ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

খাবার দ্রুত না ধীরে? জানুন কোন অভ্যাসে কী লাভ

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৫:৩৩:১৫
খাবার দ্রুত না ধীরে? জানুন কোন অভ্যাসে কী লাভ

খাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে খাবার খাওয়ার অভ্যাস শুধু খাবার উপভোগ করার বিষয় নয়, এর সঙ্গে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ ও পেট ভরা অনুভূতিরও সম্পর্ক থাকতে পারে। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত খাওয়ার তুলনায় ধীরে খেলে একই খাবার থেকে মোট ক্যালরি গ্রহণ কিছু ক্ষেত্রে কম হতে পারে এবং খাবারের পর তৃপ্তি বা পেট ভরা অনুভূতি বেশি সময় ধরে থাকতে পারে। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে এটি সহায়ক একটি অভ্যাস হতে পারে। তবে শুধু ধীরে খেলেই ওজন কমবে—এমন নিশ্চয়তা গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

ধীরে খেলে খাবারের পরিমাণ কমতে পারে

খাবার খুব দ্রুত খেলে শরীরের ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেত বুঝে ওঠার আগেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খেয়ে ফেলার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ধীরে খাওয়ার ফলে একটি খাবার শেষ করতে বেশি সময় লাগে এবং খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও বাড়ে।

একটি র‌্যান্ডমাইজড গবেষণায় ৩০ জন সুস্থ নারীকে ধীর ও দ্রুত—দুইভাবে খাবার খাওয়ানো হয়। গবেষণায় ধীরে খাওয়ার সময় গড়ে প্রায় ৫৭৯ কিলোক্যালরি খাবার গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে দ্রুত খাওয়ার ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় ৬৪৬ কিলোক্যালরি। ধীরে খাওয়ার ক্ষেত্রে খাবার শেষে তৃপ্তির মাত্রাও বেশি ছিল।

অবশ্য এই ফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এমনটা বলা যায় না। অন্য একটি গবেষণায় স্বাভাবিক ওজনের মানুষের ক্ষেত্রে ধীরে খেলে খাবার থেকে ক্যালরি গ্রহণ কমলেও অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার গ্রুপে একই ধরনের পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না।

ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

ধীরে খাওয়ার সঙ্গে ওজনের সম্পর্ক নিয়ে করা একটি systematic review ও meta-analysis-এ দেখা গেছে, দ্রুত খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে বেশি BMI এবং কোমরের পরিধির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণাটি সরাসরি প্রমাণ করে না যে ধীরে খাওয়াই ওজন কমানোর কারণ, তবে খাবার খাওয়ার গতি ও স্থূলতার ঝুঁকির মধ্যে একটি সম্পর্ক থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ধীরে খাওয়াকে আলাদা কোনো ‘ওজন কমানোর পদ্ধতি’ হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

কারণ ওজনের ওপর খাবারের ধরন, মোট ক্যালরি, শারীরিক কার্যকলাপ, ঘুম, বয়স, জেনেটিক্সসহ একাধিক বিষয় প্রভাব ফেলে।

পেট ভরা অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করতে পারে

দ্রুত খাওয়ার সময় অনেকের ক্ষেত্রে শরীরের তৃপ্তির সংকেত আসার আগেই খাবার শেষ হয়ে যেতে পারে। ধীরে খেলে খাবারের সঙ্গে মুখ ও ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শের সময় বাড়ে এবং নিজের ক্ষুধা ও পেট ভরা অনুভূতির দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

একটি গবেষণায় ধীরগতিতে খাবার খাওয়া অংশগ্রহণকারীদের খাবারের পর এক ঘণ্টায় কম ক্ষুধা এবং তুলনামূলক বেশি তৃপ্তির অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

আরেকটি গবেষণায় ধীরে খাওয়ার পর দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীরা বেশি পেট ভরা অনুভব করেছেন এবং তারা আগে খাওয়া খাবারের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে মনে রাখতে পেরেছেন।

খাবার উপভোগ করার সুযোগ বাড়ে

তাড়াহুড়ো করে খাবার খেলে স্বাদ, গন্ধ ও খাবারের গঠন ঠিকভাবে অনুভব করার সুযোগ কমে যেতে পারে। ধীরে খাওয়ার ফলে প্রতিটি লোকমা ভালোভাবে চিবানো এবং খাবারের স্বাদ উপভোগ করার সময় পাওয়া যায়।

তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ধীরে খাওয়া যে সবসময় খাবারের আনন্দ বাড়ায়, তা নিশ্চিত নয়। একটি ছোট গবেষণায় স্বাভাবিক গতিতে খাওয়া অংশগ্রহণকারীরা খাবারকে বেশি উপভোগ্য ও সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন। অর্থাৎ খাবারের গতি ও খাবার উপভোগের সম্পর্ক ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হতে পারে।

চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হতে পারে

ধীরে খাওয়ার সঙ্গে খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাসও তৈরি হতে পারে। এতে খাবার মুখে থাকা অবস্থায় সেটিকে আরও ভালোভাবে ভাঙার সুযোগ পাওয়া যায় এবং দ্রুত গিলে ফেলার প্রবণতা কমে।

যুক্তরাজ্যের NHS-ও হজমের স্বাস্থ্যের জন্য খাবারে তাড়াহুড়ো না করে ধীরে খাওয়া এবং প্রতিটি লোকমা ভালোভাবে চিবানোর পরামর্শ দেয়।

তবে ধীরে খেলেই হজমের সব সমস্যা দূর হবে—এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। হজমের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে খাবারের গুণমান, পর্যাপ্ত পানি, আঁশযুক্ত খাবার এবং ব্যক্তির সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করতে পারে

ধীরে খাওয়ার ফলে খাবারের পর কিছু সময়ের জন্য ক্ষুধা কম অনুভূত হতে পারে। কিছু গবেষণায় ধীরগতির খাবারের সঙ্গে তৃপ্তি ও ক্ষুধার পরিবর্তন দেখা গেলেও সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি।

উদাহরণ হিসেবে, একটি গবেষণায় ২৫ জন অংশগ্রহণকারীকে একই নাশতা দ্রুত ও ধীরে খাওয়ানো হয়। ধীরে খাওয়ার পর ৬০ মিনিটে খাবারের ইচ্ছা কম ছিল। কিন্তু ক্ষুধা-তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি হরমোন এবং পুরো দিনের মোট খাবার গ্রহণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ ধীরে খাওয়া ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব ব্যক্তি ও খাবারের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

ধীরে খাওয়া কি হজমশক্তি বাড়ায়?

এখানে একটু সতর্ক থাকা জরুরি। অনেক সময় বলা হয়, ধীরে খেলে হজমশক্তি বাড়ে। কিন্তু ‘ধীরে খাওয়া সরাসরি হজমশক্তি বাড়ায়’—এমন শক্ত প্রমাণ নেই।

তবে ধীরে খাওয়া এবং ভালোভাবে চিবানো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেলে খাবারের কণাগুলো ছোট হয় এবং খাবার গেলার প্রক্রিয়াও সহজ হয়। এ কারণে NHS তাড়াহুড়ো না করে ধীরে খাওয়ার পরামর্শ দেয়।

তাই ধীরে খাওয়াকে হজমের সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে না দেখে ভালো খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

কীভাবে ধীরে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করবেন?

হঠাৎ করে খাওয়ার সময় অনেকটা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। কয়েকটি সহজ অভ্যাস দিয়ে শুরু করা যেতে পারে—

খাবারের সময় মোবাইল বা অন্য কাজের দিকে মনোযোগ কমিয়ে খাবারের দিকে মন দিন।

প্রতিটি লোকমা ভালোভাবে চিবিয়ে তারপর গিলে ফেলুন।

এক লোকমা শেষ করার আগে পরের লোকমা মুখে নেওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।

খুব দ্রুত খাবার শেষ করার পরিবর্তে খাবারের স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করার চেষ্টা করুন।

অতিরিক্ত বড় লোকমা না নিয়ে পরিমাণমতো খাবার মুখে নিন।

পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি আসছে কি না, খাওয়ার সময় সেটির দিকে খেয়াল করুন।

খাবার শেষ করার পর সঙ্গে সঙ্গে আরও খাবার নেওয়ার পরিবর্তে কিছুটা সময় অপেক্ষা করুন।

খাবারের পরিমাণের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কারণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে শুধু কীভাবে খাওয়া হচ্ছে তা নয়, কী পরিমাণ এবং কী ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। CDC-ও স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি portion size বা খাবারের পরিমাণের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

শুধু ধীরে খেলেই কি ওজন কমবে?

না। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।

ধীরে খাওয়ার সঙ্গে কম খাবার গ্রহণ ও কম BMI-এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা থাকলেও, এটিকে এককভাবে ওজন কমানোর প্রমাণিত উপায় বলা ঠিক হবে না। গবেষণাগুলোর ফলও সব ক্ষেত্রে এক নয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য সুষম খাবার, উপযুক্ত ক্যালরি গ্রহণ, পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সামগ্রিক জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে খাওয়ার অভ্যাস সেখানে একটি সহায়ক পরিবর্তন হতে পারে।

খাবার ধীরে ধীরে খাওয়ার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সুবিধা হলো—এটি অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, পেট ভরা অনুভূতি বোঝা এবং খাবারের প্রতি সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় দ্রুত খাওয়ার সঙ্গে বেশি BMI ও কোমরের পরিধির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। তবে ফল ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

তাই দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস থাকলে একদিনেই বড় পরিবর্তনের চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে খাবারের সময় বাড়ানো, ভালোভাবে চিবানো এবং খাওয়ার সময় নিজের ক্ষুধা ও তৃপ্তির সংকেতের দিকে মনোযোগ দেওয়াই হতে পারে সহজ একটি শুরু।

FAQ

১. ধীরে খাবার খেলে কি ওজন কমে?

ধীরে খাওয়ার ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে একবারে কম ক্যালরি গ্রহণ ও বেশি তৃপ্তি হতে পারে। তবে শুধু ধীরে খেলেই ওজন কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

২. ধীরে খেলে কি হজম ভালো হয়?

ধীরে খাওয়া ও ভালোভাবে চিবানো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ। তবে ধীরে খেলেই হজমের সব সমস্যা দূর হবে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

৩. দ্রুত খাওয়ার সঙ্গে ওজন বাড়ার সম্পর্ক আছে কি?

গবেষণায় দ্রুত খাওয়ার সঙ্গে বেশি BMI ও কোমরের পরিধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না।

৪. ধীরে খেলে কি বেশি সময় পেট ভরা থাকে?

কিছু গবেষণায় ধীরে খাওয়ার পর ক্ষুধা কম এবং তৃপ্তি বেশি থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি।

৫. ধীরে খাওয়ার অভ্যাস কীভাবে শুরু করা যায়?

প্রতিটি লোকমা ভালোভাবে চিবানো, এক লোকমা শেষ হওয়ার আগে পরের লোকমা না নেওয়া এবং খাবারের সময় মোবাইল বা অন্য কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে খাবারের দিকে নজর দেওয়া দিয়ে শুরু করা যায়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: