ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

বিদ্যুৎ খাতে বড় সুখবর, ২০০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে এডিবি

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৬:৪০:২৪
বিদ্যুৎ খাতে বড় সুখবর, ২০০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে এডিবি

দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায়। এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে এবার বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সাবস্টেশন, হাজার হাজার কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন, আধুনিক ত্রুটি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে বড় পরিসরের এই প্রকল্পে বাংলাদেশকে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এডিবির ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রকল্পটির অর্থায়নের তথ্য জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) এই উদ্যোগের আওতায় থাকবে।

কোথায় বদল আসছে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কে

প্রকল্পটির লক্ষ্য কেবল নতুন বিদ্যুৎ অবকাঠামো তৈরি নয়; বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতাও কমানো। ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় অতিরিক্ত চাপ বহনকারী সাবস্টেশন সংস্কার, পুরোনো অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ হবে।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ককে আরও সক্ষম করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত ঢাকা ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদার কারণে যে নেটওয়ার্ক চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

৫২ নতুন সাবস্টেশন, বাড়বে আরও ১২টির ক্ষমতা

বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামো সম্প্রসারণে প্রকল্পের বড় অংশজুড়ে থাকছে সাবস্টেশন। ৫২টি নতুন সাবস্টেশনে মোট ১ হাজার ১৫০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার ক্ষমতার ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হবে।

এর পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা ১২টি সাবস্টেশনের সক্ষমতাও বাড়ানো হবে। এসব সাবস্টেশনে অতিরিক্ত ১১৫ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার ক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ নতুন স্থাপনার পাশাপাশি পুরোনো নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়িয়েও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হবে।

২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি লাইনে কাজ

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আরেকটি বড় পরিবর্তন আসবে সঞ্চালন লাইনে। প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি ওভারহেড ও আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে।

এসব কাজে আধুনিক ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ লাইনে কোথাও সমস্যা হলে সেটি দ্রুত চিহ্নিত করাও প্রকল্পের অংশ। এ জন্য স্থাপন করা হবে ৯০০টি আধুনিক ফল্ট লোকেটর।

এর সঙ্গে নদী পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় টাওয়ার এবং আধুনিক সুইচিং স্টেশন নির্মাণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পর এবার নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর পালা

বাংলাদেশ ২০২২ সালে দেশব্যাপী শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য অর্জন করেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তার ঘটার পাশাপাশি দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে বিতরণ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রকল্পটির লক্ষ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করে তোলার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। একই সঙ্গে কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয়ও প্রকল্প পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।

এডিবির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেন ঝাং বলেছেন, বাংলাদেশ সমৃদ্ধ ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের সেবা উন্নত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতেও জোর

বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকল্পটিতে জলবায়ু ও পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতার বিষয়টি রাখা হয়েছে। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ৭৫১ টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে সহায়তা করা হবে।

পরিবেশবান্ধব গ্যাস-ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রায় ১৪৬ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ রেজিলিয়েন্স ফাইন্যান্সিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

শুধু যন্ত্রপাতি নয়, প্রশিক্ষণও হবে

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিআরইবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিজিটাল সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের সামাজিক দিকেও গুরুত্ব রয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির বিষয়টি এতে রাখা হয়েছে।

এডিবির ২০০ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে থাকছে আরও অর্থ

প্রকল্পটির মোট অর্থায়নে শুধু এডিবির ঋণ থাকছে না। ২০০ মিলিয়ন ডলারের এডিবি ঋণের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার দেবে ১০৭ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে ১৪১ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া কোরিয়া ই-এশিয়া অ্যান্ড নলেজ পার্টনারশিপ ফান্ড থেকে পাওয়া যাবে ১ মিলিয়ন ডলার অনুদান সহায়তা।

শিল্প ও বিনিয়োগে বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল এবং আবাসিক এলাকাগুলোতে বিতরণ অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়লে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, উন্নত বিতরণ ব্যবস্থা শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে, এডিবির ২০০ মিলিয়ন ডলারের এই ঋণ শুধু নতুন সাবস্টেশন বা বিদ্যুৎ লাইন তৈরির প্রকল্প নয়। এর আওতায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা—একাধিক দিক একসঙ্গে উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: