ঢাকা, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

জার্মানিতে জেন-জি বিক্ষোভে সহিংসতা, দোকানে লুটপাট

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০১ ১৪:৪২:১৭
জার্মানিতে জেন-জি বিক্ষোভে সহিংসতা, দোকানে লুটপাট

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বাতিলের দাবিতে জার্মানির রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। তবে শনিবারের (৩১ অক্টোবর) এই জেন-জি আন্দোলন কয়েকটি শহরে সহিংস রূপ নেয়। বিশেষ করে ফ্রাঙ্কফুর্টের কেন্দ্রস্থলে দোকানপাটে লুটপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং পুলিশের দিকে মোলোটভ ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে।

জার্মানির বিভিন্ন শহরে একযোগে কর্মসূচি পালিত হলেও ফ্রাঙ্কফুর্টে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। শহরটির অন্তত দুটি দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের দিকে ককটেল বা মোলোটভ ককটেল ছুড়লে উত্তেজনা আরও বাড়ে।

ফ্রাঙ্কফুর্টের কেন্দ্রস্থলে সহিংসতা, সতর্ক করল পুলিশ

পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সতর্কবার্তা দিয়েছে ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় সহিংস বিশৃঙ্খলা চলছিল। কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙার পাশাপাশি জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করেও মোলোটভ ককটেল ছোড়া হচ্ছিল।

এ অবস্থায় সাধারণ মানুষকে শহরের কেন্দ্রস্থলে না যাওয়ার পরামর্শ দেয় পুলিশ। যারা ওই এলাকায় ছিলেন, তাদের সেখান থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

শুধু ফ্রাঙ্কফুর্টেই নয়, হ্যালোইন উৎসবের দিন জার্মানির আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। হামবুর্গের কয়েকটি জায়গায় ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব

বিক্ষোভে কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে আয়োজক ও পুলিশের দেওয়া তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। আন্দোলনের পূর্বাভাসে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষের সমাগমের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিন—এই তিন শহরে মোট বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ হাজার।

অন্যদিকে, আন্দোলনের আয়োজকদের ওয়েবসাইটে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৩৬ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামরিক সেবার বিরোধিতা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যেও বাড়তি বিনিয়োগের দাবি

আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে একাধিক বিষয়। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরও বিনিয়োগ, জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝা ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়ার দাবি তুলেছেন তাঁরা।

বার্লিনের সমাবেশে বক্তব্য দেন জেন-জি রেজেল্ট সংগঠনের মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যুদ্ধ ও বাধ্যবাধকতার বিপরীতে শান্তি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে তরুণদের অবস্থান। তিনি জানান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নত সহায়তা নিশ্চিত করাও তাঁদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

মিউনিখের কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্টিভ চ্যান্সেলরের। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তরুণদের উদ্বেগের জবাবে সরকার ছাঁটাই এবং বাড়তি বোঝা চাপানোর মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তরুণদের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার অধিকার প্রয়োগ অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়েও ক্ষোভ

আন্দোলনের বিষয়বস্তু সামরিক সেবা কিংবা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর দুরবস্থা নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

বার্লিন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শন বেকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও শ্রেণিকক্ষের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বর্ণনায়, কিছু কক্ষ ও ভবন এতটাই জরাজীর্ণ যে সেগুলোকে পরিত্যক্ত স্থাপনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। অথচ শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সেসব জায়গাতেই ক্লাস করতে হচ্ছে।

সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগাম প্রস্তুতি

বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন জার্মানির হেসি রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পসেক। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ফ্রান্সে অতীতে সংঘটিত সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের প্রসঙ্গ টানেন।

তাঁর মতে, দোকানপাটে লুটতরাজ, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া কিংবা কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনাকে অনুসরণ করার মতো কোনো দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

এদিকে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় বিভিন্ন শহরের কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগেভাগেই নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়। বার্লিনের অভিজাত কুর্ফুর্স্টেনডাম শপিং অ্যাভিনিউসহ কয়েকটি এলাকার দোকানের সামনের অংশ কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

আন্দোলন থেকে দূরে জাতীয় শিক্ষার্থী সংস্থা

চলমান বিক্ষোভে অংশ নেয়নি জার্মানির জাতীয় শিক্ষার্থী সংস্থা বিএসকে। সংগঠনটি এই আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে রাখার অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি আগামী ২০ নভেম্বর আলাদা কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে তারা।

সাম্প্রতিক সময়ে সার্বিয়া ও ফ্রান্সে জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণবিক্ষোভের পর এবার জার্মানিতেও তরুণদের অসন্তোষ বড় পরিসরে সামনে এল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা, দৈনন্দিন জীবনযাপনের খরচ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা নিয়ে তাঁদের আপত্তি দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. জার্মানিতে জেন-জি প্রজন্মের তরুণেরা কেন বিক্ষোভ করছেন?

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝার ন্যায্য বণ্টনের দাবিতে তাঁরা বিক্ষোভ করছেন।

২. জার্মানির কোন শহরে বিক্ষোভে লুটপাট ও ভাঙচুর হয়েছে?

ফ্রাঙ্কফুর্টের কেন্দ্রস্থলে অন্তত দুটি দোকানে লুটপাট এবং কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামবুর্গের কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেডেও আগুন দেওয়া হয়েছে।

৩. ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনে কতজন বিক্ষোভকারী অংশ নেন?

পুলিশের হিসাবে, এই তিন শহরে সব মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে আয়োজকদের ওয়েবসাইটে সংখ্যাটি ৩৬ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

৪. বিক্ষোভে তরুণদের প্রধান দাবিগুলো কী?

তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নত সহায়তা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝার ন্যায্য বণ্টন।

৫. জার্মানির জাতীয় শিক্ষার্থী সংস্থা বিএসকে কি এই আন্দোলনে যুক্ত?

না। বিএসকে চলমান আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। সংগঠনটি আগামী ২০ নভেম্বর পৃথক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: