ঢাকা, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

মার্জিন ঋণ ও শেয়ার লেনদেন, তদন্তের মুখে মার্চেন্টাইল ব্যাংক

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৪ ১৭:০৭:২২
মার্জিন ঋণ ও শেয়ার লেনদেন, তদন্তের মুখে মার্চেন্টাইল ব্যাংক

মার্জিন ঋণের বিপরীতে গ্রাহকদের শেয়ারের প্রকৃত অবস্থা কী, নেগেটিভ ইকুইটি তৈরি হওয়ার পরও লেনদেন হয়েছে কি না, এমনকি গ্রাহকদের অর্থ ও শেয়ার অন্য হিসাবে সরানো হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ জন্য মার্চেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের কার্যক্রম নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। প্রতিটি বিও হিসাব ধরে অনুসন্ধান করে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তের পরিধি শুধু ঋণের হিসাব বা শেয়ারের বাজারমূল্য যাচাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো গ্রাহক বা সুবিধাভোগীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের যোগসূত্র ছিল কি না, নেগেটিভ ইকুইটির হিসাব থাকা অবস্থায় পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা ফি নেওয়া হয়েছে কি না এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হবে।

ঋণের বিপরীতে শেয়ারের হিসাব কতটা সঠিক

মার্চেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের গ্রাহকদের কাছে মোট কত টাকা ঋণ পাওনা রয়েছে, সেই ঋণের বিপরীতে তাদের পোর্টফোলিওতে কী পরিমাণ শেয়ার আছে এবং শেয়ারগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য কত—তদন্তে এসব হিসাব মিলিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি যে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখেছে, তার পরিমাণও যাচাই করা হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হিসাবকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া হবে না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করবে তদন্ত দল।

প্রতিষ্ঠানটি বিএসইসির বিধান মেনে প্রতি দুই মাস পরপর সঠিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল কি না, সেটিও এই যাচাইয়ের অংশ। অর্থাৎ ঋণ, শেয়ার, প্রভিশন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া তথ্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা হবে।

নেগেটিভ ইকুইটির পরও চলেছে শেয়ার লেনদেন?

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নেগেটিভ ইকুইটিতে চলে যাওয়া হিসাবগুলোতে পরবর্তী সময়ে কী ধরনের লেনদেন হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বরের পর এসব হিসাবের বিপরীতে কোনো শেয়ার কেনার আদেশ কার্যকর করা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে।

শুধু কেনাবেচা নয়, এসব হিসাব থেকে শেয়ার কিংবা অর্থ অন্য কারও কাছে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও অনুসন্ধান করা হবে। গ্রাহকদের আত্মীয়স্বজন বা মনোনীত ব্যক্তিদের নামে থাকা হিসাবে কোনো অর্থ বা শেয়ার স্থানান্তর করা হয়েছিল কি না, সেটি যাচাই করবে কমিটি।

এ ধরনের লেনদেনের পেছনে কারা ছিলেন এবং সেগুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগসূত্র ছিল কি না, তা বের করাও তদন্তের অংশ।

পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে গ্রাহকদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হবে

নেগেটিভ ইকুইটিতে থাকা বিও হিসাবগুলোর প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, তা শনাক্ত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মার্চেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব হিসাবের বিষয়ে কী ভূমিকা পালন করেছেন, সেটিও অনুসন্ধান করা হবে।

গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা, পরিচালক কিংবা কর্মকর্তাদের কোনো অপ্রকাশিত সম্পর্ক ছিল কি না, তা যাচাইয়ের নির্দেশ রয়েছে। একইভাবে অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গোপন যোগাযোগ বা সুবিধা আদান-প্রদান হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসবে।

প্রতিটি বিও হিসাব আলাদাভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে সুবিধাভোগী, লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা বের করার চেষ্টা করবে কমিটি।

পোর্টফোলিও পুনর্গঠন ও ফি আদায়ের বৈধতা যাচাই

গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর মার্চেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজ পোর্টফোলিও পুনর্গঠনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। বিএসইসির তদন্তে এবার সেই প্রস্তাবের আইনগত ভিত্তিও যাচাই করা হবে। প্রস্তাবটি কমিশনের আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল কি না, তা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া নেগেটিভ ইকুইটি থাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট ফি আদায় করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। হিসাবের আর্থিক অবস্থা এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া ফি—দুইয়ের মধ্যে নিয়মবহির্ভূত কোনো বিষয় রয়েছে কি না, তা যাচাই করবে তদন্ত দল।

চুক্তিপত্র থেকে অভ্যন্তরীণ অডিট—সব নথি পরীক্ষায়

লেনদেনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার নথিও তদন্তের আওতায় থাকবে। গ্রাহকদের সঙ্গে করা মার্জিন চুক্তিপত্র, কেওয়াইসি (KYC) নথি এবং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ক্রেডিট লিমিট মানা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।

কোনো গ্রাহকের শেয়ার বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি বা ফোর্সড সেল করা হয়ে থাকলে সেই প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখা হবে।

তিন সদস্যের কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের সময়

বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক এক আদেশে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়েছে। কমিটিতে রয়েছেন সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন এবং সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম ও অমিত অধিকারী।

কমিটিকে প্রতিটি বিও হিসাবের তথ্য ধরে বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে হবে। তদন্তের সব বিষয় পর্যালোচনা শেষে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মার্চেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের মার্জিন ঋণ, নেগেটিভ ইকুইটি, গ্রাহকদের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা—সব দিকের তথ্য একত্র করে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরাই এই তদন্তের লক্ষ্য।

পাঠকের সম্ভাব্য প্রশ্ন (FAQ)

১. মার্চেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে কী তদন্ত করছে বিএসইসি?

প্রতিষ্ঠানটির নেগেটিভ ইকুইটি, মার্জিন ঋণ, শেয়ার কেনাবেচা, অর্থ ও শেয়ার স্থানান্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে বিএসইসি।

২. তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা কত?

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

৩. তদন্ত কমিটির সদস্য কারা?

কমিটিতে রয়েছেন ড. মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম ও অমিত অধিকারী।

৪. তদন্তে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করা হবে?

মার্চেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজের হিসাবের সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।

৫. নেগেটিভ ইকুইটি থাকা হিসাব থেকে কী ধরনের লেনদেন খতিয়ে দেখা হবে?

২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বরের পর এসব হিসাবের বিপরীতে শেয়ার কেনার আদেশ কার্যকর হয়েছিল কি না এবং আত্মীয়স্বজন বা মনোনীত ব্যক্তিদের হিসাবে অর্থ বা শেয়ার স্থানান্তর করা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: