ঢাকা, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

পুরনো জমির মালিকানা ও খতিয়ান অনলাইনে খুঁজবেন যেভাবে

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৭ ১২:১৫:২২
পুরনো জমির মালিকানা ও খতিয়ান অনলাইনে খুঁজবেন যেভাবে

জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির হিসাব কিংবা পুরনো দলিল যাচাই—বিভিন্ন প্রয়োজনে জমির আগের রেকর্ড খুঁজতে হয়। একসময় এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে ভূমি অফিস বা রেকর্ড রুমে যেতে হতো। এখন সরকারি অনলাইন ব্যবস্থায় ঘরে বসেই নির্দিষ্ট এলাকার খতিয়ান, দাগ নম্বর ও মালিকের নামের ভিত্তিতে জমির রেকর্ড অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে।

তবে পুরনো জমির তথ্য খুঁজতে গিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। কারণ, একই জমির বিভিন্ন সময়ে তৈরি হওয়া একাধিক খতিয়ান থাকতে পারে। আবার আগের জরিপের দাগ নম্বর পরবর্তী জরিপে পরিবর্তিতও হতে পারে। তাই শুধু একটি নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান না করে জমির অবস্থান, মৌজা ও জরিপের ধরন সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি।

পুরনো জমির তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে?

বাংলাদেশে জমির রেকর্ড অনুসন্ধানের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি অনলাইন সেবা ব্যবহার করা যায়।

১. ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবা: ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ভূমি তথ্য বাতায়ন থেকে ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ বা ই-পর্চা সেবায় প্রবেশ করা যায়। এখানে খতিয়ান অনুসন্ধান এবং নির্ধারিত নিয়মে অনলাইন বা সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করা যায়।

২. অনলাইন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থাপনা:settlement.gov.bd ওয়েবসাইটে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের খতিয়ান অনুসন্ধান এবং মৌজা ম্যাপ-সংক্রান্ত সেবা রয়েছে। এই পোর্টালের অনুসন্ধান ফরমে বর্তমান খতিয়ান, সাবেক খতিয়ান, বর্তমান দাগ, সাবেক দাগ এবং সিএস দাগ নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কোনো এলাকার জরিপের রেকর্ড জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড ভূমি তথ্য বাতায়নের সেবায় খুঁজতে হতে পারে। তাই একটি পোর্টালে তথ্য না পেলে অন্য সরকারি ব্যবস্থাতেও অনুসন্ধান করা উচিত।

অনলাইনে পুরনো জমির খতিয়ান খুঁজবেন যেভাবে

পুরনো জমির তথ্য অনুসন্ধানের আগে জমিটি কোন জেলা, উপজেলা ও মৌজায় অবস্থিত, তা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।

ধাপ ১: সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে ভূমি তথ্য বাতায়ন অথবা অনলাইন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থাপনা ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। এরপর খতিয়ান অনুসন্ধান বা ভূমি রেকর্ড-সংক্রান্ত সেবাটি নির্বাচন করুন।

ধাপ ২: জমির অবস্থান নির্বাচন করুন

অনুসন্ধান ফরমে পর্যায়ক্রমে বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা থানা এবং মৌজার তথ্য নির্বাচন করতে হবে। জমির সঠিক মৌজা নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একই দাগ বা খতিয়ান নম্বর ভিন্ন মৌজায় থাকতে পারে।

মৌজার নাম জানা না থাকলে পুরনো দলিল, খাজনার রসিদ, আগের খতিয়ান কিংবা জমিসংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন।

ধাপ ৩: জরিপের ধরন নির্বাচন করুন

জমির রেকর্ড কোন জরিপের অধীনে তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচন করতে হবে। সাধারণত সিএস (CS), এসএ (SA), আরএস (RS), বিএস (BS) বা বিএআরএস (BRS) ধরনের রেকর্ডের তথ্য অনুসন্ধান করতে হয়। এলাকাভেদে প্রযোজ্য জরিপের ধরন আলাদা হতে পারে।

ধাপ ৪: খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করুন

খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে সরাসরি অনুসন্ধান করা যায়। নম্বর জানা না থাকলে পোর্টালে থাকা বিকল্প অনুযায়ী মালিকের নাম, সাবেক খতিয়ান নম্বর, বর্তমান বা সাবেক দাগ নম্বর এবং সিএস দাগ নম্বর দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করুন।

বিশেষ করে পুরনো জমির ক্ষেত্রে সাবেক দাগ নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে অনুসন্ধান করা কার্যকর হতে পারে। কারণ, পরবর্তী জরিপে জমির দাগ নম্বর পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে।

ধাপ ৫: পাওয়া তথ্য যাচাই করুন

অনুসন্ধানের পর সংশ্লিষ্ট খতিয়ান পাওয়া গেলে সেখানে মালিকের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখুন।

নিজের কাছে থাকা দলিল, আগের খতিয়ান ও ভূমি উন্নয়ন করের রসিদের সঙ্গে এসব তথ্যের মিল আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

CS, SA, RS ও BS খতিয়ান কী?

পুরনো জমির রেকর্ড খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের খতিয়ানের নাম সামনে আসে। এগুলোর পার্থক্য জানা থাকলে সঠিক রেকর্ড খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।

সিএস (CS) খতিয়ান: ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা প্রাথমিক ভূমি জরিপের মাধ্যমে তৈরি রেকর্ড।

এসএ (SA) খতিয়ান: রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর পরবর্তী ভূমি রেকর্ড। এটি জমিদারি অধিগ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

আরএস (RS) খতিয়ান: রিভিশনাল সার্ভে বা সংশোধনী জরিপের মাধ্যমে তৈরি রেকর্ড। আগের রেকর্ডের বিভিন্ন তথ্য হালনাগাদ করার উদ্দেশ্যে এ জরিপ করা হয়।

বিএস (BS) বা বিএআরএস (BRS) খতিয়ান: বাংলাদেশ সার্ভে বা সংশ্লিষ্ট সংশোধিত জরিপের রেকর্ড হিসেবে পরিচিত।

একই জমির ক্ষেত্রে একাধিক জরিপের খতিয়ান থাকতে পারে। তাই শুধু সর্বশেষ খতিয়ান দেখলেই জমির আগের মালিকানা বা রেকর্ডের ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। প্রয়োজনে পুরনো জরিপ থেকে পরবর্তী জরিপ পর্যন্ত সব রেকর্ড মিলিয়ে দেখতে হবে।

অনলাইনে খতিয়ান না পাওয়া গেলে কী করবেন?

অনলাইনে অনুসন্ধান করেও কাঙ্ক্ষিত জমির তথ্য না পেলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সব এলাকার সব পুরনো রেকর্ড ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার ভুল মৌজা, জরিপের ধরন বা দাগ নম্বর নির্বাচন করলেও অনুসন্ধানে ফলাফল নাও আসতে পারে।

এ অবস্থায় কয়েকটি কাজ করা যেতে পারে।

জমির মৌজা ও জেএল নম্বর আবার যাচাই করুন।

সাবেক ও বর্তমান দাগ নম্বর দিয়ে আলাদাভাবে অনুসন্ধান করুন।

সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস—প্রযোজ্য অন্য জরিপ নির্বাচন করে দেখুন।

পুরনো দলিল, খাজনার রসিদ বা আগের খতিয়ান থেকে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করুন।

সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম অথবা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করুন।

অনলাইনে কোনো খতিয়ান পাওয়া না যাওয়ার অর্থ এই নয় যে জমির রেকর্ড নেই কিংবা জমির মালিকানা অবৈধ। প্রয়োজন হলে সরকারি দপ্তর থেকে রেকর্ডের সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করতে হবে।

অনলাইনে খতিয়ানের কপি পেতে কত টাকা লাগে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, খতিয়ানের অনলাইন কপি পাওয়ার জন্য আবেদন ফি ১০০ টাকা। সার্টিফায়েড বা সত্যায়িত খতিয়ানের কপির আবেদন ফি ১০০ টাকা। ডাকযোগে কপি সংগ্রহের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ৪০ টাকা ডাক মাশুল যুক্ত হয়ে মোট ১৪০ টাকা হয়।

আরও পড়ুন:

জমির মালিক কে, দাগ নম্বর দিয়ে অনলাইনে জানবেন যেভাবে

অনলাইনে নামজারি আবেদন করবেন যেভাবে, লাগবে যেসব কাগজ

একই জমির দাগ নম্বর দুই কাগজে আলাদা, কোনটি ঠিক?

মৌজা ম্যাপ সংগ্রহের নির্ধারিত ফি ৫২০ টাকা এবং দেশের ভেতরে ডাকযোগে সরবরাহের জন্য ১১০ টাকা ডাক মাশুলসহ মোট ৬৩০ টাকা।

ফি পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে ভূমি তথ্য বাতায়নের নির্ধারিত ফি পেজে সর্বশেষ তথ্য দেখে নেওয়া উচিত।

শুধু খতিয়ান দেখেই জমির মালিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়?

না। জমির খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমি রেকর্ড হলেও এটি নিজে মালিকানার দলিল নয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যাতেও খতিয়ানকে স্বত্বলিপি বা রেকর্ড অব রাইটস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মালিকানার দলিল হিসেবে নয়।

জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দলিল, আগের মালিকদের হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য এবং বাস্তব দখলসহ প্রাসঙ্গিক বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে পুরনো জমি কেনাবেচা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে একাধিক জরিপের খতিয়ান ও দলিল মিলিয়ে দেখা উচিত। জমি নিয়ে বিরোধ বা মালিকানা নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কিংবা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

জমির পুরনো তথ্য খুঁজতে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন

পুরনো জমির রেকর্ড অনলাইনে খুঁজে পাওয়া এখন আগের তুলনায় সহজ হলেও অনুসন্ধানের সময় সঠিক তথ্য দেওয়া জরুরি। মৌজা, জরিপের ধরন, খতিয়ান ও দাগ নম্বরের মধ্যে কোনো গরমিল থাকলে কাঙ্ক্ষিত রেকর্ড পাওয়া কঠিন হতে পারে।

তাই অনুসন্ধানের আগে জমির পুরনো দলিল বা অন্যান্য কাগজপত্র থেকে যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করা যায়, ততই ভালো। আর অনলাইনে পাওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ ধরে না নিয়ে প্রয়োজনীয় মূল নথি ও সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. পুরনো জমির খতিয়ান কি অনলাইনে পাওয়া যায়?

হ্যাঁ, সরকারি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থাপনা এবং ভূমি তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে অনেক এলাকার পুরনো খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়। তবে সব এলাকার সব পুরনো রেকর্ড অনলাইনে নাও থাকতে পারে।

২. খতিয়ান নম্বর না জানলে জমির তথ্য খুঁজব কীভাবে?

খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে পোর্টালের সুবিধা অনুযায়ী মালিকের নাম, সাবেক দাগ নম্বর, বর্তমান দাগ নম্বর বা সিএস দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করা যায়।

৩. পুরনো দাগ নম্বর দিয়ে কি বর্তমান দাগ নম্বর জানা সম্ভব?

সরকারি অনুসন্ধান ব্যবস্থায় সাবেক ও বর্তমান দাগ নম্বরের তথ্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে তথ্য পাওয়া গেলেই কেবল পুরনো ও বর্তমান দাগের সম্পর্ক যাচাই করা সম্ভব।

৪. অনলাইনে জমির খতিয়ান পাওয়া না গেলে কী করতে হবে?

প্রথমে মৌজা, জরিপ ও দাগ নম্বরের তথ্য পুনরায় যাচাই করতে হবে। এরপরও না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম বা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

৫. খতিয়ান কি জমির মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ?

না। খতিয়ান জমির স্বত্ব ও রেকর্ডসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি, কিন্তু এটি নিজে মালিকানার দলিল নয়। মালিকানা যাচাইয়ে দলিল, উত্তরাধিকার, নামজারি, দখল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও পরীক্ষা করতে হয়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ