ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

জমির পর্চা অনলাইনে পাবেন যেভাবে, আবেদন করতে লাগবে কত টাকা?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১২:৫৭:৪৮
জমির পর্চা অনলাইনে পাবেন যেভাবে, আবেদন করতে লাগবে কত টাকা?

জমির মালিকানা ও রেকর্ডসংক্রান্ত তথ্য জানতে এখন আর সব সময় ভূমি অফিসে গিয়ে পর্চার জন্য আবেদন করতে হয় না। ঘরে বসেই মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে সরকারি অনলাইন সেবা ব্যবহার করে জমির খতিয়ান বা পর্চা খুঁজে দেখা এবং এর অনলাইন কিংবা সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের আবেদন করা যায়। এ জন্য প্রয়োজন জমির সঠিক মৌজা, জেলা, উপজেলা এবং খতিয়ান বা দাগসংক্রান্ত তথ্য।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-পর্চা বা ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবার মাধ্যমে নাগরিকরা সিএস, এসএ, আরএস, বিএসসহ বিভিন্ন জরিপের খতিয়ান অনুসন্ধান করতে পারেন। পাশাপাশি নির্ধারিত ফি দিয়ে অনলাইন কপি ডাউনলোড অথবা সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করা যায়।

বিশেষ করে জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির রেকর্ড যাচাই কিংবা জমির দাগ ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য জানার ক্ষেত্রে পর্চা গুরুত্বপূর্ণ নথি। তাই অনলাইনে কীভাবে পর্চা পাওয়া যায়, কী কী তথ্য প্রয়োজন এবং সরকারি ফি কত—এসব বিষয় জানা জরুরি।

জমির পর্চা অনলাইনে কোথায় পাওয়া যাবে?

বাংলাদেশে জমির খতিয়ান বা পর্চা সংগ্রহের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি অনলাইন সেবা ব্যবহার করতে হবে।

এ জন্য প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ভূমি তথ্য বাতায়নে প্রবেশ করতে হবে। সেখান থেকে ‘ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ’ সেবা নির্বাচন করে খতিয়ান অনুসন্ধান ও কপির জন্য আবেদন করা যাবে।

এ সেবাটি সাধারণভাবে ই-পর্চা নামে পরিচিত। অনলাইনে আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট জমির অবস্থান ও জরিপের তথ্য সঠিকভাবে নির্বাচন করতে হবে।

অনলাইনে জমির পর্চা পাওয়ার নিয়ম

জমির পর্চা সংগ্রহের জন্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রথম ধাপ: সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ

প্রথমে মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। এরপর ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবার অপশন নির্বাচন করুন।

দ্বিতীয় ধাপ: জমির অবস্থান নির্বাচন

খতিয়ান অনুসন্ধানের জন্য প্রথমে জমির বিভাগ, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মৌজার নাম নির্বাচন করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে জমিটি যে মৌজায় অবস্থিত, সেই মৌজার সঠিক তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই উপজেলার একাধিক মৌজার নাম কাছাকাছি হতে পারে। তাই ভুল মৌজা নির্বাচন করলে কাঙ্ক্ষিত খতিয়ান খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।

তৃতীয় ধাপ: জরিপের ধরন নির্বাচন

এরপর জমির রেকর্ড কোন জরিপের অধীনে রয়েছে, সেটি নির্বাচন করতে হবে। সাধারণত যেসব জরিপের খতিয়ান পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

সিএস (CS) খতিয়ান

এসএ (SA) খতিয়ান

আরএস (RS) খতিয়ান

বিএস (BS) খতিয়ান

বিআরএস (BRS) খতিয়ান

নামজারি খতিয়ান

সব এলাকার জন্য প্রতিটি জরিপের রেকর্ড পাওয়া যাবে, এমন নয়। সংশ্লিষ্ট এলাকায় যে জরিপের রেকর্ড রয়েছে, সেটিই নির্বাচন করতে হবে।

চতুর্থ ধাপ: খতিয়ান বা দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান

জমির খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে সরাসরি অনুসন্ধান করা যায়। খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে পোর্টালে থাকা অনুসন্ধান পদ্ধতি অনুযায়ী মালিকের নাম বা দাগ নম্বর দিয়েও খোঁজ করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন:

খতিয়ান নম্বর দিয়ে জমির তথ্য বের করার নিয়ম

পুরনো জমির মালিকানা ও খতিয়ান অনলাইনে খুঁজবেন যেভাবে

দাগ নম্বর না জানলেও মৌজার নাম দিয়ে জমি খুঁজবেন যেভাবে

অনুসন্ধানের ফলাফলে জমির মালিকের নাম, খতিয়ান নম্বর এবং অন্যান্য রেকর্ডসংক্রান্ত তথ্য মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত খতিয়ানটি নির্বাচন করতে হবে।

পঞ্চম ধাপ: পর্চার কপির জন্য আবেদন

সঠিক খতিয়ান শনাক্ত করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন কপি অথবা সার্টিফায়েড কপি নির্বাচন করতে হবে।

এরপর আবেদনকারীর প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করলেই আবেদন জমা হবে।

অনলাইন কপির আবেদন অনুমোদিত ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পোর্টাল থেকে কপি সংগ্রহ করা যায়। অন্যদিকে সার্টিফায়েড কপির ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কপি সংগ্রহ করতে হবে।

জমির পর্চা তুলতে কত টাকা লাগে?

জমির পর্চা সংগ্রহের খরচ নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ফি পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী, খতিয়ানের অনলাইন ও সার্টিফায়েড কপির জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

নির্ধারিত ফি হলো—

সরকারি ফি: ১০০ টাকা।

সেবা ফি: ২০ টাকা।

মোট ফি: ১২০ টাকা।

অর্থাৎ, নির্ধারিত পরিপত্র অনুযায়ী প্রতি খতিয়ানের অনলাইন বা সার্টিফায়েড কপির জন্য মোট ১২০ টাকা দিতে হবে।

এ ছাড়া মৌজা ম্যাপ সংগ্রহের জন্য প্রতি শিটে সরকারি ফি ৫২০ টাকা এবং সেবা ফি ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি শিটের জন্য মোট ৫৪৫ টাকা দিতে হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপের আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ফি অনলাইনে পরিশোধ করতে হবে।

অনলাইন পর্চা ও সার্টিফায়েড পর্চার মধ্যে পার্থক্য কী?

জমির পর্চা সংগ্রহের সময় অনেকেই অনলাইন কপি ও সার্টিফায়েড কপির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না।

অনলাইন কপি হলো সরকারি অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে পাওয়া খতিয়ানের ডিজিটাল কপি। জমির রেকর্ডের তথ্য দেখা, সংরক্ষণ এবং প্রাথমিক যাচাইয়ের জন্য এটি কাজে লাগে।

অন্যদিকে সার্টিফায়েড কপি হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সত্যায়িত খতিয়ান। জমিসংক্রান্ত মামলা, আদালতের কার্যক্রম কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রয়োজনে নথি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সার্টিফায়েড কপি নেওয়া অধিক উপযোগী।

তাই কোন কাজে পর্চা প্রয়োজন, সেটি বুঝে আবেদন করার সময় কপির ধরন নির্বাচন করা উচিত।

অনলাইনে জমির পর্চা না পাওয়া গেলে কী করবেন?

অনেক সময় অনলাইনে অনুসন্ধান করেও কাঙ্ক্ষিত জমির খতিয়ান পাওয়া যায় না। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। যেমন—ভুল মৌজা নির্বাচন, খতিয়ান নম্বরে ভুল, জরিপের ধরন ভুল নির্বাচন অথবা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড এখনো অনলাইন ব্যবস্থায় যুক্ত না হওয়া।

এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে জমির পুরোনো দলিল বা অন্যান্য কাগজপত্র থেকে মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর যাচাই করতে হবে।

তারপরও রেকর্ড পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস অথবা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্রের ১৬১২২ নম্বরে ফোন করেও তথ্য জানা যাবে।

পর্চা সংগ্রহের আগে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

জমির পর্চা সংগ্রহের সময় শুধু মালিকের নাম দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। খতিয়ানে উল্লেখ করা দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, মৌজার নাম এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে দলিলের বিবরণ মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষ করে পুরোনো ও নতুন জরিপের খতিয়ানে জমির দাগ নম্বর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই একটি খতিয়ানের তথ্যের সঙ্গে অন্য জরিপের রেকর্ডের মিল যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, খতিয়ান জমির রেকর্ডসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলেও শুধু খতিয়ানের ভিত্তিতে সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না। জমির দলিল, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র, নামজারি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, জমির পর্চা সংগ্রহের জন্য এখন ঘরে বসেই সরকারি অনলাইন সেবা ব্যবহার করা সম্ভব। সঠিক মৌজা, জরিপ ও খতিয়ানের তথ্য জানা থাকলে অল্প সময়েই প্রয়োজনীয় রেকর্ড খুঁজে আবেদন করা যায়। এতে ভূমি অফিসে বারবার যাতায়াতের প্রয়োজন কমে এবং জমিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতের নাগালেই পাওয়া সম্ভব।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. জমির পর্চা কি মোবাইল ফোন দিয়ে সংগ্রহ করা যায়?

হ্যাঁ। স্মার্টফোন থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি অনলাইন সেবায় প্রবেশ করে জমির খতিয়ান অনুসন্ধান ও কপির জন্য আবেদন করা যায়।

২. অনলাইনে জমির পর্চা তুলতে কত টাকা লাগে?

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, প্রতি খতিয়ানের অনলাইন বা সার্টিফায়েড কপির জন্য সরকারি ফি ও সেবা ফি মিলিয়ে ১২০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।

৩. খতিয়ান নম্বর না জানলেও কি জমির পর্চা পাওয়া যাবে?

হ্যাঁ। পোর্টালের অনুসন্ধান পদ্ধতি অনুযায়ী মালিকের নাম বা দাগ নম্বর দিয়ে খতিয়ান খোঁজার সুযোগ রয়েছে।

৪. অনলাইন পর্চা ও সার্টিফায়েড পর্চা কি একই?

না। অনলাইন কপি ডিজিটালভাবে পাওয়া যায়। সার্টিফায়েড কপি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সত্যায়িত নথি। দাপ্তরিক বা আইনি প্রয়োজনে কোনটি প্রয়োজন, তা আগে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

৫. অনলাইনে জমির খতিয়ান না পাওয়া গেলে কোথায় যোগাযোগ করবেন?

সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম অথবা ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্রের ১৬১২২ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: