ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বর—কোনটির কাজ কী?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৩ ১১:৩০:৫৮
খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বর—কোনটির কাজ কী?

জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার কিংবা মালিকানা যাচাইয়ের সময় খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বর—এই তিনটি শব্দ প্রায়ই সামনে আসে। অনেকের কাছে এগুলো একই ধরনের কাগজ বা তথ্য মনে হলেও বাস্তবে তিনটির ভূমিকা এক নয়। খতিয়ানে জমির মালিকানা ও জমির বিবরণ সংক্রান্ত তথ্য থাকে, পর্চা হলো খতিয়ানের অনুরূপ বা নির্যাস কপি, আর দাগ নম্বর দিয়ে মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির প্লট শনাক্ত করা হয়। ফলে জমি যাচাইয়ের সময় কোন তথ্যটি কী কাজে লাগে, তা জানা থাকলে ভুলের ঝুঁকি অনেকটাই কমে।

খতিয়ান কী এবং এর কাজ কী?

সহজ ভাষায়, খতিয়ান হলো জমির রেকর্ডে মালিকানা বা ভূমিস্বত্ব-সংক্রান্ত তথ্যের একটি সরকারি রেকর্ড। ভূমি জরিপের মাধ্যমে মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। সরকারি মিউটেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, একটি খতিয়ানে মালিক বা মালিকদের নাম, মৌজার নাম ও নম্বর, দাগ নম্বর, সংশ্লিষ্ট দাগে জমির পরিমাণ, মালিকের প্রাপ্য অংশ এবং সেই অংশের জমির পরিমাণের মতো তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে।

আরও পড়ুন:

খতিয়ানে নিজের নাম আছে কি না? ঘরে বসেই যেভাবে জানবেন

জমি আপনার নামে আছে, নাকি এখনও আগের মালিকের? জানুন সহজেই

পুরনো খতিয়ান থেকে বর্তমান মালিকের তথ্য বের করবেন যেভাবে

অর্থাৎ কোনো জমি কার নামে রেকর্ড করা আছে, সেই জমি কোন মৌজায়, কোন দাগে এবং সংশ্লিষ্ট মালিকের অংশ কত—এসব তথ্য জানতে খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ।

খতিয়ানে সাধারণত যে তথ্যগুলো দেখা যায়

মালিক বা মালিকদের নাম

পিতা বা স্বামীর নামসহ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য

মৌজার নাম ও জে.এল. নম্বর

খতিয়ান নম্বর

দাগ নম্বর

দাগে মোট জমির পরিমাণ

মালিকের অংশ বা হিস্যা

মালিকের অংশ অনুযায়ী জমির পরিমাণ

প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্যান্য মন্তব্য বা তথ্য

তবে কোন জরিপের খতিয়ান, কোন সময়ের রেকর্ড এবং পরবর্তী সময়ে রেকর্ডে কী পরিবর্তন হয়েছে—এসব বিষয়ও জমি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

পর্চা কী?

পর্চা মূলত খতিয়ানের অনুরূপ বা নির্যাস কপি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের Survey and Settlement Manual-এ বলা হয়েছে, খতিয়ানের অনুরূপ নির্যাস কপিকে পর্চা বলা হয়। রেকর্ড প্রস্তুতের প্রাথমিক পর্যায়ে এর কপি সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া হতো এবং পরবর্তী সময়ে খতিয়ানে পরিবর্তন হলে তা পর্চাতেও অন্তর্ভুক্ত করা হতো।

তাই সাধারণভাবে বলা যায়, খতিয়ান হলো মূল রেকর্ডের অংশ, আর পর্চা হলো সেই রেকর্ডের কপি বা নির্যাস।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। রেকর্ডের চূড়ান্ত প্রকাশনার পর সরকারি চূড়ান্ত রেকর্ডের এন্ট্রিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। DLRS-এর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত প্রকাশনার পর ভূমি-সংক্রান্ত কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সেই চূড়ান্ত রেকর্ডের এন্ট্রি দেখতে হয়।

দাগ নম্বর আসলে কী?

জমির দাগ নম্বর হলো নির্দিষ্ট জমির প্লট শনাক্ত করার একটি নম্বর। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জনগণের জমিকে পৃথক প্লটে ভাগ করে মৌজা নকশা তৈরি করা হয় এবং প্রতিটি প্লটে দাগ নম্বর বসানো হয়। নকশা ও পর্চা/খতিয়ানের সমন্বয়ে জমির স্বত্ব চিহ্নিত করার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। মনে করুন, একটি মৌজায় হাজারটি জমির প্লট রয়েছে। নকশায় প্রতিটি প্লটকে আলাদা করে শনাক্ত করার জন্য আলাদা নম্বর দেওয়া হয়েছে। সেই নম্বরই দাগ নম্বর।

তাই দাগ নম্বর মূলত জমির নির্দিষ্ট অংশ বা প্লটকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

তিনটির পার্থক্য এক নজরে

বিষয়সহজ অর্থমূল কাজ
খতিয়ান জমির স্বত্ব/রেকর্ডের নথি কার নামে জমি রেকর্ড, দাগ ও জমির পরিমাণসহ তথ্য জানা
পর্চা খতিয়ানের অনুরূপ বা নির্যাস কপি খতিয়ানের তথ্যের কপি হিসেবে ব্যবহার
দাগ নম্বর জমির নির্দিষ্ট প্লটের নম্বর মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমি শনাক্ত করা

খতিয়ান ও পর্চা কি একই জিনিস?

পুরোপুরি একই বলা ঠিক নয়। সরকারি রেকর্ড ব্যবস্থায় পর্চা হলো খতিয়ানের অনুরূপ/নির্যাস কপি। ফলে দুটির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু “পর্চা” শব্দটি খতিয়ানের কপি বা নির্যাস বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

বিশেষ করে পুরোনো ভূমি রেকর্ড বা জরিপের কাগজপত্র নিয়ে কাজ করার সময় “পর্চা” শব্দটি বেশি দেখা যেতে পারে। তাই কেউ পর্চা চাইলে অনেক সময় তিনি সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি বা রেকর্ডের নির্যাস বোঝাতে পারেন।

দাগ নম্বর কি মালিকের নাম বলে দেয়?

না। দাগ নম্বর নিজে কোনো মালিকের নাম নয়। এটি নির্দিষ্ট জমির প্লট শনাক্ত করার নম্বর।

একটি দাগের তথ্য দেখতে হলে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, মৌজা নকশা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য রেকর্ড মিলিয়ে দেখতে হয়। সরকারি মিউটেশন ব্যবস্থাতেও খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর আলাদাভাবে ব্যবহার করা হয় এবং আবেদন বা রেকর্ডের ক্ষেত্রে উভয় তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ শুধু দাগ নম্বর জানলেই জমির বর্তমান মালিকানা সম্পর্কে পুরো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

জমি যাচাইয়ের সময় তিনটি তথ্য কীভাবে কাজে লাগে?

জমি যাচাইয়ের সময় তিনটি তথ্যকে আলাদা না দেখে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা বেশি কার্যকর।

প্রথমে খতিয়ানে কার নাম রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দাগে কত জমি রয়েছে তা দেখা যায়। এরপর দাগ নম্বরটি মৌজা নকশা ও দলিলে থাকা দাগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। পর্চা থাকলে সেটির তথ্যও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন নির্দেশিকাতেও জমির খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, আবেদনকৃত জমির পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দাগে খতিয়ানভুক্ত জমির পরিমাণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পুরোনো দাগ ও বর্তমান দাগে পার্থক্য থাকলে

জমির পুরোনো রেকর্ডে থাকা দাগ নম্বর এবং পরবর্তী জরিপের দাগ নম্বর সবসময় এক নাও হতে পারে। বিভিন্ন জরিপের রেকর্ডে সাবেক ও হাল দাগের তথ্য আলাদাভাবে থাকতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নথিতেও সাবেক ও হাল খতিয়ান এবং দাগ নম্বরের উল্লেখ রয়েছে।

তাই পুরোনো দলিল বা খতিয়ানে একটি দাগ নম্বর এবং বর্তমান রেকর্ডে অন্য দাগ নম্বর পাওয়া গেলে সেটিকে সরাসরি ভুল ধরে নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট হাল-সাবেক দাগের তথ্য ও মৌজা নকশা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জমি কেনার আগে কোন তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখবেন?

জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে শুধু বিক্রেতার হাতে থাকা একটি খতিয়ান বা পর্চা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্তত নিচের বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত—

বিক্রেতার নাম ও পরিচয়

সংশ্লিষ্ট খতিয়ান নম্বর

দাগ নম্বর

মৌজার নাম

জমির মোট পরিমাণ

বিক্রেতার মালিকানার অংশ

সংশ্লিষ্ট দলিল

নামজারি বা মিউটেশনের তথ্য

প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো ও বর্তমান রেকর্ড

মৌজা নকশায় জমির অবস্থান

কারণ সরকারি খতিয়ানে মালিকের নামের পাশাপাশি দাগ, জমির পরিমাণ ও মালিকের অংশের মতো একাধিক তথ্য থাকে। এসব তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।

শুধু খতিয়ানে নাম থাকলেই কি সব যাচাই শেষ?

না। খতিয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হলেও জমির লেনদেন বা মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও বিবেচনায় নিতে হয়।

বিশেষ করে জমি কেনার ক্ষেত্রে দলিল, নামজারি, সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ড, দাগ ও জমির পরিমাণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মৌজা নকশা মিলিয়ে দেখা উচিত। কোনো বিরোধ বা অসঙ্গতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যাচাই করা নিরাপদ।

মনে রাখার সহজ কৌশল

বিষয়টি এক লাইনে মনে রাখতে চাইলে এভাবে ভাবতে পারেন—

খতিয়ান = জমির রেকর্ড

পর্চা = খতিয়ানের কপি/নির্যাস

দাগ নম্বর = জমির প্লট শনাক্ত করার নম্বর

অর্থাৎ, জমিটি কোন প্লট সেটি বুঝতে দাগ নম্বর, সেই জমির রেকর্ডে মালিকানা ও অন্যান্য তথ্য দেখতে খতিয়ান, আর খতিয়ানের অনুরূপ কপি হিসেবে পর্চা—এইভাবে বিষয়টি সহজে মনে রাখা যায়। সরকারি রেকর্ড ব্যবস্থায় এই তথ্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবেই ব্যবহৃত হয়।

FAQ

১. খতিয়ান কী?

খতিয়ান হলো ভূমির স্বত্ব/রেকর্ড-সংক্রান্ত সরকারি নথি, যেখানে মালিকের নাম, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মালিকের অংশসহ বিভিন্ন তথ্য থাকতে পারে।

২. পর্চা কী?

পর্চা হলো খতিয়ানের অনুরূপ বা নির্যাস কপি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের Survey and Settlement Manual-এ এভাবেই পর্চার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

৩. দাগ নম্বর দিয়ে কী বোঝা যায়?

দাগ নম্বর দিয়ে মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির প্লট শনাক্ত করা যায়। এটি নিজে কোনো মালিকের নাম নয়।

৪. খতিয়ান ও পর্চা কি একই?

একেবারে একই নয়। পর্চা হলো খতিয়ানের অনুরূপ বা নির্যাস কপি। তাই দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও শব্দ দুটির ব্যবহার এক নয়।

৫. জমি কেনার আগে শুধু দাগ নম্বর জানলেই কি যথেষ্ট?

না। দাগ নম্বরের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, মালিকের নাম, জমির পরিমাণ, দলিল, নামজারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মৌজা নকশাসহ প্রাসঙ্গিক নথি মিলিয়ে দেখা উচিত। সরকারি ভূমি সেবা ব্যবস্থাতেও খতিয়ান ও দাগ নম্বরসহ একাধিক তথ্য ব্যবহার করা হয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ