ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ, বদলাল তালিকাভুক্তির নিয়ম

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১৮:৫৫:৫৯
আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ, বদলাল তালিকাভুক্তির নিয়ম

পুঁজিবাজারে প্রবেশের জন্য প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর ওপর নির্ভর করতে হবে না সব কোম্পানিকে। বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করেই সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ আবারও চালু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় সরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ নির্দিষ্ট আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক যোগ্যতা থাকা কোম্পানিগুলোকে এই সুযোগের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ার বিক্রির ন্যূনতম পরিমাণ, মূল্য নির্ধারণ, পরিচালকদের মালিকানা এবং শেয়ার কেনাবেচার ওপরও শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

রোববার এ বিষয়ে সংশোধিত সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বিএসইসি। নতুন নিয়মে কোন প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থায় পুঁজিবাজারে আসতে পারবে, সে যোগ্যতার পাশাপাশি তালিকাভুক্তির পর শেয়ার ধারণ ও বিক্রির সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

কোন যোগ্যতায় সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে কোম্পানি

সংশোধিত বিধিমালায় সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ কেবল একটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। মালিকানার ধরন, সম্পদের পরিমাণ, বার্ষিক ব্যবসা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বীকৃতির ভিত্তিতে কয়েকটি শ্রেণির কোম্পানিকে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি এবং যেসব কোম্পানির অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা সরকারের।

সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানা রয়েছে এমন কোম্পানি, যেখানে সরকারের মালিকানাধীন অংশ পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ।

শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি অথবা বিদেশিদের মালিকানায় অন্তত ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান।

সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুসারে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা নিট সম্পদমূল্যের তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি।

বার্ষিক টার্নওভার অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা—এমন কোম্পানি।

কমিশনে নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি এবং ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি।

বিএসইসি কর্তৃক যোগ্য ঘোষণা করা কোম্পানি।

অর্থাৎ, শুধু মালিকানার ধরন নয়, নির্দিষ্ট আর্থিক মানদণ্ড পূরণকারী প্রতিষ্ঠানও সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পেতে পারে।

পাঁচ বছরের ব্যবসা ও মুনাফার শর্ত

কোনো কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির যোগ্য হলেই সঙ্গে সঙ্গে শেয়ারবাজারে আসতে পারবে না। সংশোধিত বিধিমালায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মেয়াদ ও আর্থিক ফলাফলের জন্যও শর্ত রাখা হয়েছে।

এ ব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত হতে কোম্পানির অন্তত পাঁচ বছরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম থাকতে হবে। পাশাপাশি আগের দুই অর্থবছরেই মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রমের নগদ প্রবাহও ইতিবাচক থাকা বাধ্যতামূলক।

এই শর্তগুলো পূরণকারী কোম্পানি তাদের বিদ্যমান শেয়ারধারীদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। ফলে নতুন করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে শেয়ার ছাড়ার পরিবর্তে বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির পথ ব্যবহার করা যাবে।

১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি, দামে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ ছাড়

সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির মোট শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ বিক্রির জন্য ছাড়তে হবে। তবে কত দামে এসব শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া যাবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিয়েছে কমিশন।

শেয়ারের সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে রেফারেন্স মূল্যের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ কম রেখে।

রেফারেন্স মূল্য হলো কোনো শেয়ারের দাম নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত মূল্য। সরাসরি তালিকাভুক্তির সময় এই মূল্য থেকে নির্ধারিত ছাড় বাদ দিয়ে সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত বিক্রয়মূল্য হিসাব করা হবে।

ধরা যাক, একটি শেয়ারের রেফারেন্স মূল্য ১০০ টাকা। সে ক্ষেত্রে ওই শেয়ারের সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত বিক্রয়মূল্য হবে ৭৫ টাকা।

তালিকাভুক্তির পরও মালিকানায় থাকতে হবে নির্দিষ্ট অংশ

সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি হলেও কোম্পানির স্পনসর ও পরিচালকদের সম্মিলিত মালিকানা নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামানো যাবে না। সংশোধিত নিয়মে তালিকাভুক্তির পর তাঁদের হাতে কোম্পানির অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

অন্যদিকে, তালিকাভুক্তির জন্য বিক্রির উদ্দেশ্যে নির্ধারিত শেয়ারের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কিনতে পারবেন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। অর্থাৎ, একজন বিনিয়োগকারী এককভাবে ওই শেয়ারের ১ শতাংশের বেশি কিনতে পারবেন না।

অফারদাতাদের শেয়ার কেনা ও বিক্রিতে সময়সীমা

সরাসরি তালিকাভুক্তির পর অফারদাতাদের শেয়ার লেনদেনের ওপরও বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। প্রথম লেনদেনের দিন থেকে পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত অফারদাতা কোম্পানিটির কোনো শেয়ার কিনতে পারবেন না।

শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা সীমা। একটি পূর্ণ অর্থবছর শেষ হওয়ার পর প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অফারদাতারা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রি করতে পারবেন না।

অর্থাৎ, তালিকাভুক্তির পরপরই অফারদাতাদের অবাধে শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ থাকছে না; নির্ধারিত সময় ও সীমা অনুসরণ করতে হবে।

২০০৬ সালে চালু ব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত হয়েছে ১০ প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশে সরাসরি তালিকাভুক্তির পদ্ধতি চালু হয় ২০০৬ সালে। এ ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে ডেসকো, পাওয়ার গ্রিড, যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও তিতাস গ্যাস।

বেসরকারি পাঁচ প্রতিষ্ঠান হলো শাইনপুকুর সিরামিকস, এসিআই ফর্মুলেশনস, নাভানা সিএনজি, ওশান কনটেইনারস ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানি।

২০০৯ সালের সিদ্ধান্তে সীমিত হয় তালিকাভুক্তির সুযোগ

সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান শেয়ার ছাড়তে পারবে, সে বিষয়ে ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর একটি সিদ্ধান্ত নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়, এ পদ্ধতিতে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো শেয়ার ছাড়তে পারবে।

তবে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হওয়ার আগে আবেদন করেছিল ওশান কনটেইনারস ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানি। এ কারণে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠান দুটিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া হয়।

এরপর থেকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার সংশোধিত বিধিমালার মাধ্যমে সেই পরিসর আবার বাড়ানো হয়েছে। নতুন নিয়মে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শ্রেণির কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. আইপিও ছাড়াই কি কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে?

হ্যাঁ। সংশোধিত সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করলে কোম্পানি বিদ্যমান শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হতে পারবে।

২. সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানির কত বছরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম থাকতে হবে?

কোম্পানির অন্তত পাঁচ বছরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম থাকতে হবে। এ ছাড়া গত দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা এবং সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ থাকতে হবে।

৩. সরাসরি তালিকাভুক্তির সময় কত শতাংশ শেয়ার বিক্রি করতে হবে?

কোম্পানির অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির জন্য ছাড়তে হবে।

৪. সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে শেয়ারের সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য কত হবে?

রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কম হবে সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত বিক্রয়মূল্য। রেফারেন্স মূল্য ১০০ টাকা হলে সর্বনিম্ন প্রস্তাবিত বিক্রয়মূল্য হবে ৭৫ টাকা।

৫. তালিকাভুক্তির পর স্পনসর ও পরিচালকদের কত শতাংশ শেয়ার রাখতে হবে?

স্পনসর ও পরিচালকদের সম্মিলিত মালিকানায় কোম্পানির অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: