ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

তাহাজ্জুদের সঠিক সময় কখন? কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

ধর্ম ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৭ ২১:০৭:২০
তাহাজ্জুদের সঠিক সময় কখন? কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

রাতের শেষভাগে আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়ানো মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। আর তাহাজ্জুদ নামাজ নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি করা হয়, তা হলো—এ নামাজ কখন পড়তে হয় এবং ফজরের কতক্ষণ আগে পর্যন্ত তা আদায় করা যায়? ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এশার নামাজের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রাতের নফল নামাজ আদায় করা যায়। তবে রাতের শেষ তৃতীয়াংশকে এ ইবাদতের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময় হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফজরের ১০, ১৫ বা ২০ মিনিট আগে পর্যন্ত তাহাজ্জুদ পড়া যাবে—এমন নির্দিষ্ট কোনো শরয়ি সময়সীমা নেই। ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাহাজ্জুদের সময় থাকে। তবে ফজরের সময় শুরু হয়ে গেলে রাতের নামাজের সময় শেষ হয়ে যায়।

তাহাজ্জুদ নামাজ কী?

তাহাজ্জুদ হলো রাতের নফল নামাজ। সাধারণভাবে এশার নামাজের পর ঘুমিয়ে উঠে রাতের বেলায় যে নফল নামাজ আদায় করা হয়, তাকে তাহাজ্জুদ বলা হয়।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন, এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত।”—সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৭৯

এই আয়াত রাতের ইবাদতের গুরুত্ব তুলে ধরে। তাহাজ্জুদ ফরজ নামাজ নয়, তবে এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ নফল ইবাদত।

তাহাজ্জুদ নামাজের সময় কখন শুরু হয়?

তাহাজ্জুদের জন্য ঘড়ির কোনো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা হয়নি। এশার নামাজের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রাতের নফল নামাজ আদায় করা যায়।

তবে তাহাজ্জুদের প্রচলিত ও উত্তম পদ্ধতি হলো, এশার নামাজের পর ঘুমিয়ে পড়া এবং পরে রাতের শেষভাগে ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায় করা।

রাসুলুল্লাহ ﷺ রাতের নামাজ আদায় করতেন এবং তাঁর রাতের ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শেষ রাতে নামাজ, দোয়া ও ইস্তিগফার।

তাহাজ্জুদের সবচেয়ে উত্তম সময় কোনটি?

রাতের শেষ তৃতীয়াংশকে তাহাজ্জুদ ও দোয়ার জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ সময় হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকলে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহের সঙ্গে আহ্বান করেন—কে তাঁকে ডাকবে, তিনি তার ডাকে সাড়া দেবেন; কে তাঁর কাছে চাইবে, তিনি তাকে দেবেন এবং কে ক্ষমা চাইবে, তিনি তাকে ক্ষমা করবেন।

এই হাদিসের কারণে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ পড়া, দোয়া করা ও ইস্তিগফার করা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ কীভাবে বুঝবেন?

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বের করার সহজ নিয়ম হলো—মাগরিবের সময় থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া পর্যন্ত মোট সময়কে তিন ভাগ করতে হবে। শেষ এক ভাগ হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ।

ধরা যাক, কোনো দিনে মাগরিবের পর থেকে ফজর পর্যন্ত রাতের দৈর্ঘ্য ৯ ঘণ্টা। তাহলে তিন ভাগে প্রতিটি অংশ হবে ৩ ঘণ্টা। সেক্ষেত্রে ফজরের প্রায় ৩ ঘণ্টা আগে থেকে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ শুরু হবে।

তবে এটি শুধু হিসাব বোঝানোর উদাহরণ। বাস্তবে প্রতিদিনের মাগরিব ও ফজরের সময় অনুযায়ী রাতের শেষ তৃতীয়াংশের সময় পরিবর্তিত হবে।

ফজরের কতক্ষণ আগে পর্যন্ত তাহাজ্জুদ পড়া যায়?

তাহাজ্জুদের সময় নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাহাজ্জুদ পড়া যায়।

অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্ত যদি ভোর ৫টা ১০ মিনিটে শুরু হয়, তাহলে তার আগেই তাহাজ্জুদ শেষ করতে হবে।

এখানে ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট বা ২০ মিনিট আগে তাহাজ্জুদ বন্ধ করতে হবে—এমন কোনো সর্বজনীন শরয়ি নিয়ম নেই। মূল বিষয় হলো ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে রাতের নামাজ শেষ করা।

তবে একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়। কারণ নামাজ শেষ হওয়ার আগেই ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যেতে পারে। তাই সময় হাতে রেখে তাহাজ্জুদ শেষ করে নেওয়া উত্তম।

ফজরের আজান শুরু হলে কি তাহাজ্জুদ পড়া যাবে?

ফজরের আজান সাধারণত ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয়। তাই ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে গেলে তাহাজ্জুদের সময় শেষ হয়ে যায়।

রাতের নামাজ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত করে আদায় করতে হবে। এরপর যখন ভোর হওয়ার আশঙ্কা হবে, তখন এক রাকাত বিতর পড়ে আগের নামাজকে বিজোড় করে নিতে হবে।

এ কারণে রাতের নফল নামাজ ও বিতর ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই শেষ করা গুরুত্বপূর্ণ।

তাহাজ্জুদ কত রাকাত?

তাহাজ্জুদের জন্য নির্দিষ্ট একটি বাধ্যতামূলক রাকাতসংখ্যা নেই। রাতের নামাজ সাধারণত দুই রাকাত করে আদায় করা হয়।

ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত।”

আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রাতের নামাজ ১১ রাকাতের কথা পাওয়া যায়, যার মধ্যে তিন রাকাত ছিল বিতর।

তাই তাহাজ্জুদ পড়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক মনে করা ঠিক নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী দুই রাকাত বা তার বেশি নফল নামাজ আদায় করা যায়।

তাহাজ্জুদ ও বিতর কি একই নামাজ?

না। তাহাজ্জুদ ও বিতর আলাদা নামাজ।

তাহাজ্জুদ হলো রাতের নফল নামাজ। আর বিতর হলো রাতের নামাজের শেষে আদায় করা বিশেষ নামাজ।

যে ব্যক্তি মনে করেন তিনি শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠতে পারবেন, তিনি তাহাজ্জুদ পড়ার পর বিতর আদায় করতে পারেন। আর যিনি আশঙ্কা করেন যে শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠতে পারবেন না, তিনি ঘুমানোর আগে বিতর পড়ে নিতে পারেন।

সহিহ হাদিসে রাতের শেষ নামাজ হিসেবে বিতর আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কোরআনে রাতের ইবাদতের গুরুত্ব

কোরআনের বিভিন্ন আয়াতেও রাতের ইবাদত ও শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশংসা করা হয়েছে।

সূরা আয-জারিয়াতের ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন—

“তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমাত এবং ভোর হওয়ার আগে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।”

অন্যদিকে সূরা আস-সাজদার ১৬ নম্বর আয়াতে মুমিনদের এমন বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে যে তারা শয্যা ছেড়ে উঠে ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে।

এগুলো থেকে বোঝা যায়, রাতের নির্জন সময়ে আল্লাহর কাছে দোয়া, ইবাদত ও ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

তাহাজ্জুদ পড়ার সহজ নিয়ম

তাহাজ্জুদ আদায় করতে চাইলে সহজভাবে একটি রুটিন অনুসরণ করা যায়। এশার নামাজ আদায় করে ঘুমানোর আগে শেষ রাতে ওঠার নিয়ত করা যেতে পারে। এরপর রাতে ঘুম থেকে উঠে ওজু করে দুই রাকাত করে নফল নামাজ পড়া যায়।

নামাজের পর নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দোয়া ও ইস্তিগফার করা যায়। কেউ যদি বিতর আগে না পড়ে থাকেন এবং শেষ রাতে ওঠার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে তাহাজ্জুদের পর বিতর আদায় করতে পারেন।

তবে তাহাজ্জুদের কারণে যেন ফজরের নামাজ ছুটে না যায়, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি।

ঘুম থেকে না উঠে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে?

তাহাজ্জুদের প্রচলিত অর্থের ক্ষেত্রে ঘুম থেকে উঠে রাতের নামাজ পড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাতের নফল নামাজ এশার পর থেকেই আদায় করা যায়।

তাই কেউ যদি শেষ রাতে ওঠার ব্যাপারে নিশ্চিত না হন, তাহলে রাতের নফল নামাজ ও বিতরের বিষয়ে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী আমল করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ এমন ব্যক্তিকে রাতের শুরুতেই বিতর আদায় করার অনুমতি দিয়েছেন, যিনি শেষ রাতে উঠতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করেন।

তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

তাহাজ্জুদের সময় নিয়ে সংক্ষেপে মনে রাখার মতো বিষয় হলো—এশার পর রাতের নফল নামাজের সময় শুরু হয় এবং ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সঙ্গে তা শেষ হয়।

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। তাই সম্ভব হলে ওই সময়ে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া, দোয়া করা ও ইস্তিগফার করা উত্তম।

আর ফজরের আগে কত মিনিট পর্যন্ত পড়া যাবে—এর উত্তর হলো, ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত। ১০, ১৫ বা ২০ মিনিটের নির্দিষ্ট কোনো শরয়ি সীমা নেই। তবে ফজরের ওয়াক্ত প্রবেশের আগেই নামাজ শেষ করে নেওয়া উচিত।

FAQ

প্রশ্ন: তাহাজ্জুদ নামাজ কখন পড়তে হয়?

উত্তর: এশার নামাজের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রাতের নফল নামাজ পড়া যায়। ঘুম থেকে উঠে পড়াকে সাধারণত তাহাজ্জুদ বলা হয়।

প্রশ্ন: ফজরের ১০ মিনিট আগে কি তাহাজ্জুদ পড়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, যদি তখনও ফজরের ওয়াক্ত শুরু না হয়ে থাকে। তবে নিরাপদভাবে কিছুটা আগে নামাজ শেষ করা ভালো।

প্রশ্ন: তাহাজ্জুদের সবচেয়ে উত্তম সময় কোনটি?

উত্তর: রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। সহিহ হাদিসে এই সময়ে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে।

প্রশ্ন: তাহাজ্জুদ কত রাকাত পড়তে হয়?

উত্তর: নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক রাকাতসংখ্যা নেই। রাতের নামাজ দুই রাকাত করে আদায় করার কথা সহিহ হাদিসে এসেছে।

প্রশ্ন: ফজরের আজান হয়ে গেলে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে?

উত্তর: ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে গেলে তাহাজ্জুদের সময় শেষ হয়ে যায়। তাই ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই তাহাজ্জুদ শেষ করতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: