Md Razib Ali
Senior Reporter
সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও দ্বিমুখিভাবের কারণে বাংলাদেশের তেলের জাহাজ ফিরিয়ে দিচ্ছে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এক কঠিন সময় পার করছে। বন্ধুপ্রতিম দেশ হওয়ার পরেও হরমুজ প্রণালী থেকে পর পর দুবার বাংলাদেশের তেলের জাহাজ ফিরিয়ে দিয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা একে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং পররাষ্ট্রনীতির দ্বিমুখী আচরণের ফলাফল হিসেবে দেখছেন।
হরমুজ প্রণালীতে কেন বারবার ফিরছে বাংলাদেশের জাহাজ?
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে গিয়ে ইরানি নৌবাহিনীর বাধার মুখে পড়ে। বন্ধুরাষ্ট্র ইরান কেন বাংলাদেশের প্রতি এমন বৈরী আচরণ করছে, তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে বাংলাদেশ যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, তখন ইরানের ওপর চালানো আগ্রাসনের বিষয়ে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে ঢাকা। এই অবস্থানকেই ইরানের ক্ষোভের কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও দ্বিমুখী অবস্থান
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন এক ধরনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বা ‘কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ দেখা যাচ্ছে। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে সরকার যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ইরানের ওপর পশ্চিমা চাপের সময় বাংলাদেশের নীরব ভূমিকা তেহরানকে রুষ্ট করেছে। যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ওপর।
দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট ও জনদুর্ভোগ
ইরান থেকে তেলের জাহাজ ফিরে আসার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। সারা দেশে এখন জ্বালানির তীব্র হাহাকার। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন, আর পাম্পের সামনে ঝুলছে ‘পেট্রোল নাই’ কিংবা ‘অকটেন নাই’ লেখা সাইনবোর্ড। জ্বালানি সংকটের কারণে:
সারা দেশে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
পরিবহন সেক্টরে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প কলকারখানায় হাহাকার শুরু হয়েছে।
বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে না থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা কাজ করছেন। ইরানের সঙ্গে এই কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তাও এখন বড় প্রশ্নের মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় দেশগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে ছোট রাষ্ট্রগুলোর প্রধান অস্ত্র হলো তাদের ‘নৈতিক অবস্থান’। বাংলাদেশ যদি তার পররাষ্ট্রনীতিতে সাহসিকতা ও স্বচ্ছতা আনতে না পারে, তবে আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব হারানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।
সমাধানের পথ কী?
কেবল বর্তমানে আগুন নেভানোর মতো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী উৎস খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে, মিষ্টি কথার ফুলঝুরি সরিয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্পষ্ট ও সাহসী কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণের এখনই সময়। অন্যথায়, আগামীর বড় কোনো রাজনৈতিক ঝড় বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
তানভির ইসলাম/