ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

স্বর্ণের দাম উঠেও কেন সাত সপ্তাহের সর্বনিম্নে

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৯ ১৫:২৪:০০
স্বর্ণের দাম উঠেও কেন সাত সপ্তাহের সর্বনিম্নে

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে মঙ্গলবার সামান্য পুনরুদ্ধার দেখা গেলেও বড় চিত্রে পরিস্থিতি এখনও চাপের মধ্যেই রয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর সোমবার সবচেয়ে নিচের পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর মঙ্গলবারও সাত সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন দামের আশপাশেই ঘুরছে মূল্যবান ধাতুটির বাজার। ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও কিছু সময় উঁচু পর্যায়ে রাখতে পারে—বিনিয়োগকারীদের এমন আশঙ্কাই স্বর্ণের ওপর চাপ ধরে রেখেছে। খবর রয়টার্সের।

মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় বিকাল ৪টা ৭ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট স্বর্ণের দাম ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৩০ দশমিক ৫৮ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। তবে এই সামান্য উত্থানও স্বর্ণকে সাম্প্রতিক নিম্নস্তর থেকে খুব বেশি দূরে নিতে পারেনি।

ফিউচার মার্কেটেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে পরবর্তী সময়ে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার চুক্তির দাম ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। ফলে প্রতি আউন্সের দাম নেমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৬২ দশমিক ২০ ডলারে।

বাজারে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ফেডকে ঘিরে

স্বর্ণের বাজারের বর্তমান গতিপথ বুঝতে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সিএমইর ফেডওয়াচ টুলে দেখা যাচ্ছে, অক্টোবরে ফেডের বৈঠকে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা বর্তমানে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এই সম্ভাবনার হিসাব ছিল ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

ফেডের গভর্নর লিসা কুকও আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বাড়তি চাহিদা এবং তেলের উচ্চ দাম মূল্যস্ফীতির চাপ বজায় রাখার অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে সুদের হার আরও বাড়ানোর প্রয়োজন হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

বাজার বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার তাহিরের ব্যাখ্যায়, মূল্যস্ফীতি যদি উচ্চ পর্যায়ে থাকে এবং অর্থনীতিও শক্তিশালী থাকে, তাহলে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও কিছুদিন উচ্চ পর্যায়ে রাখার অবস্থান নিতে পারে। এমন পরিবেশে স্বর্ণের দাম আরও কমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তেলের দামও স্বর্ণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে

স্বর্ণের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তেলের মূল্য। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে টানা দ্বিতীয় কার্যদিবসে তেলের দাম বেড়েছে।

তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে পণ্য ও সেবা উৎপাদনের পাশাপাশি সেগুলোর সরবরাহ ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তখন সুদের হার বাড়ানোর পথে যেতে পারে।

আর এখানেই স্বর্ণের জন্য তৈরি হয় নতুন চাপ। স্বর্ণ থেকে বিনিয়োগকারীরা কোনো সুদ পান না। ফলে সুদের হার বেড়ে গেলে সুদভিত্তিক সম্পদ তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং স্বর্ণে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও নজরে

স্বর্ণের বাজারে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও রয়েছে বলে মনে করছেন ক্রিস্টোফার তাহির। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লে তেলের দাম ও সুদের হার বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে স্বর্ণের ওপর চাপ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে পরিস্থিতির উত্তেজনা কমে গেলে স্বর্ণের ওপর সেই চাপও কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এর মধ্যেই সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন বলে দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সামনে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অর্থনৈতিক তথ্য

স্বর্ণের বাজারে এখন শুধু ফেডের সিদ্ধান্ত নয়, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন অর্থনৈতিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহে ভোক্তা আস্থা, চাকরির শূন্য পদ, বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান, ব্যক্তিগত ভোগব্যয় এবং কৃষিখাতের বাইরে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।

বিনিয়োগকারীরা এসব তথ্যের দিকে নজর রাখছেন। কারণ অর্থনীতির অবস্থা ও মূল্যস্ফীতির গতিপথ সম্পর্কে এসব তথ্য বাজারের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে।

অন্য মূল্যবান ধাতুতেও পতন

মঙ্গলবার স্বর্ণের বিপরীতে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বেশির ভাগের দাম কমেছে।

রুপার দাম ০ দশমিক ৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬০ দশমিক ৪২ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৬৯৭ দশমিক ৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

প্যালাডিয়ামের বাজারেও পতন দেখা গেছে। ধাতুটির দাম ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ২০৫ দশমিক ২৭ ডলারে নেমেছে।

অর্থাৎ মঙ্গলবার স্বর্ণে সামান্য উত্থান দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে মূল্যবান ধাতুর বাজারে চাপের চিত্রই স্পষ্ট। বিশেষ করে ফেডের সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, তেলের দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি—এই বিষয়গুলোই স্বর্ণের পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: