ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

বিপিসির টাকা আটকে পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে, সামনে বড় অর্থসংকট

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৮:২৮:২৯
বিপিসির টাকা আটকে পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে, সামনে বড় অর্থসংকট

জ্বালানি আমদানির ৪০টি এলসি পরিশোধে বিপিসির হাতে থাকা চলতি মূলধন থেকে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা হয়েছে। তারপরও ওই এলসিগুলোর বিপরীতে আরও ১ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকার ঘাটতি রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পড়ে থাকা ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা দ্রুত ছাড় করে সমন্বয়ের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

এই আটকে থাকা অর্থের বড় অংশই রয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে। এসব ব্যাংকে বিপিসির প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা আটকে আছে। ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে ব্যবহারযোগ্য অর্থের সংকট—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি।

সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে

বিপিসির আটকে থাকা অর্থের হিসাব করলে সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের ৭৫৩ কোটি টাকা আটকে আছে।

ইউনিয়ন ব্যাংকে রয়েছে ২২৭ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ২০৯ কোটি, এক্সিম ব্যাংকে ১৫৭ কোটি এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা অবরুদ্ধ রয়েছে।

এই পাঁচ ব্যাংকের অর্থ একত্র করলে পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা।

শুধু পাঁচ ব্যাংক নয়, আরও অর্থ অবরুদ্ধ

ব্যাংকবিপিসির আটকে থাকা অর্থ
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৭৫৩ কোটি টাকা
ইউনিয়ন ব্যাংক ২২৭ কোটি টাকা
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ২০৯ কোটি টাকা
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ কোটি টাকা
এক্সিম ব্যাংক ১৫৭ কোটি টাকা
মোটপ্রায় ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা

বিপিসির অর্থ আটকে থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকা ওই পাঁচ ব্যাংকেই শেষ নয়। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে প্রায় ২২ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকে ১৪৮ কোটি টাকা রয়েছে।

আইসিবি ইসলামী ব্যাংকে বিপিসির ১৩৩ কোটি টাকা আটকে আছে। আর ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কাছে অবরুদ্ধ রয়েছে ২২৯ কোটি টাকা।

সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বিপিসির ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এমন অবস্থায় রয়েছে, যা প্রয়োজনের সময় তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

ছয় মাসেই লোকসান ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি

বিপিসির অর্থসংকটের পেছনে শুধু ব্যাংকে আটকে থাকা অর্থই নয়, জ্বালানি তেলে ভর্তুকির চাপও বড় কারণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের মধ্যে দেশে নির্ধারিত দামে জ্বালানি সরবরাহ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি অনুসরণ না করায় গত মার্চ থেকে আগস্ট—এই ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।

লোকসানের প্রভাব দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা অর্থেও। ১ মার্চ বিপিসির জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ২৮৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। ১৩ সেপ্টেম্বর সেই অর্থ কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৭৯০ কোটি ৬৩ লাখ টাকায়।

দুই মাসের জ্বালানি ব্যয়ের সমান অর্থ রাখার প্রয়োজন

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিপিসিকে সাধারণত প্রায় দুই মাসের জ্বালানি তেলের মূল্য সমপরিমাণ অর্থ চলতি মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে এই প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা।

এ অবস্থায় বিপিসির হাতে থাকা অর্থের একটি অংশ যখন বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে রয়েছে, তখন আমদানি বিল পরিশোধের সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

বিপিসির একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের ৪০টি এলসির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে রাখা হয়েছে। এরপরও আরও ১ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে।

এই ঘাটতি পূরণের পথ হিসেবে আটকে থাকা ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অবমুক্ত করে সমন্বয়ের অনুরোধ করেছে বিপিসি।

দাম বাড়িয়েও পুরো ভর্তুকির চাপ কাটেনি

জ্বালানি তেলে ভর্তুকির চাপ কমাতে সরকার সম্প্রতি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়িয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি অনুসরণ করলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারত।

তবে দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণের পরও প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারকে প্রায় ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

অর্থ ছাড় নিয়ে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক

আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিপিসির পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানি বিল পরিশোধের জন্য আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিপিসিকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিপিসির ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বেশি আটকে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

নাজনীন পারভীনের ভাষ্য, আটকে থাকা অর্থ ছাড়ের পাশাপাশি সরকারের নির্ধারিত ভর্তুকি পাওয়া গেলে বিপিসির তহবিলের ওপর তৈরি হওয়া চাপ অনেকটাই কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক—দুটিই সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যায়ে নয়, সরকারের উচ্চপর্যায়েও আলোচনা হচ্ছে।

এখন জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং বিপিসির চলতি মূলধনের সংকট সামলাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা অর্থ কত দ্রুত এবং কীভাবে অবমুক্ত করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: