প্রবাসী কার্ড ও বিএমইটি স্মার্ট কার্ডের পার্থক্য কী?
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি ও বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে বিমানবন্দরে বিশেষ সুবিধা, চিকিৎসায় ছাড়, ব্যাংকিং সেবা, ঋণ সুবিধা, পুনর্বাসনসহ ১০ ধরনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী ডেবিট কার্ড ইস্যুর কথা জানানো হয়েছে। তবে কার্ডটির আবেদন করতে কত টাকা লাগবে, কারা আবেদন করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য আবেদন কবে শুরু হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা জেনে নেওয়া জরুরি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই প্রবাসী কার্ড চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয় ও জনতা ব্যাংক পিএলসির মধ্যে এ কার্ড চালুর লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনায় প্রবাসীদের আর্থিক সেবা সহজ করা, তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সরকারি ও বাণিজ্যিক সেবায় অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রবাসী কার্ড কী?
প্রবাসী কার্ড হলো বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশীদের জন্য সরকারের পরিকল্পিত একটি কার্ডভিত্তিক সেবা উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, কার্ডটির অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের আর্থিক লেনদেন সহজ করা, রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া এবং দেশে তাঁদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সুবিধাজনক করা।
প্রবাসী কার্ডে যেসব ১০টি সুবিধা পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে
সরকারের ঘোষণায় প্রবাসী কার্ডের আওতায় অন্তত ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব সুবিধার বাস্তবায়ন, যোগ্যতা ও প্রযোজ্য শর্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
১. বিমানবন্দরে বিশেষ সুবিধা
দেশে ও বিদেশে বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা এবং বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথের মাধ্যমে দ্রুত সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
২. Meet & Greet সেবা
বিমানবন্দরে যাত্রীদের সহায়তার জন্য বিশেষ Meet & Greet সেবা চালুর কথা জানানো হয়েছে।
৩. বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে ছাড়
প্রবাসী কার্ডধারীদের বিমান টিকিট কেনা এবং হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
৪. গাড়ি বুকিং ও যাতায়াত সুবিধা
দেশে ও বিদেশে গাড়ি বুকিংয়ের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সিগনেচার কার্ডধারীদের জন্য বিমানবন্দরে পিক-আপ ও ড্রপ-অফ সুবিধার কথাও ঘোষণায় উল্লেখ রয়েছে।
৫. চিকিৎসাসেবায় অগ্রাধিকার ও ছাড়
সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা বুথ এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
৬. মরদেহ দেশে পরিবহন
বিদেশে কোনো কার্ডধারী প্রবাসীর মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ বিনা খরচে দেশে আনার সুবিধার কথা সরকারি ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ সুবিধার প্রযোজ্য শর্ত ও বাস্তবায়নপদ্ধতি সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত হতে হবে।
৭. পুনর্বাসন ও বীমা সুবিধা
বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসন এবং বীমাসংক্রান্ত সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
৮. সরকারি সেবায় অগ্রাধিকার
জমি নিবন্ধন, নামজারি, ইউটিলিটি সংযোগ, লাইসেন্স প্রদান এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৯. ব্যাংকিং, ঋণ ও রেমিট্যান্স সুবিধা
রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্রেডিট স্কোরিং, ঋণ সুবিধা এবং কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাঠানো ও সহজ লেনদেনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
১০. পরিচয়পত্র ও কনস্যুলার সেবা
জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, কনস্যুলার সেবা, ব্যাংকিং এবং সরকারের অন্যান্য সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
মনে রাখতে হবে: এগুলো সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনায় উল্লেখিত সুবিধা। সব সুবিধা ইতিমধ্যে চালু হয়েছে বা সব ধরনের কার্ডধারী একই সুবিধা পাবেন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রবাসী কার্ডের আবেদন কবে শুরু হবে?
প্রবাসী কার্ড চালুর বিষয়ে ১৮ জুলাই ২০২৬-এর সরকারি ঘোষণায় আগস্টের মাঝামাঝি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার এবং ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ২ লাখ কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে ১০ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রণালয় ও জনতা ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের পরিকল্পনা এবং সবার জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হওয়া এক বিষয় নয়।
১৬ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পর্যালোচিত সরকারি প্রকাশনায় সাধারণ মানুষের জন্য আবেদন শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ ও পূর্ণাঙ্গ আবেদন নির্দেশনা নিশ্চিত করা যায়নি। তাই আবেদন চালু হয়েছে ধরে নিয়ে কোথাও টাকা জমা দেওয়া বা অনানুষ্ঠানিক ফরম পূরণ করা উচিত নয়।
সর্বশেষ তথ্য জানতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট দেখুন: https://probashi.gov.bd/
প্রবাসী কার্ড করতে কী কী কাগজপত্র লাগবে?
কার্ডটির চূড়ান্ত আবেদন নির্দেশনা নিশ্চিত না হওয়ায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া যাচ্ছে না। পরিচয় যাচাই, পাসপোর্ট, প্রবাসে অবস্থানের প্রমাণ কিংবা ব্যাংক হিসাবের তথ্য লাগবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় নিশ্চিত হতে হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিএমইটি নিবন্ধন ও বহির্গমন ছাড়পত্রের মতো আলাদা প্রক্রিয়া রয়েছে। এসব নথিকে নতুন প্রবাসী কার্ডের আবেদনপত্রের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
বিএমইটির সরকারি ওয়েবসাইট: https://bmet.gov.bd/
প্রবাসী কার্ড করতে কত টাকা লাগবে?
প্রবাসী কার্ডের আবেদন ফি, কার্ড ইস্যুর খরচ কিংবা বার্ষিক চার্জ সম্পর্কে নিশ্চিত সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে নির্দিষ্ট কোনো টাকার অঙ্ক উল্লেখ করা ঠিক হবে না।
প্রথম পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী ডেবিট কার্ড ইস্যুর পরিকল্পনা থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে আবেদন ফি বা অন্যান্য চার্জ ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে।
কার্ড করে দেওয়ার নামে কেউ আগাম টাকা চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন। সরকারি নির্দেশনা প্রকাশের আগে কোনো অননুমোদিত ব্যক্তিকে টাকা বা ব্যক্তিগত নথি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
প্রবাসী কার্ড ও বিএমইটি স্মার্ট কার্ড কি একই?
না, দুটি কার্ডের উদ্দেশ্য আলাদা।
বিএমইটি স্মার্ট কার্ড বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া কর্মীদের নিবন্ধন ও বহির্গমন ছাড়পত্রের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, নতুন প্রবাসী কার্ড উদ্যোগের লক্ষ্য প্রবাসীদের ব্যাংকিং, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন সেবায় বাড়তি সুবিধা দেওয়া।
তাই বিএমইটি স্মার্ট কার্ড থাকলেই নতুন প্রবাসী কার্ড পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দুটি সেবার যোগ্যতা ও আবেদনপদ্ধতি আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
প্রবাসী কার্ডের সর্বশেষ তথ্য কোথায় পাবেন?
আবেদন শুরুর তারিখ, যোগ্যতা, ফি ও সুবিধার বিস্তারিত জানতে নিচের সরকারি ওয়েবসাইটগুলো অনুসরণ করুন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: https://probashi.gov.bd/
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো: https://bmet.gov.bd/
জনতা ব্যাংক: https://www.janatabank-bd.com/
প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারেও যোগাযোগ করা যেতে পারে। বাংলাদেশ থেকে ১৬১৩৫ নম্বরে এবং বিদেশ থেকে +৮৮ ০৯৬১০ ১০২ ০৩০ নম্বরে যোগাযোগের তথ্য বিএমইটির ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং, রেমিট্যান্স, চিকিৎসা, বিমানবন্দর এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের মতো ক্ষেত্রে প্রবাসীরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।
তবে এখনই আবেদন ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা সব সুবিধা কার্যকর হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করা ঠিক হবে না। আবেদন শুরুর ঘোষণা ও চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রকাশিত হলে সরকারি সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করে আবেদন করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. প্রবাসী কার্ড কী?
প্রবাসী কার্ড হলো প্রবাসী বাংলাদেশি ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ব্যাংকিং, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন সেবায় সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকারের পরিকল্পিত একটি উদ্যোগ।
২. প্রবাসী কার্ডের আবেদন কি শুরু হয়েছে?
১৬ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পর্যালোচিত সরকারি তথ্য থেকে সবার জন্য আবেদন শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করা যায়নি। সর্বশেষ নির্দেশনার জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট দেখুন।
৩. প্রবাসী কার্ড করতে কত টাকা লাগবে?
আবেদন ফি ও কার্ড ইস্যুর খরচ সম্পর্কে নিশ্চিত সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রকাশিত হলে খরচ জানা যাবে।
৪. প্রবাসী কার্ডে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে?
ঘোষিত পরিকল্পনায় বিমানবন্দর, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, ঋণ, রেমিট্যান্স, পুনর্বাসন ও বিভিন্ন সরকারি সেবায় সুবিধার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবায়নের শর্ত সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
৫. প্রবাসী কার্ড ও বিএমইটি স্মার্ট কার্ড কি একই?
না। বিএমইটি স্মার্ট কার্ড বিদেশগামী কর্মীদের অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন প্রবাসী কার্ডের লক্ষ্য প্রবাসীদের আর্থিক ও অন্যান্য সেবায় সুবিধা দেওয়া।
আল-মামুন/