ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ডিম খেলে কী হয়? প্রতিদিন কয়টি খাওয়া স্বাস্থ্যকর?

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৮:০৭:১৩
ডিম খেলে কী হয়? প্রতিদিন কয়টি খাওয়া স্বাস্থ্যকর?

সাশ্রয়ী দামে উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার অন্যতম সহজ উৎস ডিম। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর বা রাতের খাবার—প্রায় যেকোনো সময়ই খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা যায়। তবে ডিম খাওয়ার উপকারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি প্রতিদিন কতটি ডিম খাওয়া উচিত, কুসুমসহ খাওয়া কতটা স্বাস্থ্যকর এবং কোলেস্টেরলের ওপর এর প্রভাব কী—এসব বিষয়েও অনেকের প্রশ্ন রয়েছে।

সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি ডিম সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে প্রতিদিন একাধিক ডিম খাওয়া সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির মতো বিষয় বিবেচনা করে ডিমের পরিমাণ ঠিক করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডিমের সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে এবং রান্নায় কতটা তেল বা ঘি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিম খেলে শরীরে কী কী উপকার হয়?

ডিমে শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। প্রোটিনের পাশাপাশি এতে ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম, কোলিন এবং ডিমের কুসুমে ভিটামিন ডি ও চোখের জন্য উপকারী কিছু ক্যারোটিনয়েড পাওয়া যায়। এসব পুষ্টি শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কোষের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন অঙ্গের সুস্থতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।

১. পেশি গঠন ও শরীরের ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে

ডিমে উচ্চমানের প্রোটিন থাকে, যাতে শরীরের প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায়। এই প্রোটিন পেশি গঠন, শরীরের কোষ মেরামত এবং বিভিন্ন টিস্যুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।

যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, খেলাধুলায় অংশ নেন কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন, তাঁদের খাদ্যতালিকায় ডিম প্রোটিনের একটি সুবিধাজনক উৎস হতে পারে। তবে শুধু ডিম খেলেই পেশি বাড়ে না; পর্যাপ্ত মোট প্রোটিন, সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামও প্রয়োজন।

২. দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে

ডিমের প্রোটিন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। সকালের নাশতায় ডিমের সঙ্গে আটার রুটি, ওটস বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে তুলনামূলকভাবে পরিপূর্ণ একটি খাবার পাওয়া যায়।

এতে খাবারের মাঝখানে দ্রুত ক্ষুধা লাগার প্রবণতা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কমতে পারে। তবে ডিম খেলেই ওজন কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ওজন নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে সারাদিনে মোট কত ক্যালরি গ্রহণ করা হচ্ছে, শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর।

৩. মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে

ডিমের কুসুমে কোলিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এটি কোষের ঝিল্লি তৈরি এবং অ্যাসিটাইলকোলিন নামের একটি স্নায়ু-সংকেতবাহী রাসায়নিক উৎপাদনে ভূমিকা রাখে।

কোলিন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত কোলিন গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু ডিম খেলেই স্মৃতিশক্তি বাড়বে বা মস্তিষ্কের সব সমস্যা প্রতিরোধ হবে—এমন দাবি করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।

৪. চোখের স্বাস্থ্যে সহায়তা করে

ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন নামের দুটি ক্যারোটিনয়েড থাকে। এগুলো চোখের রেটিনায় উপস্থিত থাকে এবং স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ডিমের পাশাপাশি গাঢ় সবুজ শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খেলে চোখের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সহজ হয়। তবে ডিম চোখের সব রোগ প্রতিরোধ বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যা সারিয়ে দেয় না।

৫. হাড় ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজে ভূমিকা রাখে

ডিমে ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে সেলেনিয়াম শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবস্থা ও থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।

তবে একটি ডিম থেকেই সব প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণ হয় না। এ জন্য সুষম খাদ্যতালিকায় মাছ, ডাল, শাকসবজি, ফল, দুধ বা উপযুক্ত বিকল্প এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি।

প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া উচিত?

ডিমের সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম খাওয়া সাধারণত সুষম খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানানসই। American Heart Association-ও সুস্থ মানুষের খাদ্যতালিকায় দৈনিক একটি সম্পূর্ণ ডিম রাখার বিষয়টি সমর্থন করে।

প্রতিদিন একাধিক ডিম খাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করে ব্যক্তির সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং অন্যান্য প্রোটিনের উৎসের ওপর। গবেষণায় ডিম ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে কিছু ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে। তাই সবার জন্য প্রতিদিন দুই বা তিনটি ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া ঠিক নয়।

বয়স ও স্বাস্থ্য অনুযায়ী ডিম খাওয়ার বিষয়টি কীভাবে দেখবেন?

সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক: প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।

শিশু ও কিশোর-কিশোরী: বয়স, বৃদ্ধি, মোট খাবার ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী ডিমের পরিমাণ ঠিক করতে হবে।

বয়স্ক ব্যক্তি: বয়সের পাশাপাশি কোলেস্টেরল, হৃদ্‌স্বাস্থ্য, ক্ষুধা ও সামগ্রিক পুষ্টির অবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি: ডিমের কুসুমের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি: শুধু ডিমের সংখ্যা নয়, পুরো খাদ্যতালিকা ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এগুলো সাধারণ নির্দেশনা, নির্দিষ্ট চিকিৎসা-পরামর্শ নয়। বিশেষ কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিমের পরিমাণ ঠিক করাই সবচেয়ে ভালো।

ডিমের কুসুম খাওয়া কি ক্ষতিকর?

ডিমের কুসুম নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় এর কোলেস্টেরলের কারণে। একটি বড় ডিমে প্রায় ১৮৬–২০০ মিলিগ্রাম খাদ্যজাত কোলেস্টেরল থাকতে পারে। তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল আর রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়। রক্তের LDL বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রায় খাদ্যাভ্যাসের বিভিন্ন উপাদান, বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

কুসুমে কোলিন, ভিটামিন এবং চোখের জন্য উপকারী লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো পুষ্টি উপাদানও রয়েছে। তাই সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে কুসুমকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

তবে রক্তে LDL কোলেস্টেরল বেশি থাকলে, হৃদ্‌রোগ থাকলে কিংবা চিকিৎসক খাদ্যজাত কোলেস্টেরল সীমিত রাখতে বললে কুসুম খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে ব্যক্তিগত পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে ডিমের সাদা অংশ দিয়ে প্রোটিনের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা যেতে পারে।

সেদ্ধ ডিম, পোচ নাকি ভাজা—কোনটি ভালো?

ডিম কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেটিও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিমের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি রান্নায় ব্যবহৃত তেল, মাখন, ঘি ও অন্যান্য উপকরণ থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট যোগ হতে পারে।

সেদ্ধ ডিম: বাড়তি তেল ছাড়াই খাওয়া যায়, তাই সহজ ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প।

পোচ ডিম: অল্প তেলে বা তেল ছাড়া তৈরি করলে ভালো বিকল্প হতে পারে।

অমলেট: ডিমের সঙ্গে পেঁয়াজ, টমেটো ও অন্যান্য সবজি যোগ করা যায়; তবে তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা ভালো।

ভাজা ডিম: অল্প তেলে রান্না করুন। অতিরিক্ত মাখন বা ঘি ব্যবহার না করাই ভালো।

ডিমের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস, সসেজ, বেকন কিংবা প্রচুর মাখন খাওয়ার বদলে শাকসবজি, ফল, ডাল ও পূর্ণশস্যজাতীয় খাবার রাখলে সামগ্রিক খাদ্যতালিকা আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

ডিম খাওয়ার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

ডিম পুষ্টিকর হলেও নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও রান্না করা জরুরি। কাঁচা বা আধা-সেদ্ধ ডিমে সালমোনেলার মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকার ঝুঁকি রয়েছে। তাই ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম ভালোভাবে জমাট হওয়া পর্যন্ত রান্না করা নিরাপদ অভ্যাস। গর্ভবতী নারী, ছোট শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ডিমে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলতে হবে। ডিম খাওয়ার পর শ্বাসকষ্ট, গলা বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া কিংবা গুরুতর অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

ডিমকে অস্বাস্থ্যকর খাবার ভেবে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এতে উচ্চমানের প্রোটিন, কোলিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি ডিম সাধারণত সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে একাধিক ডিম খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করা জরুরি।

ডিমের সর্বোচ্চ উপকার পেতে সেদ্ধ বা অল্প তেলে রান্না করা ডিমের সঙ্গে শাকসবজি, ফল, ডাল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন। মনে রাখবেন, একটি খাবার নয়—সারাদিনের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. সুস্থ মানুষ প্রতিদিন কয়টি ডিম খেতে পারেন?

সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। একাধিক ডিম খাওয়ার উপযোগিতা ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।

২. প্রতিদিন ডিম খেলে কি কোলেস্টেরল বেড়ে যায়?

সবার ক্ষেত্রে একই প্রভাব পড়ে না। ডিমের কুসুমে খাদ্যজাত কোলেস্টেরল রয়েছে, তবে রক্তের কোলেস্টেরল নির্ভর করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্যের ওপরও।

৩. ডিমের সাদা অংশ ভালো, নাকি কুসুম?

সাদা অংশে প্রধানত প্রোটিন থাকে। কুসুমে কোলিন, বিভিন্ন ভিটামিন এবং চোখের জন্য উপকারী কিছু পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সুস্থ মানুষের জন্য দুটিই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।

৪. ওজন কমাতে ডিম খাওয়া কি উপকারী?

ডিমের প্রোটিন পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে ওজন কমানো নির্ভর করে মোট ক্যালরি গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তার ওপর।

৫. সেদ্ধ ডিম খাওয়া ভালো, নাকি ভাজা ডিম?

সেদ্ধ ডিমে বাড়তি তেল লাগে না। ভাজা ডিমও স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে, যদি তেল বা মাখনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত: