ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

কাবার আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, আবাবিল নিয়ে কী বলছে ইসলাম?

ধর্ম ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ১৮:৪৫:৪৮
কাবার আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, আবাবিল নিয়ে কী বলছে ইসলাম?

পবিত্র কাবা শরিফের আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়তে দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। সম্প্রতি এমন একটি দৃশ্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ এটিকে কোরআনে বর্ণিত ‘আবাবিল পাখি’র সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন, আবার কারও প্রশ্ন—এটি কি কিয়ামতের কোনো আলামত?

কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আবাবিলের ঘটনা সত্য এবং তা কোরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত। কিন্তু বর্তমানে কাবা শরিফের ওপর উড়তে থাকা কোনো পাখিকে সেই আবাবিল বলে নিশ্চিত করার মতো দলিল নেই। একইভাবে এমন দৃশ্যকে কিয়ামতের আলামত বলারও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তবে কাবা শরিফকে ঘিরে কোরআন ও সহিহ হাদিসে ভবিষ্যতের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাই আবাবিলের ঘটনা এবং কাবা ধ্বংসসংক্রান্ত হাদিস—দুটিকে আলাদা করে বোঝা জরুরি।

কোরআনে আবাবিলের ঘটনা

আবাবিলের ঘটনা এসেছে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ফিল-এ। মাত্র পাঁচ আয়াতের এই সূরায় কাবা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আসা এক বাহিনীর পরিণতির কথা বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন—

“আর তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠিয়েছিলেন।”

এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে, ওই পাখিরা তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপ করেছিল। শেষ আয়াতে ওই বাহিনীর পরিণতিকে খাওয়া খড়ের মতো করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কোরআনের এই বর্ণনায় ঘটনাটি কোনো সাধারণ পাখির স্বাভাবিক উড়ে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি; বরং কাবা আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ শাস্তির ঘটনা হিসেবে এসেছে।

‘আবাবিল’ আসলে কী?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেকের অজানা। প্রচলিতভাবে ‘আবাবিল’কে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির পাখি হিসেবে বলা হলেও কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় বিষয়টি এত সরল নয়।

তাফসিরে ‘আবাবিল’ শব্দের অর্থ ঝাঁকে ঝাঁকে, দলবদ্ধভাবে বা একের পর এক আসা পাখি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাফসির আল-তাবারিতে শব্দটিকে বিভিন্ন দিক থেকে আসা দলবদ্ধ পাখির অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

মাআরিফুল কোরআনের তাফসিরেও বলা হয়েছে, ‘আবাবিল’ কোনো নির্দিষ্ট পাখির প্রজাতির নাম নয়; শব্দটি পাখির ঝাঁক বা দলকে বোঝায়।

অর্থাৎ, আকাশে অনেক পাখি একসঙ্গে উড়লেই সেটিকে কোরআনের ‘আবাবিল’ বলে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।

আবাবিলের পাখি দেখতে কেমন ছিল?

আসহাবে ফিলের পাখিগুলোর চেহারা নিয়ে বিভিন্ন তাফসিরে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কিছু বর্ণনায় তাদের আকার-আকৃতি ও রঙ সম্পর্কে বিস্তারিত কথা এসেছে। তবে এগুলোর সবকটিকে একই মাত্রার নির্ভরযোগ্য হাদিস হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

তাফসির গ্রন্থগুলোতে এমন বর্ণনাও রয়েছে যে, পাখিগুলো দলবদ্ধভাবে এসেছিল এবং তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে পাথর ছিল। তাফসির আল-বাগভিতে এ ধরনের কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব বিস্তারিত বর্ণনা থেকে বর্তমান যুগের কোনো পাখির প্রজাতিকে নিশ্চিতভাবে ‘আবাবিল’ বলে শনাক্ত করার সুযোগ নেই।

আসহাবে ফিল কারা ছিল?

‘আসহাবে ফিল’ অর্থ হলো হাতির অধিকারী বা হাতির বাহিনী। সূরা আল-ফিলের শুরুতেই আল্লাহ সেই বাহিনীর ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

ইসলামি ঐতিহ্যে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়েমেনের শাসক আবরাহা কাবা শরিফ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হয়েছিল। সেই বাহিনীর সঙ্গে হাতি ছিল। কাবা ধ্বংসের পরিকল্পনা নিয়ে আসা বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহ পাখি পাঠান এবং তাদের পরিণতি ভয়াবহ হয়।

কোরআনের আয়াতগুলোতে আবরাহার নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি; তাই কোরআনের নিজস্ব বক্তব্যের বাইরে ঐতিহাসিক বর্ণনার অতিরিক্ত তথ্যকে আলাদা সূত্র হিসেবে দেখা উচিত।

পাখিগুলো কী করেছিল?

সূরা আল-ফিলের তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতে বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে। প্রথমে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠানোর কথা এসেছে। এরপর তাদের দ্বারা ‘সিজ্জিল’ বা পোড়ামাটির পাথর নিক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

তাফসির আল-কুরতুবিতেও ‘আবাবিল’কে পরপর আসা দলবদ্ধ পাখি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এখানেই আবাবিলের ঘটনার বিশেষত্ব—কোরআনের বর্ণনায় এটি কেবল পাখির আগমন নয়; বরং কাবা আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহর শাস্তির একটি বিশেষ ঘটনা।

বর্তমান কাবার ওপর পাখির ঝাঁক কি সেই আবাবিল?

এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।

কোনো ভিডিও বা ছবিতে কাবা শরিফের ওপর পাখির ঝাঁক দেখা গেলেই সেটিকে ১৪০০ বছরেরও বেশি আগের আসহাবে ফিলের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যায় না।

কারণ কোরআনে আবাবিলের ঘটনা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে বর্তমানে কাবার আকাশে পাখির উপস্থিতি একটি আলাদা ঘটনা। পাখিগুলোর প্রজাতি, তাদের আচরণ বা সেখানে আসার কারণ নিশ্চিত না করে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেওয়া সতর্কতার সঙ্গে এড়ানো উচিত।

এটি কি কিয়ামতের আলামত?

কাবার ওপর পাখির ঝাঁক দেখা কিয়ামতের আলামত—এমন কোনো সহিহ হাদিস নেই।

কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে কোরআন ও সহিহ হাদিসে বিভিন্ন বিষয় বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কাবা শরিফের ওপর পাখির ঝাঁক উড়ে যাওয়াকে সেই তালিকায় রাখা হয়নি।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো দৃশ্য দেখে সেটিকে কিয়ামতের আলামত ঘোষণা করা ধর্মীয় দলিলের দিক থেকে সমর্থনযোগ্য নয়।

তবে কাবা নিয়ে কিয়ামতের আগে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আছে

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কাবা শরিফের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক সহিহ হাদিস রয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইথিওপিয়া বা হাবশার এক ব্যক্তি, যাকে ‘দু-সুয়াইকাতাইন’—অর্থাৎ সরু পায়ের অধিকারী বলা হয়েছে—কাবা ধ্বংস করবে।

সহিহ মুসলিমেও একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, হাবশার ‘দু-সুয়াইকাতাইন’ কাবা ধ্বংস করবে।

অর্থাৎ কাবার ভবিষ্যৎ ধ্বংসের বিষয়টি সহিহ হাদিসে আছে। কিন্তু এই হাদিসের সঙ্গে বর্তমান সময়ে কাবার ওপর পাখির ঝাঁক দেখা যাওয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক বর্ণিত হয়নি।

কাবার দিকে আসা একটি বাহিনী মাটিতে ধসে যাবে

কাবা শরিফকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সহিহ হাদিস রয়েছে।

সহিহ মুসলিমে আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, একদল মানুষ কাবা শরিফের আশ্রয় নেওয়া একজন ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে এগিয়ে যাবে। তারা যখন একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে পৌঁছাবে, তখন তাদের মাটিতে ধসিয়ে দেওয়া হবে। সাহাবিরা জানতে চেয়েছিলেন—যারা নিজেদের ইচ্ছায় ওই বাহিনীর সঙ্গে যায়নি, তাদের কী হবে?

হাদিসে বলা হয়েছে, তাদেরও সেই ধসের মধ্যে পড়তে হবে; তবে কিয়ামতের দিন প্রত্যেককে তার নিয়ত অনুযায়ী উঠানো হবে।

এটি কাবাকে ঘিরে ভবিষ্যৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সহিহ হাদিসে এসেছে।

কাবার মর্যাদা সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য

কাবা শুধু একটি স্থাপনা নয়; ইসলামে এটি পবিত্র ঘর হিসেবে মর্যাদাপ্রাপ্ত। কোরআনে কাবাকে মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত পবিত্র কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সহিহ বুখারির হজ অধ্যায়ের একটি অধ্যায়েও কাবাকে পবিত্রতার কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়েও কাবার কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটেছিল। আয়িশা (রা.)-কে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর সম্প্রদায় সদ্য ইসলাম গ্রহণ না করলে তিনি কাবা ভেঙে ইবরাহিম (আ.)-এর ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতেন এবং এতে দুটি দরজা রাখতেন। এই বর্ণনাটি সহিহ মুসলিমে রয়েছে।

এটি দেখায়, কাবার ইতিহাসে নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের বিষয়ও হাদিসে আলোচিত হয়েছে।

কাবা ধ্বংসের হাদিস আর আবাবিলের ঘটনা কি একই?

না। দুটি ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা।

আবাবিলের ঘটনা কোরআনে আসহাবে ফিলের সময় কাবা আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য ও শাস্তির ঘটনা হিসেবে এসেছে।

অন্যদিকে দু-সুয়াইকাতাইনের হাতে কাবা ধ্বংসের ঘটনা ভবিষ্যৎ সময়ের একটি ঘটনা হিসেবে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

তাই বর্তমান কাবার আকাশে পাখি দেখা—আবাবিলের ঘটনা—এবং ভবিষ্যতে কাবা ধ্বংসের হাদিসকে একসঙ্গে মেলানোর কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

ধর্মীয় বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তার সঙ্গে কোরআন-হাদিসের ঘটনা মিলিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু কোনো দৃশ্য সত্যিই কোনো ধর্মীয় নিদর্শন বা কিয়ামতের আলামত কি না, তা নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন।

বিশেষ করে ‘আবাবিল’ শব্দটি নিয়ে বিভ্রান্তির কারণ হলো—অনেকে এটিকে একটি নির্দিষ্ট পাখির নাম হিসেবে ব্যবহার করেন। অথচ তাফসিরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাগুলোতে শব্দটির অর্থ দলবদ্ধ বা ঝাঁকে আসা পাখি হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

তাহলে ভাইরাল দৃশ্যের সঠিক ব্যাখ্যা কী?

কাবা শরিফের আকাশে পাখির ঝাঁক দেখা যাওয়ার দৃশ্য আকর্ষণীয় হতে পারে। কিন্তু শুধু এই দৃশ্যের ভিত্তিতে তিনটি দাবি করা ঠিক হবে না—

এগুলো কোরআনে বর্ণিত আবাবিল—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা—এমন প্রমাণ নেই।

এটি কিয়ামতের আলামত—এমন সহিহ হাদিস নেই।

বরং কোরআন-হাদিসের নিশ্চিত তথ্য হলো—আসহাবে ফিলের ঘটনায় আল্লাহ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠিয়েছিলেন; ভবিষ্যতে কাবা ধ্বংসের বিষয়েও সহিহ হাদিস রয়েছে; আর কাবার দিকে আক্রমণকারী একটি বাহিনীকে মাটিতে ধসিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

সুতরাং কাবার ওপর পাখির ঝাঁক দেখা নিঃসন্দেহে একটি দৃশ্যমান ঘটনা হতে পারে, কিন্তু সেটিকে সরাসরি ‘আবাবিলের প্রত্যাবর্তন’ বা ‘কিয়ামতের আলামত’ বলা কোরআন-হাদিসের দলিলের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যায় না।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: