ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ইরানের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অ্যাক্সিওসের খবর, যা বললেন ট্রাম্প

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৯ ১৫:৩১:০৪
ইরানের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অ্যাক্সিওসের খবর, যা বললেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থামাতে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং দেশটির আটক সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে—এমন খবর নিয়ে সরাসরি নিজের অবস্থান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে এমন কোনো প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র দেয়নি। একই সঙ্গে অ্যাক্সিওসের প্রকাশিত প্রতিবেদনটিকে ‘ভুয়া’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। তেহরানও জানিয়েছে, কাতারের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে পাঠানো সাত দফা পরিকল্পনার বিষয়ে তারা এখনো ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে যে দাবি ছিল

অ্যাক্সিওসের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকের প্রকাশিত খবরে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়ার বিনিময়ে তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া এবং আটক সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প রাজি।

খবরটি প্রকাশের পর তা নিয়ে আলোচনা শুরু হলে ট্রাম্প নিজেই এর জবাব দেন। সোমবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, অ্যাক্সিওসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে তিনি ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং জব্দ সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তার দাবি, এটি সত্য নয় এবং তিনি ইরানকে কোনো প্রস্তাব দেননি।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া’ বলার পাশাপাশি ট্রাম্প অভিযোগ করেন, অন্যান্য অনেক প্রতিবেদনের মতো এটিও ট্রাম্পবিরোধী মানসিকতাকে তৃপ্ত করার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।

তেহরানের হাতে রয়েছে সাত দফা পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব দেওয়ার কথা ট্রাম্প অস্বীকার করলেও ইরান নিজের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটনের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

সোমবার যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন করে বৈঠক করেন ইরানের প্রতিনিধিরা। আলোচনা শেষে তারা নিউইয়র্ক থেকে তেহরানের উদ্দেশে রওনা হন।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কাতারের একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ওই বৈঠক সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। তিনি জানান, কাতারের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যে সাত দফা পরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে, সেটির আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান।

ইরানের প্রত্যাশা, মঙ্গলবারের মধ্যেই হোয়াইট হাউস থেকে সেই জবাব পাওয়া যাবে।

ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনাকে আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের অবস্থান জানানোও তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল। তার ভাষায়, প্রস্তাবের শর্তগুলো ‘অত্যন্ত ন্যায্য ও যৌক্তিক’।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান বদলের দাবি নাকচ

চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে নমনীয় অবস্থান নিতে পারে—গণমাধ্যমে এমন যে খবর এসেছে, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছেন আরাঘচি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, গত কয়েক ঘণ্টায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন কিছু প্রচার হয়েছে, যেখানে ইরানের ওপর বিভিন্ন বিষয় আরোপ করার কথা বলা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

হরমুজ প্রণালি খোলার ক্ষেত্রেও তেহরানের শর্ত স্পষ্ট রয়েছে বলে জানান তিনি।

হরমুজ নিয়ে আগেই দুই পক্ষের মতবিরোধ

ইরানের সাত দফা পরিকল্পনা এবং কাতারের মধ্যস্থতা নতুন করে আলোচনায় এলেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের পার্থক্য আগেই প্রকাশ্যে এসেছে।

গত শনিবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তেহরান দ্রুত একটি চুক্তি করে হরমুজ প্রণালি খুলতে চাইছে, কারণ তারা ‘খুব বাজেভাবে হারছে’।

ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের পর টেলিগ্রামে প্রতিক্রিয়া জানান আরাঘচি। তিনি বলেন, তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক জবাবের জন্য অপেক্ষা করবে।

এর আগের দিন, গত শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আরাঘচি বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে’ চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব শর্ত দুই দেশের মধ্যে জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ রয়েছে।

তবে সেই প্রস্তাবের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তাদের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করছি।’

হরমুজ প্রণালি ঘিরে কেন এত গুরুত্ব

হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ গ্যাস ও তেল সরবরাহ পরিবহন করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।

যদিও ট্রাম্পের দাবি, হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ইতোমধ্যেই ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে এবং ‘বিপুল পরিমাণ তেল’ এই জলপথ দিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, তেহরান একটি চুক্তি করতে চায় এবং তিনিও চুক্তি করতে আগ্রহী। কিন্তু ইরানের দেওয়া প্রস্তাবকে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।

ট্রাম্পের এই অবস্থানকে তেহরান ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছিল।

এখন কীসের অপেক্ষা

সোমবার কাতারের প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে বৈঠক করার পর ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের বার্তাও তেহরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইরান এখনো ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং আটক সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার খবর ট্রাম্প সরাসরি অস্বীকার করেছেন। ফলে যুদ্ধের অবসান, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি খোলার প্রশ্নে দুই পক্ষের আলোচনার পরবর্তী পদক্ষেপ এখন যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: