ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

হুতি হামলার মুখে সৌদি যুবরাজ, নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৩ ১৯:৩৬:০৯
হুতি হামলার মুখে সৌদি যুবরাজ, নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে চাপে পড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির মধ্যে দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের চলাচল এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪১ বছর বয়সী যুবরাজকে সুরক্ষিত বাংকার-সুবিধাসম্পন্ন একাধিক রাজপ্রাসাদে পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। গত শনিবারের ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। সৌদি আরবের গত এক দশকের ইতিহাসে ঘটনাটিকে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রিয়াদের ‘মক্কা চুক্তি’র মিত্ররাও সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

জনসমক্ষে অনুপস্থিত যুবরাজ, সুরক্ষায় বিশেষ দল

মোহাম্মদ বিন সালমানকে সর্বশেষ জনসমক্ষে দেখা যায় গত মঙ্গলবার, একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময়। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো প্রকাশ্য উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়নি।

যুবরাজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ায় তাঁর সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। তাঁকে জনদৃষ্টির বাইরে রেখে বিশেষভাবে নির্বাচিত দক্ষ নিরাপত্তাকর্মীদের একটি দল দায়িত্ব পালন করছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় তাঁকে বাংকার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিমানবন্দরে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা হুতিদের

সৌদি আরবের বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। হুতি বিদ্রোহীদের এক মুখপাত্র বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করার পাশাপাশি সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দরেও আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে রিয়াদের এই বিমানবন্দরে চারবার হামলা হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নির্ধারিত ফ্লাইট চলাচলে। উড়োজাহাজ চলাচলবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাব অনুযায়ী, রিয়াদ বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল করতে হচ্ছে।

ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমছে, চার দেশের সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ

হুতিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেছেন, ধারাবাহিক আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে।

এই ঘাটতি সামাল দিতে গত মাসে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। তবে এ ধরনের সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত নিয়েও চাপের কথা জানা যাচ্ছে।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও বেশ কমে গেছে।

সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান হুতিদের আক্রমণের জবাবে কঠোর প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার ভয়াবহতা বিবেচনায় রেখেই সৌদি আরব পাল্টা পদক্ষেপ নেবে।

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি থেকে নতুন সংঘাত

সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের বর্তমান সংঘাতের শিকড় ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে। ২০১৫ সালে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে সৌদি আরব সরাসরি যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই হুতিদের সঙ্গে দেশটির রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়।

দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। তবে সেটি ছিল ভঙ্গুর। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চুক্তিটি পুরোপুরি ভেঙে যায়।

নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আগে ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দরকে ঘিরে একটি অভিযোগ সামনে আসে। হুতিদের দাবি, তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ইরানের একটি উড়োজাহাজ সানা থেকে তেহরানের উদ্দেশে উড্ডয়নের চেষ্টা করার সময় সৌদি বাহিনী গুলি চালায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন তেহরান, সংলাপের প্রস্তাব

ইরান-সমর্থিত হুতিরা এ অঞ্চলে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ ও সুসজ্জিত সামরিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সংঘাতের বিস্তার নিয়ে ইরানও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আরব উপদ্বীপে উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়টি তেহরান গভীরভাবে উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। তাঁর বক্তব্য, এই লড়াইয়ের ফলে শুধু ইসরায়েল সরকারই লাভবান হবে।

কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে গত রোববার রাতে সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। ওই আলোচনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রিয়াদকে সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক সমাধানের পথ বাদ দিয়ে কেবল সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

একই সঙ্গে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করার উদ্যোগে তেহরান সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

সৌদি যুবরাজের নিরাপত্তা জোরদার, রিয়াদের বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা এবং আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসার ঘটনা সংঘাতের বহুমুখী প্রভাব তুলে ধরছে। একদিকে সৌদি আরব সামরিক সহায়তা চাইছে, অন্যদিকে ইরান রাজনৈতিক সংলাপের পক্ষে অবস্থান জানাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ—দুই দিকই আঞ্চলিক সংকটের পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

FAQ

১. সৌদি যুবরাজের নিরাপত্তা কেন জোরদার করা হয়েছে?

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির কারণে মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে।

২. রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় কতজন নিহত ও আহত হয়েছেন?

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবারের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

৩. রিয়াদ বিমানবন্দরের কত শতাংশ ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে?

সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল করতে হচ্ছে।

৪. সৌদি আরব কোন দেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে?

ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে গত মাসে সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।

৫. সৌদি আরব ও হুতিদের যুদ্ধবিরতি কখন ভেঙে যায়?

২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই চুক্তি পুরোপুরি ভেঙে যায়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ