Md Razib Ali
Senior Reporter
ফুটবল ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ? বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে শঙ্কা
মাঠে বল গড়ানোর অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর 'বিশ্বকাপ'। গ্যালারিতে বসে উন্মাদনা দেখার সৌভাগ্য সবার না হলেও, কোটি বাঙালির শেষ ভরসা টেলিভিশন পর্দা। তবে এবারের আসরটি দেশের টিভি পর্দায় দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক বিশাল ধোঁয়াশা। আকাশচোঁয়া বিপণনমূল্য আর মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক মারপ্যাঁচে আটকে আছে বাংলাদেশের সম্প্রচার ভাগ্য।
বিশ্বজুড়ে টানাপোড়েন: চীন পারলেও ভারত-বাংলাদেশ কি পারবে?
বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে জটিলতা কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ চীন ও ভারতেও দেখা দিয়েছিল। তবে গতকাল চীন তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করে সম্প্রচার নিশ্চিত করেছে। বিপরীতে, ভারতের পরিস্থিতি এখনো অস্পষ্ট। একই ধরনের অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে বাংলাদেশের নামও।
নেপথ্যে ২০০ কোটির বাধা
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাদেশ বা দেশের জন্য সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করা হয়। এবারের আসরের জন্য বাংলাদেশের টিভি ও ডিজিটাল স্বত্ব কিনে নিয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক’। অভিযোগ উঠেছে, তারা বাংলাদেশের বাজারের জন্য এই স্বত্বের দাম হাকাচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা (ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ)। এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করতে এখন পর্যন্ত কোনো দেশি প্রতিষ্ঠান বা টেলিভিশন চ্যানেল সাহস করেনি।
ব্যর্থ হয়েছে টি স্পোর্টস ও স্টার নিউজের প্রচেষ্টা
দেশের একমাত্র স্পোর্টস চ্যানেল হিসেবে টি স্পোর্টসের সিইও ইসতিয়াক সাদেক ব্যক্তিগতভাবে সিঙ্গাপুর গিয়ে আলোচনার টেবিলে বসলেও চূড়ান্ত কোনো সমাধান মেলেনি। অন্যদিকে, সম্প্রচারে আসা নতুন চ্যানেল স্টার নিউজও আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু উচ্চমূল্য, বিজ্ঞাপনের ছোট বাজার এবং অধিকাংশ ম্যাচ গভীর রাত বা খুব ভোরে হওয়ার কারণে দর্শকদের কম উপস্থিতির আশঙ্কায় তারা আর এগোয়নি। ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা মাথায় রেখেই কোনো পক্ষই চুক্তিতে সই করছে না।
ফিফার নীতি পরিবর্তন ও বিটিভির অবস্থান
একটা সময় ছিল যখন ফিফা রাষ্ট্রায়ত্ত চ্যানেলগুলোকে বিনামূল্যে খেলা দেখানোর সুযোগ দিত। কিন্তু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে সেই নিয়ম তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি চ্যানেলকেও চড়া দামে রাইটস কিনতে হয়। গতবার টি স্পোর্টস ও জিটিভির পাশাপাশি বিটিভিও বড় অংকের অর্থ খরচ করে সম্প্রচার করেছিল। সে সময় তমা কনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে বিটিভির খেলা কেনার বিষয়টি নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল।
এবারের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের পেশ করা সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” তবে এ বিষয়ে বিটিভির মহাপরিচালক মোঃ মাহবুবুল আলমের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বাজার বিশ্লেষকদের চোখে বাস্তবতা
বিগত কয়েক বিশ্বকাপ ধরে টিভি স্বত্ব নিয়ে কাজ করা বাফুফের সহ-সভাপতি ফাহাদ করিম বাস্তবসম্মত সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপ থেকে ফিফা সবচেয়ে বেশি আয় করে, তাই প্রতিবারই এর দাম বাড়ছে। স্প্রিংবক এবার যে দাম দাবি করছে, তা দিয়ে স্বত্ব কিনে খরচ তুলে আনা প্রায় অসম্ভব। তবুও দেশের ফুটবলপ্রেমীদের কথা মাথায় রেখে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন।”
সরাসরি টেন্ডারে না থাকার খেসারত
বাংলাদেশ কখনোই ফিফার মূল টেন্ডারে সরাসরি অংশ নেয় না। এই সুযোগে তৃতীয় কোনো পক্ষ স্বত্ব কিনে নিয়ে বাংলাদেশের কাছে চড়া দামে বিক্রির চেষ্টা করে। সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় বারবার অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে খেলা সম্প্রচার করতে হয়। ফুটবলপাগল বাঙালির এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান শেষ পর্যন্ত টিভিপর্দায় ঘটবে কি না, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
তানভির ইসলাম/