ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

ফজরের নামাজের শেষ সময় কখন? কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

ধর্ম ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৫ ২১:২৬:১১
ফজরের নামাজের শেষ সময় কখন? কোরআন-হাদিসে যা বলা হয়েছে

ফজরের নামাজের সময় সুবহে সাদিক বা প্রকৃত ভোর শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত। অর্থাৎ সূর্য ওঠার আগেই ফজরের নামাজ আদায় করতে হয়। সূর্যের প্রথম অংশ দিগন্তে দেখা দেওয়ার সঙ্গে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়। সহিহ হাদিসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ফজরের নামাজের সময়সীমা সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত বলে স্পষ্ট করেছেন।

এ কারণে ফজরের নামাজের শেষ সময় জানতে শুধু ঘড়ির একটি নির্দিষ্ট সময় মনে রাখলে হবে না। নিজ এলাকার ওই দিনের সূর্যোদয়ের সময় জানা জরুরি। তবে সূর্য ওঠার একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগে নামাজ আদায় করাই নিরাপদ।

ফজরের নামাজের সময় শুরু হয় কখন?

ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয় সুবহে সাদিক হওয়ার সঙ্গে। ইসলামী পরিভাষায় এটি এমন প্রকৃত ভোর, যখন পূর্ব আকাশে আলো আড়াআড়িভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যায়।

সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় ফজরের ওয়াক্তের সঙ্গে প্রকৃত ভোরের সম্পর্ক স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাদিসে মিথ্যা ভোর বা এমন আলো, যা প্রকৃত ভোরের আগে দেখা যায়, সেটি এবং প্রকৃত ভোরের মধ্যে পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে।

আর সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, হযরত বিলাল (রা.) রাতে আজান দিতেন। এরপর ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) ফজরের সময় হলে আজান দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদের জানিয়েছেন, ইবনে উম্মে মাকতুমের আজান না হওয়া পর্যন্ত সাহরি খাওয়া-দাওয়া করা যেত।

অর্থাৎ ফজরের প্রকৃত ওয়াক্ত শুরু হওয়ার বিষয়টি ভোরের প্রকৃত উদয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ফজরের নামাজের সময় কখন শেষ হয়?

এর সরাসরি উত্তর হলো—সূর্যোদয়ের সঙ্গে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের সময় সম্পর্কে বলেছেন, ফজরের সময় থাকে সূর্যের প্রথম অংশ উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত।

অন্য একটি সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ফজরের নামাজের সময় শুরু হয় ভোর হওয়ার পর এবং সূর্য ওঠা পর্যন্ত তা থাকে। সূর্য উঠে গেলে ওই সময়ের ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়।

তাই সহজভাবে বলা যায়:

সুবহে সাদিক → ফজরের ওয়াক্ত শুরু

সূর্যোদয় → ফজরের ওয়াক্ত শেষ

কোরআনে ফজরের নামাজ সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?

পবিত্র কোরআনে সূরা আল-ইসরার ৭৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নামাজের সময়ের কথা উল্লেখ করে ফজরের নামাজকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। আয়াতে বলা হয়েছে, “ফজরের কোরআন পাঠ”—নিশ্চয়ই তা প্রত্যক্ষ করা হয়।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ফজরের নামাজকে ভোরের নামাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাফসিরে বলা হয়েছে, ফজরের সময় ফেরেশতাদের উপস্থিতির কারণে এ সময়ের কোরআন তিলাওয়াত বিশেষভাবে ‘মাশহুদ’ বা প্রত্যক্ষ করা হয়।

সহিহ বুখারিতেও আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, রাতের ও দিনের ফেরেশতারা ফজরের সময় একত্র হন। এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা আল-ইসরা ৭৮ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন।

সূর্য ওঠার পর ফজরের নামাজ পড়া যাবে?

ফজরের ওয়াক্ত সূর্যোদয়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ফজরের নামাজ সূর্যোদয় পর্যন্ত বিলম্ব করা উচিত নয়।

সহিহ মুসলিমে আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজের পর সূর্য ওঠা পর্যন্ত নামাজ আদায় না করার কথা বলেছেন।

তবে কেউ যদি ঘুমিয়ে যাওয়ার মতো অনিচ্ছাকৃত কারণে ফজরের নামাজের ওয়াক্ত পার করে ফেলেন, তার জন্য বিষয়টি আলাদা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে ঘুম বা ভুলে যাওয়ার কারণে নামাজ ছুটে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্মরণ হলে নামাজ আদায়ের নির্দেশ এসেছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় আলেম বা নির্ভরযোগ্য ইসলামী জ্ঞানীর কাছ থেকে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী মাসআলা জেনে নেওয়া উত্তম।

সূর্য ওঠার আগে এক রাকাত পেলে কী হবে?

ফজরের নামাজ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি সূর্য ওঠার আগে ফজরের এক রাকাত পেয়ে যায়, সে ফজরের নামাজ পেয়েছে।

সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনাতেও একই অর্থ পাওয়া যায়—সূর্য ওঠার আগে ফজরের এক রাকাত পাওয়া গেলে ফজরের নামাজ পাওয়া হয়েছে বলে গণ্য হয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইচ্ছা করে নামাজকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া উচিত। বরং সময় থাকতে নামাজ শুরু করা উচিত, যাতে ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আশঙ্কা না থাকে।

ফজরের শেষ সময় নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা

অনেকেই মনে করেন, ফজরের আজানের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নামাজ পড়া যায়। বাস্তবে ফজরের শেষ সময় ঘড়ির কোনো স্থায়ী সময় নয়।

উদাহরণ হিসেবে, একদিন কোনো এলাকায় সূর্যোদয় যদি সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে হয়, তাহলে ফজরের ওয়াক্ত ওই সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত থাকবে। অন্যদিন সূর্যোদয়ের সময় পরিবর্তিত হলে ফজরের শেষ সময়ও পরিবর্তিত হবে।

এ কারণে নামাজের সময়সূচি দেখার সময় ফজরের শুরু এবং সূর্যোদয়ের সময়—দুটিই দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ফজরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার আগে কী করবেন?

ফজরের নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই উত্তম। বিশেষ করে ঘুম থেকে দেরিতে ওঠার পর যদি সূর্যোদয়ের সময় খুব কাছে চলে আসে, তাহলে দ্রুত ফজরের নামাজ আদায় করা উচিত।

মনে রাখতে হবে, ফজরের ওয়াক্তের শেষ সীমা হলো সূর্যোদয়। সহিহ হাদিসে এই সময়সীমা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ফজরের নামাজের সময় সম্পর্কে কোরআন ও সহিহ হাদিসের বক্তব্য একত্র করলে বিষয়টি পরিষ্কার: ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয় প্রকৃত ভোরে এবং সূর্যোদয়ের সঙ্গে শেষ হয়। পবিত্র কোরআন ফজরের সময়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) সহিহ হাদিসে এর সময়সীমা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

তাই প্রতিদিন ফজরের নামাজের শেষ সময় জানতে নিজের এলাকার সূর্যোদয়ের সময় দেখে নেওয়া উচিত। আর নামাজকে ওয়াক্তের একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পিছিয়ে না দিয়ে সময়ের শুরুতেই আদায় করার চেষ্টা করা উত্তম।

FAQ

১. ফজরের নামাজের সময় কখন শেষ হয়?

সূর্যোদয়ের সঙ্গে ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শেষ হয়। সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের সময় সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

২. ফজরের ওয়াক্ত কখন শুরু হয়?

সুবহে সাদিক বা প্রকৃত ভোর শুরু হলে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়।

৩. সূর্য ওঠার পর ফজরের নামাজের ওয়াক্ত থাকে কি?

না। সূর্যোদয়ের সঙ্গে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়।

৪. সূর্য ওঠার আগে এক রাকাত ফজর পড়তে পারলে কি নামাজ পাওয়া যাবে?

সহিহ হাদিস অনুযায়ী, সূর্য ওঠার আগে এক রাকাত ফজর পাওয়া গেলে ফজরের নামাজ পাওয়া হয়েছে বলে গণ্য হয়।

৫. ফজরের নামাজের সময় প্রতিদিন একই থাকে কি?

না। ফজরের শুরু ও শেষের সময় স্থান ও দিনের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। তাই প্রতিদিনের নামাজের সময়সূচিতে ফজরের সময় এবং সূর্যোদয়ের সময় দেখে নেওয়া উচিত।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত: