ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

খতিয়ান, পর্চা নাকি দাগ নম্বর—কোনটির কাজ কী?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০১ ১১:৩৪:৫৩
খতিয়ান, পর্চা নাকি দাগ নম্বর—কোনটির কাজ কী?

জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা নির্ধারণ, নামজারি কিংবা জমি নিয়ে বিরোধ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই তিনটি বিষয়কে অনেকেই একই মনে করেন। বাস্তবে এগুলোর কাজ এক নয়। কোনোটি জমির মালিকানা ও অংশের তথ্য সংরক্ষণ করে, কোনোটি সেই রেকর্ডের কপি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার কোনোটি মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির অবস্থান শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জরিপের সময় প্রতিটি ভূমিখণ্ডকে আলাদা প্লটে ভাগ করে মৌজা নকশা তৈরি করা হয় এবং প্রতিটি প্লটে দাগ নম্বর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নকশা ও পর্চা বা খতিয়ানের মাধ্যমে ভূমির স্বত্ব-সংক্রান্ত তথ্য চিহ্নিত করা হয়।

তাই জমির কাগজপত্র বুঝতে হলে আগে জানতে হবে—খতিয়ান কী, পর্চা কী এবং দাগ নম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ।

খতিয়ান কী?

সহজ ভাষায়, খতিয়ান হলো নির্দিষ্ট জমি ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মালিকানা বা স্বত্বের তথ্যসম্বলিত ভূমি রেকর্ড। এতে সাধারণত মালিক বা মালিকদের নাম, মৌজার নাম ও নম্বর, দাগ নম্বর, ওই দাগে জমির পরিমাণ এবং মালিকের অংশের মতো তথ্য থাকে।

অর্থাৎ একটি খতিয়ান দেখলে নির্দিষ্ট রেকর্ডের আওতায় কার নামে কতটুকু জমি রয়েছে, কোন দাগে সেই জমি রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন ব্যবস্থাতেও খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং খতিয়ানে সংশ্লিষ্ট দাগে জমির পরিমাণের মতো তথ্য ব্যবহার করা হয়।

খতিয়ানে কী ধরনের তথ্য থাকে?

একটি খতিয়ানে সাধারণত দেখা যেতে পারে—

খতিয়ান নম্বর

মালিক বা মালিকদের নাম

পিতা বা স্বামীর নামসহ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য

মৌজার নাম ও জেএল নম্বর

দাগ নম্বর

দাগে মোট জমির পরিমাণ

মালিকের অংশ ও প্রাপ্য জমির পরিমাণ

জমির শ্রেণিসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের তথ্য

তবে খতিয়ানের ধরন ও সংশ্লিষ্ট জরিপ অনুযায়ী তথ্যের বিন্যাসে পার্থক্য থাকতে পারে।

পর্চা কী?

পর্চা মূলত খতিয়ানের অনুলিপি বা নির্যাস কপি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সার্ভে ও সেটেলমেন্ট ম্যানুয়ালে পর্চাকে খতিয়ানের অনুরূপ নির্যাস কপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জরিপের সময় প্রস্তুত করা রেকর্ডের একটি কপি ভূমির মালিককে দেওয়া হতে পারে, যা পর্চা নামে পরিচিত। জরিপের পর্যায়ে এই পর্চার মাধ্যমে জমির রেকর্ডে কী তথ্য রয়েছে, তা যাচাই করার সুযোগও থাকে।

আরও পড়ুন:

জমির দলিল আসল না নকল, বুঝবেন যেভাবে

খতিয়ানে নিজের নাম আছে কি না দেখবেন যেভাবে, জানুন সহজ পদ্ধতি

নামজারি করতে কী কী লাগে, জানুন আবেদন থেকে খতিয়ান পাওয়ার নিয়ম

সহজভাবে বললে—

খতিয়ান হলো মূল ভূমি রেকর্ড, আর সেই রেকর্ডের কপি বা নির্যাসকে পর্চা বলা হয়।

তবে বাস্তবে ‘পর্চা’ শব্দটি বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডের কপি বোঝাতে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই কোনো জমির কাগজ হাতে পেলে সেটি কোন জরিপের এবং সেটি চূড়ান্ত রেকর্ডের সার্টিফাইড কপি কি না—সেটিও যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

দাগ নম্বর কী?

জমির দাগ নম্বর হলো মৌজা নকশায় একটি নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড বা প্লট শনাক্ত করার নম্বর।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জরিপের সময় প্রতিটি ভূমিখণ্ডকে আলাদা প্লটে ভাগ করে মৌজা নকশা তৈরি করা হয় এবং প্রতিটি প্লটে দাগ নম্বর বসানো হয়।

এ কারণে কোনো জমি কোথায় অবস্থিত এবং নকশায় কোন অংশটি সংশ্লিষ্ট জমি—তা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে দাগ নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দাগের মধ্যে জমির পরিমাণ, শ্রেণি এবং সেটি কোন খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—এসব তথ্যের সঙ্গে খতিয়ান ও দাগ নম্বর পরস্পর সম্পর্কিত। সরকারি মিউটেশন ব্যবস্থাতেও খতিয়ান ও দাগ নম্বর একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।

খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বরের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে মনে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—

বিষয়সহজ অর্থপ্রধান কাজ
খতিয়ান ভূমির স্বত্ব/রেকর্ডের বিবরণ মালিক, দাগ, জমির পরিমাণ ও অংশসহ রেকর্ডের তথ্য দেখায়
পর্চা খতিয়ানের কপি বা নির্যাস খতিয়ানে থাকা তথ্যের কপি হিসেবে ব্যবহৃত হয়
দাগ নম্বর জমির প্লট শনাক্ত করার নম্বর মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির অবস্থান চিহ্নিত করে

অর্থাৎ, খতিয়ান হলো রেকর্ডের হিসাব, পর্চা সেই রেকর্ডের কপি এবং দাগ নম্বর হলো নকশায় জমি শনাক্ত করার নম্বর।

জমি কেনার সময় তিনটিই কেন গুরুত্বপূর্ণ?

জমি কেনার ক্ষেত্রে শুধু একটি কাগজ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ জমির পরিচয় ও রেকর্ড যাচাই করতে খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা নকশা এবং সংশ্লিষ্ট দলিলসহ একাধিক নথির তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষ করে খতিয়ানে যে দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নকশা ও অন্যান্য কাগজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি জরিপ নির্দেশিকাতেও খতিয়ানে থাকা দাগ ও জমির পরিমাণ সঠিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।

তাই কোনো জমি কেনার আগে শুধু ‘খতিয়ানে নাম আছে’—এমন তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের ধারাবাহিকতা ও জমির বাস্তব পরিচয় যাচাই করা উচিত।

একই জমির দাগ বা খতিয়ান নম্বর কি সব সময় একই থাকে?

না, সব সময় একই থাকবে এমন নয়। জমির রেকর্ড বিভিন্ন জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত হয়েছে এবং পরবর্তী জরিপে নম্বর বা রেকর্ডের পরিবর্তন হতে পারে। সরকারি নথিতে বিভিন্ন জরিপের দাগের ‘হাল-সাবেক’ সম্পর্কের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে।

এ কারণেই কোনো পুরোনো দলিলে থাকা দাগ নম্বর দেখেই সেটিকে বর্তমান দাগ নম্বর ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ড ও হাল-সাবেক তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নামজারির ক্ষেত্রেও খতিয়ান ও দাগ নম্বর গুরুত্বপূর্ণ

জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর নামজারি বা মিউটেশনের সময়ও খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্য প্রয়োজন হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন নির্দেশিকায় আবেদন করার সময় খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, আবেদন করা জমির পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দাগে খতিয়ানভুক্ত জমির পরিমাণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নামজারি সম্পন্ন হলে নতুন খতিয়ান তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রেও আগের খতিয়ান ও দাগের সঙ্গে নতুন রেকর্ডের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়। ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালে এ ধরনের নতুন খতিয়ান ও সংশ্লিষ্ট দাগের তথ্য লিপিবদ্ধ করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

সার্টিফাইড পর্চা কোথা থেকে পাওয়া যায়?

চূড়ান্ত প্রকাশনার পর সংশ্লিষ্ট রেকর্ড জেলা প্রশাসকের দপ্তরে হস্তান্তর করা হয়। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রেকর্ড হস্তান্তরের পর জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম থেকে খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি বা পর্চা সংগ্রহ করা যায়।

এ ছাড়া ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে খতিয়ান ও ম্যাপ খোঁজার জন্য অনলাইন ই-সেবাও রয়েছে।

জমির কাগজ বুঝতে সহজ সূত্র

যারা জমির কাগজপত্র নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্ত হন, তারা বিষয়টি এভাবে মনে রাখতে পারেন—

দাগ নম্বর = নকশায় জমি কোথায়

খতিয়ান = রেকর্ডে জমি কার/কার অংশে কত

পর্চা = সেই খতিয়ানের কপি বা নির্যাস

তবে জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এগুলোর পাশাপাশি রেজিস্ট্রি দলিল, নামজারি, সংশ্লিষ্ট জরিপের রেকর্ড, মৌজা নকশা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য নথি মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি কাগজকে আলাদা করে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়ার পরিবর্তে সব তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না যাচাই করাই নিরাপদ পদ্ধতি।

জমি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘খতিয়ান’, ‘পর্চা’ ও ‘দাগ নম্বর’—এই তিনটি শব্দ সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। কিন্তু তিনটির ভূমিকা আলাদা। খতিয়ান জমির রেকর্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ধারণ করে, পর্চা সেই রেকর্ডের কপি বা নির্যাস এবং দাগ নম্বর মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

জমি কেনাবেচা বা মালিকানা-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাই শুধু একটি নম্বর বা একটি কাগজ না দেখে সংশ্লিষ্ট সব রেকর্ড পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

FAQ

১. খতিয়ান ও পর্চা কি একই জিনিস?

একেবারে একই নয়। সরকারি সার্ভে ও সেটেলমেন্ট ম্যানুয়াল অনুযায়ী, পর্চা হলো খতিয়ানের অনুরূপ নির্যাস বা কপি।

২. দাগ নম্বর দিয়ে কী বোঝা যায়?

দাগ নম্বর মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ড বা প্লট শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

৩. খতিয়ানে কী কী তথ্য থাকে?

সাধারণত মালিকের নাম, মৌজা, দাগ নম্বর, দাগে জমির পরিমাণ, মালিকের অংশ ও সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ডের তথ্য থাকে।

৪. পুরোনো দলিলের দাগ নম্বর আর বর্তমান দাগ নম্বর কি একই হতে পারে?

হতে পারে, আবার জরিপ পরিবর্তনের কারণে ভিন্নও হতে পারে। তাই হাল-সাবেক দাগের সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট রেকর্ড দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

৫. সার্টিফাইড পর্চা কোথা থেকে পাওয়া যায়?

চূড়ান্ত রেকর্ড জেলা প্রশাসকের দপ্তরে হস্তান্তরের পর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম থেকে খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি বা পর্চা সংগ্রহ করা যায়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ