ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

জমির দলিল আসল না নকল, বুঝবেন যেভাবে

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৯ ২২:০২:৩২
জমির দলিল আসল না নকল, বুঝবেন যেভাবে

জমি কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো ভুয়া বা জাল দলিলের ওপর নির্ভর করে টাকা পরিশোধ করা। শুধু কাগজে সিল, স্বাক্ষর, দলিল নম্বর বা স্ট্যাম্প থাকলেই কোনো দলিলকে আসল ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। দলিলটি সত্যিই নিবন্ধিত কি না, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মেলে কি না, বিক্রেতার মালিকানা ও খতিয়ানের তথ্য ঠিক আছে কি না—এসব যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের নিবন্ধন আইনে নিবন্ধিত দলিলের রেকর্ড সংরক্ষণ এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই রেকর্ডের প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে কোনো জমির দলিলের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মূল কাগজ দেখার পাশাপাশি সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি।

শুধু মূল দলিল দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন না

অনেকের ধারণা, পুরোনো কাগজ, সরকারি সিল, স্বাক্ষর কিংবা স্ট্যাম্প থাকলেই দলিল আসল। বাস্তবে এগুলো দেখে একা দলিলের সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না।

একটি দলিলের ক্ষেত্রে দলিল নম্বর, সাল, নিবন্ধনের অফিস, পক্ষগুলোর নাম, জমির মৌজা, দাগ, খতিয়ান, জমির পরিমাণসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

Registration Act, 1908 অনুযায়ী নিবন্ধনের পর সংশ্লিষ্ট দলিলে নিবন্ধনের সনদ দেওয়া হয়, যেখানে নিবন্ধনের নম্বর ও যে বইয়ের যে পৃষ্ঠায় দলিলটি নকল করা হয়েছে, তার তথ্য থাকে। নিবন্ধন কর্মকর্তার স্বাক্ষর, সিল ও তারিখও এতে থাকে।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন

দলিল আসল কি না যাচাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে দলিলের তথ্য মিলিয়ে দেখা।

বিশেষ করে যাচাই করতে হবে—

দলিল নম্বর

দলিলের সাল ও তারিখ

কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত

ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম

জমির মৌজা

দাগ নম্বর

খতিয়ান নম্বর

জমির পরিমাণ

জমির শ্রেণি

দলিলের নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য

দলিলে থাকা তথ্যের সঙ্গে সরকারি রেকর্ডে অসঙ্গতি থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার।

প্রত্যয়িত নকল নিয়ে যাচাই করুন

কোনো নিবন্ধিত দলিলের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড থেকে প্রত্যয়িত অনুলিপি বা Certified Copy সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

Evidence Act, 1872-এর 76 ধারায় সরকারি হেফাজতে থাকা এবং আইন অনুযায়ী পরিদর্শনের অধিকার থাকা সরকারি নথির প্রত্যয়িত অনুলিপি দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই আইনের 79 ধারায় আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে প্রত্যয়িত সরকারি নথির সত্যতা সম্পর্কে আদালতের অনুমানের কথাও বলা হয়েছে।

তাই কারও দেওয়া ফটোকপি বা স্ক্যান কপির ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে প্রত্যয়িত কপি সংগ্রহ করে তুলনা করা নিরাপদ পদ্ধতি।

দলিলের দাগ ও খতিয়ান মিলিয়ে দেখুন

জমির দলিল যাচাইয়ের সময় শুধু দলিলের নাম বা নম্বর দেখলে হবে না। দলিলে উল্লেখ থাকা দাগ ও খতিয়ান নম্বর সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন নির্দেশিকাতেও দলিলসূত্রে জমির মালিকানা দাবি করার ক্ষেত্রে দলিল নম্বর, দলিলের তারিখ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম এবং রেকর্ডীয় মালিকের তথ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ দলিলের তথ্য এবং ভূমি রেকর্ড—দুই জায়গার তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিক্রেতার নাম খতিয়ানে আছে কি না দেখুন

কেউ একটি দলিল দেখিয়ে জমির মালিক দাবি করলেই তাকে বৈধ মালিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিক্রেতার মালিকানা কীভাবে এসেছে, সেটিও যাচাই করতে হবে।

রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি প্রশাসন-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনায় রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের পর খতিয়ানে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।

তাই বিক্রেতার দেওয়া দলিলের সঙ্গে সর্বশেষ খতিয়ান ও নামজারির তথ্যও মিলিয়ে দেখা উচিত।

আগের দলিলের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করুন

একটি জমির বর্তমান মালিক কীভাবে মালিক হয়েছেন, সেটি বোঝার জন্য আগের দলিলগুলো দেখা দরকার। বিশেষ করে জমিটি যদি একাধিকবার হাতবদল হয়ে থাকে, তাহলে মালিকানার ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে শুধু সর্বশেষ দলিল নয়, প্রয়োজনে পূর্ববর্তী মালিকের দলিল, উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা হলে সংশ্লিষ্ট নথি এবং নামজারি রেকর্ডও দেখা উচিত।

একটি দলিল সত্যি হলেও জমির মালিকানা নিয়ে অন্য জটিলতা থাকতে পারে—তাই ‘দলিল আসল’ এবং ‘জমিটি নিরাপদে কেনা যাবে’—এই দুই বিষয়কে এক মনে করা ঠিক নয়।

জমির পরিমাণ ও সীমানা সরেজমিনে যাচাই করুন

দলিলে জমির পরিমাণ লেখা থাকলেও বাস্তবে জমির অবস্থান ও সীমানা একই আছে কি না তা দেখে নেওয়া দরকার।

যাচাই করুন—

দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণ

খতিয়ানে থাকা জমির পরিমাণ

দাগ নম্বর

চারপাশের সীমানা

জমির বাস্তব অবস্থান

রাস্তা বা সংলগ্ন জমির অবস্থান

Registration Act-এর অধীনে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সম্পত্তির বিবরণ সঠিকভাবে উপস্থাপন করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জমি-সংক্রান্ত দলিল কোথায় নিবন্ধিত হবে, সে সম্পর্কেও আইনে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিক্রেতার পরিচয়ও যাচাই করা জরুরি

দলিলের বিক্রেতা এবং বাস্তবে আপনার সামনে থাকা ব্যক্তি একই ব্যক্তি কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

Registration Act-এর 34 ধারায় নিবন্ধনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি, দলিলটি তিনি সম্পাদন করেছেন কি না এবং তার পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে নিবন্ধন কর্মকর্তার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

তাই জমি কেনার আগে বিক্রেতার পরিচয়, মালিকানার কাগজ এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

দলিলে কাটাছেঁড়া বা অস্বাভাবিক সংশোধন দেখলে সতর্ক হোন

দলিলের কোনো অংশে অস্বাভাবিক কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা, ভিন্ন কালি ব্যবহার, অস্পষ্ট নম্বর, অস্বাভাবিক সিল বা সংশোধন দেখা গেলে বিষয়টি যাচাই না করে এগোনো ঠিক নয়।

তবে শুধু কাগজের চেহারা দেখে দলিলকে নকল বলা যাবে না। কারণ পুরোনো নথিতে স্বাভাবিকভাবেও কাগজের ক্ষয়, কালি বা ছাপের পার্থক্য থাকতে পারে। চূড়ান্ত যাচাইয়ের জন্য সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দলিলের নিবন্ধন নম্বর থাকলেই সব ঝুঁকি শেষ নয়

এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো দলিলের নিবন্ধন নম্বর পাওয়া গেলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে জমিটি কেনার ক্ষেত্রে আর কোনো ঝুঁকি নেই।

কারণ দলিলের নিবন্ধন সত্য হলেও—

বিক্রেতার বর্তমান মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে;

একই জমির অন্য অংশ নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে;

উত্তরাধিকারীদের দাবি থাকতে পারে;

খতিয়ান ও দখলের মধ্যে অসঙ্গতি থাকতে পারে;

জমির পরিমাণ বা সীমানা নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে।

তাই দলিলের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি জমির মালিকানা ও রেকর্ডও যাচাই করতে হবে।

রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্যের সঙ্গে মিল না থাকলে কী করবেন?

দলিলের তথ্য এবং সরকারি রেকর্ডের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেলে তাড়াহুড়া করে টাকা দেওয়া বা জমি রেজিস্ট্রি করা উচিত নয়।

প্রথমে কোন তথ্যটি সঠিক এবং কেন পার্থক্য তৈরি হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি ও ভূমি কর্তৃপক্ষের নথি দেখে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে ভূমি আইনজীবী বা অভিজ্ঞ পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

আর দলিলের নিবন্ধন নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিরোধ তৈরি হলে Registration Act-এ নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়াও রয়েছে। যেমন, দলিল সম্পাদনের বিষয়টি কোনো পক্ষ অস্বীকার করায় সাব-রেজিস্ট্রার নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করার বিধান রয়েছে।

জমির দলিল যাচাইয়ের সহজ চেকলিস্ট

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

জমির দলিল আসল কি না বোঝার সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি শুধু কাগজের চেহারা পরীক্ষা করা নয়। দলিলে থাকা তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, প্রয়োজন হলে নিবন্ধন রেকর্ডের প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা এবং একই সঙ্গে খতিয়ান, দাগ, নামজারি, জমির পরিমাণ ও মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করা জরুরি।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—আসল দলিল মানেই জমিটি সব ধরনের আইনি ঝুঁকি থেকে মুক্ত—এমন নয়। তাই বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনের আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসের রেকর্ড যাচাই করে, প্রয়োজন হলে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে এগোনো উচিত।

FAQ

প্রশ্ন: শুধু মূল দলিল দেখেই কি বোঝা যায় দলিলটি আসল?

উত্তর: না। দলিলের নম্বর, তারিখ, পক্ষগুলোর নাম, জমির বিবরণসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

প্রশ্ন: দলিলের প্রত্যয়িত নকল কী?

উত্তর: সরকারি হেফাজতে থাকা নথির আইনসম্মতভাবে প্রত্যয়িত অনুলিপিকে Certified Copy বলা হয়। Evidence Act-এর 76 ধারায় নির্দিষ্ট সরকারি নথির প্রত্যয়িত কপি দেওয়ার বিধান রয়েছে।

প্রশ্ন: দলিল আসল হলেও কি জমি কেনার ক্ষেত্রে সমস্যা থাকতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ। দলিলটি সত্যিই নিবন্ধিত হলেও বর্তমান মালিকানা, উত্তরাধিকার, খতিয়ান, দখল, সীমানা বা অন্য কোনো দাবি নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে। তাই দলিলের সত্যতার পাশাপাশি জমির মালিকানা ও রেকর্ডও যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন: দলিল যাচাইয়ের সময় কোন তথ্যগুলো সবচেয়ে বেশি মিলিয়ে দেখা উচিত?

উত্তর: দলিল নম্বর ও তারিখ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয়, মৌজা, দাগ, খতিয়ান, জমির পরিমাণ এবং সীমানা—এসব তথ্য সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: জমি কেনার পর নামজারি করা কি প্রয়োজন?

উত্তর: জমি রেজিস্ট্রি হওয়ার পর মালিকানা পরিবর্তনের কারণে ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় দলিলসূত্রে মালিকানা অর্জনের ক্ষেত্রে দলিল নম্বর, তারিখ ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: