পে-স্কেলের গেজেট কবে, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরও কেন অপেক্ষা
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। মন্ত্রিসভায় পে-স্কেল অনুমোদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এখনো প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশিত হয়নি। অনুমোদনের পর দ্রুতই গেজেট জারি হবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় চাকরিজীবীদের অনেকের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও হতাশা।
এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। গেজেট প্রকাশের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
তবে সাবেক আমলাদের ব্যাখ্যা, মন্ত্রিসভায় কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হওয়ার পরই সেটি সরাসরি গেজেট আকারে প্রকাশ করা যায় না। এর আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। এসব ধাপ শেষ করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে; বিশেষ পরিস্থিতিতে সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের জন্য নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ, আবার কখনো মাসও লেগে যেতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় পর নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা আসায় এবার কর্মচারীদের অপেক্ষার বিষয়টি নিয়ে হতাশা তুলনামূলক বেশি।
আইন মন্ত্রণালয়ে এখনো পৌঁছেনি পে-স্কেলের খসড়া
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া আইনগত যাচাইয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে—এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনুমোদিত খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি।
আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে তারা জানতে পেরেছিলেন যে এক-দুই দিনের মধ্যে অনুমোদিত পে-স্কেলের খসড়া ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি তাদের কাছে আসেনি।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়া কোনো কারণে আটকে নেই। গেজেট প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার কারণেই কিছুটা সময় লাগছে।
তিনি জানান, সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা যুক্ত করে প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুতের কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে দ্রুতই খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে আইনগত ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে।
গেজেট প্রকাশের আগে যেসব ধাপ পেরোতে হয়
পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে কেন সময় লাগছে, সে বিষয়ে সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য যে খসড়া উপস্থাপন করা হয়, সেখানে মূলত কোন গ্রেডে কত পরিমাণ বেতন-ভাতা বাড়বে, তার একটি সামগ্রিক কাঠামো থাকে।
কিন্তু মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পর সেটিকে সরাসরি প্রজ্ঞাপন হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। গেজেট তৈরির পর্যায়ে বেতন কাঠামোর বিভিন্ন বিষয় আরও বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ ও উপস্থাপন করতে হয়।
কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে নতুন কাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার হিসাব কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয় প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।
এর মধ্যে সামরিক বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, সেই বিষয়টিও নির্ধারণ করতে হয়।
প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর কোনো অংশ সংবিধান কিংবা বিদ্যমান চাকরি-সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাই করা হয়।
শুধু আইনি সামঞ্জস্যই নয়, প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ভাষা, আইনি পরিভাষা এবং বিভিন্ন নির্দেশনার মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ চূড়ান্ত খসড়া আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসে পাঠানো হয় গেজেটটি মুদ্রণের জন্য। মুদ্রণ শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নতুন পে-স্কেলে কত বাড়বে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ফলে এসব গ্রেডের অনেক কর্মকর্তা বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মূল বেতন পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সর্বনিম্ন গ্রেডে। ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। এতে তাদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন পে-স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। সেই হিসাবে জুলাই মাস থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য নতুন এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
যেভাবে তৈরি হলো নতুন বেতন কাঠামোর পথ
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালে জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ওই কমিশন গঠন করা হয়।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় জাতীয় বেতন কমিশন। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।
কমিশনের প্রস্তাবে বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ধাপের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশও ছিল প্রতিবেদনে। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের যাতায়াত ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায় পরিবর্তন আনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
এরপর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন সেই কাঠামোর আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। গেজেট প্রকাশ হলেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
তানভির ইসলাম/