bsp.brta.gov.bd

সরকারি পোর্টালে প্রবেশ করুন

এই পোর্টালের মাধ্যমে নতুন আবেদনকারী লার্নার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। পাশাপাশি যোগ্যতা অনুযায়ী স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স, নবায়ন ও ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের সেবাও পাওয়া যায়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কী কী যোগ্যতা লাগে?

বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার আগে আবেদনকারীকে নির্ধারিত বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শারীরিক সক্ষমতার শর্ত পূরণ করতে হয়। বিআরটিএর প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণভাবে প্রয়োজনীয় যোগ্যতাগুলো হলো—

অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স: ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর।

পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স: গাড়ির শ্রেণি অনুযায়ী বয়সের শর্ত প্রযোজ্য। পেশাদার হালকা, মধ্যম ও ভারী যানবাহনের জন্য আলাদা শর্ত রয়েছে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা: ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি বা সমমান পাস।

শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা: যানবাহন চালানোর উপযুক্ত শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা থাকতে হবে।

পেশাদার লাইসেন্সের বয়সসীমা ও শ্রেণিভিত্তিক শর্ত সম্পর্কে আবেদন করার আগে বিআরটিএর সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। কারণ বিভিন্ন সরকারি তথ্যপৃষ্ঠায় পেশাদার লাইসেন্সের ন্যূনতম বয়সের তথ্যে পার্থক্য রয়েছে।

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার নিয়ম

ধাপ ১: বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিবন্ধন করুন

প্রথমে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে প্রবেশ করুন। নতুন ব্যবহারকারী হলে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। আগে থেকে অ্যাকাউন্ট থাকলে সেটিতে লগইন করুন।

নিবন্ধনের সময় নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে।

ধাপ ২: লার্নার বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের আবেদন নির্বাচন করুন

লগইন করার পর ড্রাইভিং লাইসেন্স-সংক্রান্ত সেবা থেকে লার্নার লাইসেন্সের আবেদন নির্বাচন করুন। আপনি মোটরসাইকেল, হালকা মোটরযান অথবা একাধিক শ্রেণির যানবাহনের জন্য আবেদন করতে চান, তা নির্ধারণ করুন।

আবেদনের ধরন নির্বাচনের সময় নিজের যোগ্যতা ও প্রয়োজন বিবেচনা করুন।

ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি আপলোড করুন

অনলাইন ফরমে ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে। এরপর পোর্টালে চাওয়া নথিগুলোর স্ক্যান কপি আপলোড করুন।

সাধারণত প্রয়োজন হয়—

জাতীয় পরিচয়পত্রের স্ক্যান কপি।

নিবন্ধিত চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট।

ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদ বা সমমানের প্রমাণপত্র।

বর্তমান ঠিকানা NID-এর ঠিকানা থেকে আলাদা হলে ইউটিলিটি বিল বা গ্রহণযোগ্য ঠিকানার প্রমাণ।

বিদেশি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিটের কপি।

নথি আপলোডের আগে স্ক্যান কপি স্পষ্ট এবং পোর্টালে নির্ধারিত ফাইলের আকারের মধ্যে আছে কি না নিশ্চিত করুন।

ধাপ ৪: আবেদন জমা দিয়ে ফি পরিশোধ করুন

সব তথ্য ও নথি যাচাই করার পর আবেদন জমা দিন। এরপর পোর্টালে প্রদর্শিত নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করুন।

বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে পোর্টালে উল্লেখিত অনুমোদিত ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ফি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পেমেন্টের পর রসিদ সংরক্ষণ করুন।

ধাপ ৫: লার্নার লাইসেন্স সংগ্রহ করুন

আবেদন ও ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষানবিশ লাইসেন্স সংগ্রহ বা প্রিন্ট করুন। লার্নার লাইসেন্সের শর্ত মেনে প্রশিক্ষণ নিন এবং পরবর্তী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিন।

মনে রাখবেন, লার্নার লাইসেন্স চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়। এটি নির্ধারিত নিয়মে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য শিক্ষানবিশ অনুমতি।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?

ড্রাইভিং লাইসেন্সের খরচ নির্ভর করে আপনি এক শ্রেণির নাকি দুই শ্রেণির যানবাহনের জন্য আবেদন করছেন এবং চূড়ান্ত লাইসেন্সটি পেশাদার নাকি অপেশাদার—তার ওপর।

বিআরটিএর প্রকাশিত সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, লার্নার লাইসেন্সের ফি সাধারণভাবে—

এক ক্যাটাগরি: ৫১৮ টাকা। যেমন শুধু মোটরসাইকেল অথবা শুধু হালকা মোটরযান।

দুই ক্যাটাগরি: ৭৪৮ টাকা। যেমন মোটরসাইকেল ও হালকা মোটরযান একসঙ্গে।

এগুলোর সঙ্গে প্রযোজ্য অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে চার্জ যুক্ত হতে পারে।

স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফি কত?

লার্নার লাইসেন্স নেওয়ার পর লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য ফি দিতে হয়। এই ফি লাইসেন্সের ধরন ও প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

বিভিন্ন সরকারি তথ্যপৃষ্ঠায় চূড়ান্ত লাইসেন্সের ফি সম্পর্কে ভিন্ন অঙ্ক প্রকাশিত থাকায় নির্দিষ্ট একটি অঙ্ককে সব আবেদনকারীর জন্য বর্তমান ফি হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক হবে না। আবেদন করার সময় বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের ফি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে নিজের আবেদন অনুযায়ী সর্বশেষ ফি দেখে নিন।

লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার পর কী করতে হবে?

লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে হবে। বিআরটিএর প্রকাশিত নির্দেশনায় সাধারণভাবে দুই থেকে তিন মাস প্রশিক্ষণের পর নির্ধারিত তারিখে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পরীক্ষায় সাধারণত তিনটি বিষয় থাকে—

লিখিত পরীক্ষা: সড়ক পরিবহন আইন, ট্রাফিক সাইন, সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহন চালানোর নিয়ম সম্পর্কে জ্ঞান যাচাই।

মৌখিক পরীক্ষা: ট্রাফিক আইন ও যানবাহন পরিচালনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।

ব্যবহারিক পরীক্ষা: যানবাহন চালানোর দক্ষতা ও সড়ক নিরাপত্তার নিয়ম মানার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।

পরীক্ষার দিন লার্নার লাইসেন্সের মূল কপি এবং বিআরটিএর নির্দেশনায় চাওয়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।

পরীক্ষায় পাস করার পর স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স পাবেন যেভাবে

লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিজের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে প্রযোজ্য স্মার্ট কার্ড আবেদনের ধাপ অনুসরণ করুন।

এরপর নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত, যেমন পুলিশি তদন্ত বা প্রযোজ্য ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন লাগতে পারে।

সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স অথবা স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করা যাবে। স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের সময় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার সময় সতর্কতা

আবেদন করার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

NID অনুযায়ী নাম, জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য লিখুন।

ঠিকানার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হলে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখুন।

চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট সঠিকভাবে আপলোড করুন।

ফি পরিশোধের রসিদ এবং আবেদনসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করুন।

পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত হন।

দালালের মাধ্যমে কাজ করানোর বদলে সরকারি পোর্টাল ব্যবহার করুন।

ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করলে লাইসেন্স বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তাই আবেদনপত্র জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য যাচাই করা জরুরি।

বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার প্রথম ধাপ হলো বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিবন্ধন করে লার্নার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা। এরপর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়।

আবেদনের আগে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় নথি ও ফি যাচাই করুন। সরকারি নিয়ম বা ফি পরিবর্তিত হতে পারে বলে চূড়ান্ত আবেদন করার সময় বিআরটিএর সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন কি অনলাইনে করা যায়?

হ্যাঁ। বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিবন্ধন করে লার্নার লাইসেন্সের আবেদন, প্রয়োজনীয় নথি আপলোড এবং ফি পরিশোধ করা যায়। তবে পরবর্তী পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

২. ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে ন্যূনতম বয়স কত?

অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে যানবাহনের শ্রেণি অনুযায়ী বয়সের শর্ত প্রযোজ্য।

৩. লার্নার লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?

বিআরটিএর প্রকাশিত সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, এক ক্যাটাগরির লার্নার লাইসেন্সের ফি ৫১৮ টাকা এবং দুই ক্যাটাগরির ফি ৭৪৮ টাকা। পেমেন্ট গেটওয়ে চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে।

৪. ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে কি পরীক্ষা দিতে হয়?

হ্যাঁ। লার্নার লাইসেন্স নেওয়ার পর নির্ধারিত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

৫. অনলাইনে আবেদন করলেই কি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়?

না। অনলাইনে আবেদন হলো প্রথম ধাপ। এরপর প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা, চূড়ান্ত আবেদন, ফি পরিশোধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ