Alamin Islam
Senior Reporter
সরকারি চাকুরিজীবীদের নতুন পে স্কেল : মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা
আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং নতুন সরকার গঠনের ঠিক আগমুহূর্তে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশাল এক বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব পেশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি চাকুরিজীবীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
যমুনায় সুপারিশ পেশ: কী আছে নতুন বেতন কাঠামোতে?
গত বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন বৃদ্ধির এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন তুলে দেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের কমিশন। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সুপারিশের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
বেতন বৃদ্ধি: সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
ধাপ বিন্যাস: আগের মতো ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে।
সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন: বর্তমানের সর্বনিম্ন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বৈষম্য হ্রাস: আগে উচ্চতম ও নিম্নতম বেতনের অনুপাত ছিল ১:৯.৪, যা নতুন প্রস্তাবে ১:৮-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা একে একটি ‘সৃজনশীল কাজ’ হিসেবে অভিহিত করে জানান, সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে এমন কিছুর অপেক্ষায় ছিল।
ব্যয়ের বোঝা ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ
কমিশন প্রধানের দেওয়া তথ্যমতে, এই বিশাল সুপারিশ কার্যকর করতে সরকারের বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি চাকুরিজীবী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বছরে ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, বেসামরিক খাতের পর এখন বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
সংবিধান ও আইনি প্রশ্ন
তফসিল ঘোষণার পর এই ধরনের বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। সাধারণত নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী বা অস্থায়ী সরকার কেবল রুটিন মাফিক কাজ করে থাকে। আইনবিদদের মতে, বেতন বৃদ্ধির মতো দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সিদ্ধান্তের এখতিয়ার কেবল একটি নির্বাচিত সরকারেরই থাকা উচিত।
বেসরকারি খাতের জন্য অশনি সংকেত
এই পে স্কেল দেশের বেসরকারি শিল্প খাতের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন:
১. বেতন বৃদ্ধির চাপ: সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি কর্মীরাও একই দাবি তুলবেন। কিন্তু বর্তমান মন্দা ও বিনিয়োগ খরা পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই তা সম্ভব নয়।
২. উৎপাদন ব্যাহত: গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও ডলারের উচ্চমূল্যে এমনিতেই কলকারখানা বন্ধ হওয়ার দশা। এর ওপর বেতন বাড়ানোর বাড়তি চাপ শিল্প খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
৩. পোশাক শিল্পে অস্থিরতা: বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে এই সিদ্ধান্ত বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষের সূত্রপাত করতে পারে, যা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎসকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
অর্থনৈতিক গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, পে স্কেল ঘোষণা ও কার্যকর হওয়ার সময় বাজারে তিন দফায় পণ্যের দাম বাড়ে। এবারের সুপারিশের ফলে নিত্যপণ্যের দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ৮ শতাংশের উপরে থাকা মুদ্রাস্ফীতি ২০ থেকে ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে বাজারের আগুনি দামে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন নাভিশ্বাস হয়ে উঠবে।
রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের ঝুঁকি
দেশের রাজস্ব আয় বর্তমানে গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সরকার যেখানে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দৈনন্দিন খরচ সামলাচ্ছে, সেখানে বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এই টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি জনগণের ওপর ভ্যাটের বোঝা চাপানো হয়, তবে জনজীবনে চরম অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা বাড়ানোর যুক্তি দেওয়া হলেও, বর্তমানের ভঙ্গুর রাজস্ব পরিস্থিতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে। যথাযথ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত সংকটাপন্ন অর্থনীতিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিউজের শেষে পাঠকদের মনে উঁকি দেওয়া সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে একটি FAQ (Frequently Asked Questions) সেকশন নিচে দেওয়া হলো:
নতুন পে স্কেল ২০২৪: সাধারণ জিজ্ঞাসা ও উত্তর
১. নতুন পে স্কেলে বেতন কত শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে?
উত্তর: জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
২. নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতন কত?
উত্তর: সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬২,০০০ টাকা (নির্ধারিত) করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
৩. এই পে স্কেলে কতটি গ্রেড বা ধাপ থাকবে?
উত্তর: নতুন সুপারিশে গ্রেড সংখ্যা পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি; আগের মতোই ২০টি গ্রেড বা ধাপ বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
৪. নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত কত টাকা খরচ হবে?
উত্তর: বেতন কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
৫. বর্তমানে দেশে সরকারি চাকুরিজীবী ও পেনশনভোগীর সংখ্যা কত?
উত্তর: বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ এবং পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। তাদের পেছনে বর্তমানে বছরে সরকারের ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
৬. এই বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দামে কী প্রভাব পড়তে পারে?
উত্তর: অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে পে স্কেল ঘোষণার পর বাজারে পণ্যের দাম ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এবারের বিশাল বেতন বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি ২০ থেকে ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণের বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৭. বেসরকারি খাতের ওপর এর প্রভাব কী হবে?
উত্তর: সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতেও বেতন বৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বেতন বাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
৮. তৈরি পোশাক (RMG) খাতে কি কোনো সমস্যা হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই পে স্কেল পোশাক খাতের শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করবে। এতে ধুঁকতে থাকা গার্মেন্টস শিল্প অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে।
৯. অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনজ্ঞদের মতামত কী?
উত্তর: আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণত একটি নির্বাচিত সরকারই এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
১০. সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য কি আলাদা পে স্কেল হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর এখন সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
আল-মামুন/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- পার্সোনাল হেলিকপ্টার কিনতে চান,জেনেনিন দাম ও তৈল খরচ
- চলছে রাজশাহী বনাম সিলেট ম্যাচ: খেলাটি সরাসরি দেখুন Live
- রাজশাহী বনাম চট্টগ্রাম সেমি ফাইনাল: চরম উত্তেজনায় শেষ ম্যাচ, জানুন ফলাফল
- আজই আসছে প্রাইমারি নিয়োগ ফল: সব আপডেট ও রেজাল্ট দেখুন এখানে
- রাজশাহী বনাম সিলেট: চরম নাটকীয়ভাবে শেষ হলো ম্যাচ, জানুন ফলাফল
- অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ: বন্ধ নিউজিল্যান্ড বনাম বাংলাদেশ ম্যাচ
- শিক্ষক নিয়োগের রেজাল্ট কবে? জানাল প্রাথমিক অধিদপ্তর
- প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ফল: আজই প্রকাশ! যেভাবে দেখবেন
- রংপুর বনাম সিলেট এলিমিনেটর: শেষ বলের রোমাঞ্চে ম্যাচ শেষ জানুন ফলাফল
- নতুন পে-স্কেল: দ্বিগুন হলো বেতন!
- চলছে রাজশাহী বনাম সিলেট ম্যাচ: জমে উঠেছে খেলা সরাসরি দেখুন Live
- চলছে চট্টগ্রাম বনাম রাজশাহী কোয়ালিফায়ার ম্যাচ: খেলাটি সরাসরি দেখুন Live
- সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর: বাড়ছে বৈশাখী ভাতা ও চিকিৎসা ভাতা
- আজকের স্বর্ণের দাম: (বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬)
- এক লাফে কমলো লোহা/রডের দাম