Md Razib Ali
Senior Reporter
ম্যারাডোনার রেকর্ড ভাঙছেন মেসি, স্কোয়াডে বড় চমক
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনা এক অবিনশ্বর নাম। তবে সেই কিংবদন্তির একটি বিশেষ রেকর্ড এবার নিজের করে নেওয়ার পথে লিওনেল মেসি। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে মাঠে নামলেই ম্যারাডোনাকে টপকে আর্জেন্টিনাকে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসরে নেতৃত্ব দেওয়ার অনন্য কীর্তি গড়বেন এলএমটেন। তবে এবারের আলবিসেলেস্তে বহরের বিশেষত্ব কেবল মেসি নন; বরং পুরো স্কোয়াডই যেন ঠাসা একগুচ্ছ ক্লাব অধিনায়কে।
রেকর্ডের পাতায় নতুন মহাকাব্য
এখন পর্যন্ত তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন লিওনেল মেসি। চিরস্মরণীয় ম্যারাডোনাও সমান সংখ্যক (তিনটি) আসরে আলবিসেলেস্তেদের আর্মব্যান্ড পরেছেন বলে উল্লেখ করেছে আর্জেন্টাইন গণমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া আগামী বিশ্বকাপে মেসি যখন দলকে টস করতে নিয়ে নামবেন, সেটি হবে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর চতুর্থ বিশ্বকাপ—যা আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৬টি ম্যাচ খেলার মাইলফলক মেসির দখলে। এছাড়া টানা ১৮ ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। আগামী আসরে মাঠে নামলে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অবিশ্বাস্য রেকর্ডটিও স্পর্শ করবেন এই মহাতারকা।
স্কালোনির ‘অধিনায়ক-নির্ভর’ স্কোয়াড
কোচ লিওনেল স্কালোনি এখনও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না করলেও, তাঁর দলের মূল কাঠামো বা জ্যেষ্ঠ সদস্যদের অবস্থান প্রায় নিশ্চিত। মজার ব্যাপার হলো, এবারের আর্জেন্টিনা দলে এমন অনেক ফুটবলার আছেন যারা ইউরোপীয় বা লাতিন আমেরিকার বড় বড় ক্লাবগুলোকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে জাতীয় দলে তারা সবাই নিঃসংকোচে সমর্পণ করেন তাদের প্রিয় নেতা মেসির কাছে।
রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ—যেখানে সবাই নেতা:
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের স্তম্ভ নিকোলাস ওতামেন্ডি পর্তুগিজ জায়ান্ট বেনফিকার বর্তমান অধিনায়ক। কোচ হোসে মরিনিয়োর ভাষায়, ওতামেন্ডি এমন একজন ‘জেনুইন লিডার’ যিনি কেবল আর্মব্যান্ড পরেন না, বরং সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে বহন করেন। অন্যদিকে, ইন্টার মিলানের ‘এল কাপিতানো’ হিসেবে পরিচিত লাউতারো মার্টিনেজ। ক্লাবের প্রতি তাঁর নিবেদন ও কথা না বলেও দলকে উজ্জীবিত করার ক্ষমতাকে প্রশংসা করেছেন খোদ হাভিয়ের জানেত্তি।
টটেনহ্যাম হটস্পারের ক্রিস্টিয়ান রোমেরোও নেতৃত্বের নতুন প্রতীক। তাঁর কোচ থমাস ফ্র্যাঙ্ক মনে করেন, রোমেরোর শারীরিক উপস্থিতি ও খেলার তীব্রতাই সতীর্থদের জন্য বড় বার্তা। এছাড়া মাঝমাঠে লিয়েন্দ্রো পারেদেস (বোকা জুনিয়রস) এবং রক্ষণভাগে গঞ্জালো মন্টিয়েল (রিভার প্লেট) নিজ নিজ ক্লাবের অধিনায়কত্ব করছেন।
তালিকাটি এখানেই শেষ নয়; এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অ্যাস্টন ভিলার সহ-অধিনায়ক হিসেবে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছেন। ইনজুরিতে থাকলেও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নেতৃত্বের অন্যতম মুখ। নিকোলাস তালিয়াফিকো, লিয়েনার্দো বালের্দি এবং এনজো ফার্নান্দেজদেরও বিভিন্ন সময়ে নিজ নিজ ক্লাবের আর্মব্যান্ড হাতে দেখা গেছে। এমনকি রদ্রিগো ডি পলকে অফিশিয়াল অধিনায়ক না হলেও মাঠের আসল ‘চালিকাশক্তি’ বলে মানেন আনহেল ডি মারিয়া।
মেসির নেতৃত্বের বিবর্তন
মেসি সবসময়ই এমন সরব নেতা ছিলেন না। ২০১১ সালে হাভিয়ের মাশ্চেরানোর কাছ থেকে নেতৃত্বের ভার নেওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছেন তিনি। সাবেক কোচ সার্জিও বাতিস্তার মতে, মেসি সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন এবং যখন নিজেকে যোগ্য মনে করেছেন, তখনই নেতার ভূমিকায় ‘বিস্ফোরিত’ হয়েছেন।
সেবাস্তিয়ান বেক্কাসিসির মতে, ২০ বছর ধরে শীর্ষে থেকেও মেসির এই বিনয় ও ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্বই তাকে অনন্য করেছে। তাঁর অধীনে থাকা এই একঝাঁক ক্লাব অধিনায়ক মেসির নির্দেশনাকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেন, যা আর্জেন্টিনার সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার
পেদ্রো ডেলাচা থেকে শুরু করে অ্যান্তনিও রাতিন, দানিয়েল পাসারেলা কিংবা ম্যারাডোনা—আর্জেন্টিনার অধিনায়কত্বের ইতিহাস বরাবরই গৌরবময়। মেসি সেই পরম্পরার সুযোগ্য উত্তরসূরি। তবে এক দলে এত অধিনায়কের উপস্থিতি যেমন মেসির কাজ সহজ করে দিচ্ছে, তেমনি তাঁর অবসরের পর আর্মব্যান্ডটি কার হাতে উঠবে, সেই কৌতূহলও বাড়িয়ে দিচ্ছে ফুটবল বিশ্বে।
তানভির ইসলাম/