সৌদি-হুতি সংঘাতে কেন উদ্বেগে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা
মধ্যপ্রাচ্যে একটি সামরিক সংঘাতের পরিণতি কত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমবাজার। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের মধ্যে ২০২৬ সালের অক্টোবরের উত্তেজনা তাই শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশি কর্মীদের চাকরি, উপার্জন, ঋণ পরিশোধ এবং দেশে থাকা পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা। সৌদি আরবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান ও আয়ের ওপর সম্ভাব্য চাপের পাশাপাশি জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবও বাংলাদেশের মানুষের জীবনে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের উদ্বেগের পেছনে রয়েছে সৌদি আরবের শ্রমবাজারের গুরুত্ব। বিএমইটির কর্মকর্তার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজের জন্য দেশটিতে গেছেন। এত বিপুলসংখ্যক কর্মীর একটি দেশের ওপর নির্ভরতা যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি সেখানে অস্থিরতা দেখা দিলে ঝুঁকির পরিধিও বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক এ কে এম আহসান উল্লাহর বিশ্লেষণে, সৌদি-হুতি সংঘাতের তাৎপর্য বুঝতে হলে সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক পরিণতিও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, যুদ্ধের প্রভাব শুধু হামলার শিকার স্থাপনা কিংবা সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
প্রবাসী কর্মীদের জীবিকায় কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে
সৌদি আরবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমবাজারে একাধিক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়া, নির্মাণকাজের প্রকল্প ধীর হয়ে পড়া কিংবা বেতন ও অতিরিক্ত কাজের আয় অনিশ্চিত হওয়া—এসব পরিস্থিতি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে সব কর্মখাতে একই ধরনের প্রভাব পড়বে, এমনটি নিশ্চিত নয়।
বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে ঋণ নেওয়া কর্মীদের সংকট তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। কয়েক মাস আয় বন্ধ থাকলেও তাঁদের ঋণের কিস্তি, দৈনন্দিন ব্যয় এবং দেশে থাকা পরিবারের দায়িত্ব বহাল থাকে। ফলে কর্মস্থলে কাজের বিঘ্ন একটি পরিবারের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গৃহকর্মী এবং অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন কর্মস্থলে কাজ করা ব্যক্তিদের কাছে জরুরি তথ্য ও সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। এ কারণে সংঘাতের সময় প্রবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর রাখা জরুরি।
তবে সংঘাতের প্রভাবকে সব খাতে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমার্থক হিসেবে দেখা উচিত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও জরুরি সরবরাহের মতো ক্ষেত্রেও শ্রমের চাহিদা থাকতে পারে। তাই পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোন অঞ্চলে কী ধরনের কাজ চলছে, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তেল স্থাপনায় হামলা থেকে বাড়তে পারে অর্থনৈতিক চাপ
সৌদি আরবের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তেল অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির তেল স্থাপনা এবং পরিবহনব্যবস্থায় হামলা হলে বর্তমান আয়ের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সৌদি আরবের আর্থিক সম্পদ, উৎপাদনক্ষমতা এবং অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের সামর্থ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর আরামকোর কার্যক্রম দ্রুত পুনরুদ্ধারের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনও সেই সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত করতে পারা আর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণতি এড়াতে পারা এক বিষয় নয়।
সংঘাতের কারণে পর্যটন, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সৌদি আরবের অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করার প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তেল স্থাপনায় হামলা বর্তমান আয়ের ভিত্তিকে ঝুঁকিতে ফেলে; অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা ভবিষ্যতের বিকল্প অর্থনৈতিক খাত গড়ে তোলার ব্যয় বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো মেরামত ও পুনর্গঠনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য সম্পদ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়তে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের ক্ষতি শুধু ধ্বংস হওয়া স্থাপনার আর্থিক মূল্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
তবে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে ইয়েমেনের মানুষের মানবিক বিপর্যয় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাংকের মে ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় সংঘাতের কারণে আয় ও জীবিকার সুযোগ কমে যাওয়া বহু পরিবারের জন্য খাবার জোগাড়ের সংকট তৈরি করতে পারে।
লোহিত সাগরের অস্থিরতা কেন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি অবকাঠামো কিংবা দুই পক্ষের সামরিক অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। লোহিত সাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে কোনো কোনো জাহাজকে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে পরিবহন ও বিমার খরচ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সেই বাড়তি ব্যয় সরবরাহব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন পণ্যের দামে যুক্ত হতে পারে। ফলে সংঘাতের কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যে থাকলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব দূরের দেশগুলোর ভোক্তাদেরও বহন করতে হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিছু অস্ত্র ব্যবসায়ী কিংবা বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারী লাভবান হতে পারেন। কিন্তু আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, পরিবহন খাত এবং সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক কর্মীর উপস্থিতি। অর্থাৎ আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব একদিকে বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে, অন্যদিকে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও আয়ের অনিশ্চয়তার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে।
সংঘাতের মূলে রয়েছে অসমাপ্ত রাজনৈতিক সংকট
বর্তমান উত্তেজনা বোঝার জন্য ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ২০১৫ সালের মার্চে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের সমর্থনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে। এর মধ্য দিয়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি সহিংসতা কমাতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময়ে, ২০২৩ সালের শেষ দিকে, দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি, সরকারি কর্মীদের বেতন, তেল রপ্তানি এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে অঙ্গীকার সামনে আসে। তবে এসব উদ্যোগ স্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরির জন্য যথেষ্ট হয়নি।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, যুদ্ধের তীব্রতা কমানো গেলেও ক্ষমতা বণ্টন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে বিরোধগুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে। ফলে সাময়িক বিরতির পর নতুন উত্তেজনা পুরোনো সংঘাতকে আবার সক্রিয় করে তোলার সুযোগ পায়।
২০২৩ সালে চীনের সহায়তায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়েছিল। দুই দেশের এই উদ্যোগ দেখিয়েছিল, দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও আলোচনার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক উন্নত হলেই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে যায় না। স্থানীয় পক্ষগুলোর স্বার্থ ও ক্ষমতার প্রশ্নে সমঝোতা ছাড়া আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের সুফল সীমিত থাকতে পারে।
ধর্মীয় পরিচয়ের মিল কেন সংঘাত ঠেকাতে পারেনি
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সমাজে আরবি ভাষা ও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারপরও দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থ এক নয়। ধর্মীয় পরিচয়ের মিল রাজনৈতিক ঐক্য কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের অভিন্নতা নিশ্চিত করে না।
সৌদি আরব একটি রাষ্ট্র হলেও হুতিরা ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন, যাদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। এই আন্দোলনকে পুরো ইয়েমেনের মানুষের সঙ্গে এক করে দেখা যথাযথ নয়। একইভাবে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোও একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কাজ করে না।
সংঘাতের ব্যাখ্যায় শিয়া-সুন্নি বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বঞ্চনার ইতিহাস, হুতিদের স্থানীয় ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, সৌদি আরবের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব—এসব বিষয়ও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। ইরান মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও আরব রাষ্ট্র নয়; তাই মধ্যপ্রাচ্যের বিরোধকে কেবল ভাষা কিংবা ধর্মের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাই কখন ঝুঁকি বাড়ায়
সৌদি আরবের জন্য প্রতিবেশী ভূখণ্ড থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি মোকাবিলা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। অন্যদিকে, সামরিক অভিযানের ফলে ইয়েমেনে বেসামরিক মানুষের ক্ষতি বাড়লে নতুন ক্ষোভ ও প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে।
হুতিরা নিজেদের প্রতিরোধকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরলেও বিমানবন্দর, বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা সাধারণ মানুষের বিপদ বাড়ায়। কোনো পক্ষের নিরাপত্তার দাবি অন্য পক্ষের বেসামরিক জনগণের ওপর সীমাহীন ক্ষতির বৈধতা তৈরি করে না।
এখানে নিরাপত্তা-দ্বন্দ্বের একটি চক্র কাজ করতে পারে। এক পক্ষ আত্মরক্ষার জন্য যে পদক্ষেপ নেয়, প্রতিপক্ষ সেটিকে আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে এক পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের অনিরাপত্তা বাড়িয়ে দিতে পারে।
সৌদি আরবের মতো আর্থিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষেও প্রতিটি তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর, বন্দর ও জনবসতিকে সব ধরনের হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখা সহজ নয়। সামরিক সরঞ্জাম কেনার সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি স্থাপনা নিরাপদ রাখার সক্ষমতা এক নয়।
মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা
সৌদি-হুতি সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাব আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কেও পড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অবিশ্বাস আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করতে পারে এবং নিরাপত্তার জন্য বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্র কেনাকে নিরাপত্তার সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হতে পারে, অথচ রাজনৈতিক সমঝোতার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ পিছিয়ে যেতে পারে। ফিলিস্তিনসহ অন্যান্য মানবিক সংকটে সম্মিলিতভাবে কাজ করার সক্ষমতাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই সংঘাতের পরিণতি শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কিংবা অর্থনৈতিক ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সুযোগও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের করণীয়: প্রবাসীদের সুরক্ষা ও বিকল্প শ্রমবাজার
সৌদি আরবের পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলে বাংলাদেশের জন্য প্রথম প্রয়োজন প্রবাসী কর্মীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা। দূতাবাসের মাধ্যমে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য পৌঁছানো, বকেয়া মজুরি আদায়ে সহায়তা এবং প্রয়োজন দেখা দিলে দেশে ফেরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি থাকতে হবে।
একই সঙ্গে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসনও পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন। কারণ, দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করার পর হঠাৎ আয় বন্ধ হয়ে গেলে কর্মী ও তাঁর পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রে বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের গুরুত্ব রয়েছে। একটি দেশের শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কোনো পরিবারের জন্য নিরাপদ নয়; রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তাতে বাড়তে পারে।
তবে প্রস্তুতি নেওয়ার অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবে সব খাতে কর্মসংস্থান কমে যাবে। বরং সংঘাতের প্রভাব কোন অঞ্চলে এবং কোন পেশায় বেশি পড়ছে, তা বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
শান্তির পথ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর
সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাত সামনে কোন দিকে যাবে, তা নিশ্চিত নয়। সীমিত পর্যায়ের লড়াই অব্যাহত থাকা, বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কিংবা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো—তিনটি পথই সম্ভাব্য।
দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের সুরক্ষার পাশাপাশি ইয়েমেনের জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং জীবিকার প্রশ্নেও অগ্রগতি প্রয়োজন। শুধু সামরিক সংঘাত থামিয়ে দিলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিরোধের সমাধান নিশ্চিত হবে না।
বাংলাদেশের জন্যও পরিস্থিতির গুরুত্ব এখানেই। সৌদি আরবের শ্রমবাজার দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। তাই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখার পাশাপাশি প্রবাসীদের সুরক্ষা, আয়ের ধারাবাহিকতা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।
সৌদি-হুতি সংঘাত শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামনে একটি বড় বাস্তবতা তুলে ধরে: আন্তর্জাতিক রাজনীতির দূরবর্তী কোনো সংকটও প্রবাসী কর্মীর আয়, ঋণগ্রস্ত পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে।
FAQ
১. সৌদি-হুতি সংঘাত বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সৌদি আরব বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মসংস্থান, বেতন, প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
২. ২০২৫ সালে কতজন বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজ করতে গেছেন?
বিএমইটির কর্মকর্তার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজের জন্য সৌদি আরবে গেছেন।
৩. সংঘাত বাড়লে কি সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের সব চাকরি বন্ধ হয়ে যাবে?
এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। প্রভাব কর্মখাত ও অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে। মেরামত, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও জরুরি সরবরাহে শ্রমের চাহিদা থাকতে পারে।
৪. প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য কী প্রস্তুতি প্রয়োজন?
দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য, বকেয়া বেতন আদায়ে সহায়তা এবং প্রয়োজনে দেশে ফেরার প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ।
৫. ইয়েমেনের সংকটের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধের সম্পর্ক কী?
ইয়েমেনের রাজনৈতিক রূপান্তরের ব্যর্থতা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা, হুতিদের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং সৌদি আরবের সীমান্ত নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে এই সংঘাতের পটভূমি তৈরি হয়েছে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- আজকের সোনার দাম: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম কত
- আজ ব্যালন ডি’অর ২০২৬, কার হাতে উঠবে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার?
- মালয়েশিয়া মেডিকেল কবে শুরু হবে ২০২৬, সর্বশেষ খবর
- Ballon d’Or 2026 Rankings: শীর্ষে ইয়ামাল, সেরা ১০ কারা?
- OPPO Find X10 Ultra: ২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় কী থাকছে?
- এইচএসসি রেজাল্ট ২০২৬: রোল নম্বর দিয়ে ফল দেখবেন যেভাবে