ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে যে ৭ ধরনের সমস্যা হতে পারে

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০১ ২১:৩৬:৫৭
অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে যে ৭ ধরনের সমস্যা হতে পারে

খাবারে একটু বেশি লবণ না হলে অনেকেরই স্বাদ ঠিক মনে হয় না। কিন্তু প্রতিদিনের এই ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে শরীরে বাড়িয়ে দিতে পারে সোডিয়ামের পরিমাণ। অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, আর দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শুধু রান্নার লবণ নয়, প্যাকেটজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, সস ও রেস্তোরাঁর খাবার থেকেও শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম ঢুকতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ২,০০০ মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম, অর্থাৎ ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ৫ গ্রাম লবণ মোটামুটি এক চা-চামচের সমান। তবে এখানে রান্নার সময় আলাদা করে দেওয়া লবণই শুধু নয়—খাবারে আগে থেকেই থাকা লবণও এই হিসাবের মধ্যে পড়ে।

অতিরিক্ত লবণ শরীরে কীভাবে প্রভাব ফেলে?

লবণের প্রধান উপাদান সোডিয়াম। শরীরের স্বাভাবিক তরল ভারসাম্য, স্নায়ু ও পেশির কাজের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ সোডিয়াম প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সোডিয়াম গ্রহণ করলে শরীরে পানি ধরে রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং রক্তচাপও বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে নিয়মিত বেশি লবণ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে বিষয়টি শুধু সাময়িক তৃষ্ণা বা শরীরে পানি জমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

১. বাড়তে পারে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি

অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর একটি হলো রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া। বেশি সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা রক্তচাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সমস্যার বিষয় হলো, উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘদিন থাকতে পারে। ফলে খাবারে লবণ বেশি হলেও অনেকে বিষয়টি টের পান না। নিয়মিত অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস তাই দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

২. হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে

অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়ানোর মাধ্যমে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। WHO উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণকে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং উচ্চ রক্তচাপকে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

CDC-ও বলছে, অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং এর ফলে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।

৩. কিডনির ওপর বাড়তে পারে চাপ

শরীরের অতিরিক্ত সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণে কিডনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নিয়মিত বেশি সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়ানোর মাধ্যমে কিডনির স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

WHO উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণকে কিডনি রোগের বাড়তি ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করেছে। American Heart Association-ও অতিরিক্ত সোডিয়ামের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির তালিকায় কিডনি রোগের কথা উল্লেখ করেছে।

৪. শরীরে পানি জমে ফোলা বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যা হতে পারে

একবারে বা নিয়মিত বেশি সোডিয়াম খেলে শরীরে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে শরীর ফোলা, পেট ফাঁপা বা ওজন সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

তবে শরীর ফুলে যাওয়ার পেছনে শুধু লবণ দায়ী নয়। কিডনি, হৃদ্‌যন্ত্রসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত কারণেও এমন সমস্যা হতে পারে। তাই অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী ফোলা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

৫. দীর্ঘমেয়াদে কিডনি স্টোনসহ কিছু সমস্যার ঝুঁকি থাকতে পারে

অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে কিডনি স্টোনের সম্পর্কও উল্লেখ করেছে American Heart Association। একই সঙ্গে WHO উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে কিডনি রোগের ঝুঁকির সম্পর্কের কথা জানিয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বেশি লবণ খেলেই প্রত্যেকের কিডনি স্টোন হবে। খাদ্যাভ্যাস, পানি পান, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

৬. পেটের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ সোডিয়াম গ্রহণের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে শুধু একটি খাবারের অভ্যাসকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়; সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হয়।

৭. হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে

অতিরিক্ত লবণ বা সোডিয়াম গ্রহণের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে osteoporosis বা হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার কথাও American Heart Association উল্লেখ করেছে।

তবে হাড়ের স্বাস্থ্য নির্ধারণে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, বয়স, শারীরিক সক্রিয়তা এবং অন্যান্য খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু লবণ কমানোকে হাড়ের রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

শুধু রান্নার লবণেই কি সমস্যা?

না। অনেকেই মনে করেন, খাবারে বাড়তি লবণ না দিলেই সোডিয়াম কম খাওয়া হচ্ছে। বাস্তবে প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম পাওয়া যেতে পারে। সস, ইনস্ট্যান্ট খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস, বিভিন্ন প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, রেস্তোরাঁর খাবারসহ অনেক খাবারে লুকানো সোডিয়াম থাকতে পারে।

এমনকি কোনো খাবারের স্বাদ খুব বেশি নোনতা না হলেও তাতে সোডিয়াম বেশি থাকতে পারে। CDC এ কারণে খাবারের প্যাকেটের পুষ্টি-তথ্যের লেবেল দেখে সোডিয়ামের পরিমাণ যাচাই করার পরামর্শ দেয়।

দিনে কতটা লবণ খাওয়া উচিত?

WHO-এর সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত, যা ২,০০০ মিলিগ্রামের কম সোডিয়ামের সমান।

অন্যদিকে American Heart Association অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে ২,৩০০ মিলিগ্রামের বেশি সোডিয়াম না খাওয়ার পরামর্শ দেয় এবং অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য আদর্শ লক্ষ্য হিসেবে ১,৫০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখার কথা বলে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সোডিয়াম কমানোর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—লবণ ও সোডিয়াম এক জিনিস নয়। লবণের মধ্যে সোডিয়াম থাকে। তাই কোনো খাবারের লেবেলে সোডিয়ামের পরিমাণ লেখা থাকলে সেটিকে সরাসরি গ্রামের লবণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

লবণ কমানোর সহজ উপায়

প্রতিদিনের খাবারে লবণ কমানো মানেই খাবার বিস্বাদ করে ফেলা নয়। কয়েকটি অভ্যাস ধীরে ধীরে বদলালেই সোডিয়াম গ্রহণ কমানো সম্ভব।

রান্নায় আগের তুলনায় কম লবণ ব্যবহার করা।

খাবার টেবিলে অতিরিক্ত লবণ যোগ করার অভ্যাস বাদ দেওয়া।

প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে সোডিয়ামের পরিমাণ দেখা।

ইনস্ট্যান্ট ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া।

সয়া সস, স্টক কিউব, বিভিন্ন সস ও নোনতা মসলা পরিমিত ব্যবহার করা।

লবণের বদলে লেবু, ধনেপাতা, রসুন, আদা ও অন্যান্য মসলা দিয়ে স্বাদ বাড়ানো।

বাইরে খাওয়ার সময় কম-লবণযুক্ত খাবার বেছে নেওয়া।

তবে পটাশিয়ামযুক্ত লবণের বিকল্প নিজের ইচ্ছায় ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে কিডনি রোগ আছে বা রক্তে পটাশিয়াম বাড়াতে পারে এমন ওষুধ সেবন করলে এ ধরনের বিকল্প ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

লবণ একেবারে বাদ দেওয়া কি দরকার?

না। সোডিয়াম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। সমস্যা হয় যখন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গ্রহণ করা হয়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত অতিরিক্ত লবণ কমানো, লবণ সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া নয়।

বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ব্যক্তিগত খাদ্যচাহিদা চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা ভালো।

খাবারে এক চিমটি লবণ হয়তো বড় কোনো বিষয় মনে হয় না, কিন্তু প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত সোডিয়াম যোগ হতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব পড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপ থেকে শুরু করে হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক ও কিডনির স্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে প্রতিদিনের লবণ গ্রহণের দিকে নজর রাখা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুধু রান্নার লবণ নয়—প্যাকেটজাত, প্রক্রিয়াজাত ও রেস্তোরাঁর খাবার থেকেও শরীরে কতটা সোডিয়াম যাচ্ছে, সেটি খেয়াল রাখা।

FAQ

১. দিনে কত গ্রাম লবণ খাওয়া উচিত?

WHO-এর পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত, যা ২,০০০ মিলিগ্রামের কম সোডিয়ামের সমান।

২. বেশি লবণ খেলে কি রক্তচাপ বাড়ে?

হ্যাঁ। অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে।

৩. খাবারে বাড়তি লবণ না দিলেও কি সোডিয়াম বেশি হতে পারে?

হ্যাঁ। প্যাকেটজাত, প্রক্রিয়াজাত ও রেস্তোরাঁর খাবারসহ বিভিন্ন খাবারে আগে থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম থাকতে পারে।

৪. লবণ বেশি খেলে কি শরীরে পানি জমে?

বেশি সোডিয়াম গ্রহণ শরীরে পানি ধরে রাখার প্রবণতা বাড়াতে পারে। এর ফলে ফোলা, পেট ফাঁপা বা সাময়িক ওজন বাড়ার মতো পরিবর্তন হতে পারে।

৫. লবণ কি পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত?

না। সোডিয়াম শরীরের স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়। মূল লক্ষ্য হলো অতিরিক্ত সোডিয়াম বা লবণ গ্রহণ কমিয়ে WHO-এর সুপারিশকৃত মাত্রার মধ্যে থাকা।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ