ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

পুরনো জমির মালিক কে ছিলেন? জানুন তথ্য বের করার উপায়

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১২:০১:৩৭
পুরনো জমির মালিক কে ছিলেন? জানুন তথ্য বের করার উপায়

জমির বর্তমান মালিকের নাম জানা থাকলেও আগের মালিক কে ছিলেন, জমিটি কতবার হাতবদল হয়েছে কিংবা মূল মালিকের কাছ থেকে বর্তমান মালিক কীভাবে জমি পেয়েছেন—এসব তথ্য জানা সব সময় সহজ নয়। তবে বাংলাদেশের সরকারি ভূমি রেকর্ডের অনলাইন সেবা, পুরোনো খতিয়ান, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত দলিল এবং নামজারির নথি যাচাই করে জমির মালিকানা পরিবর্তনের ইতিহাস খুঁজে বের করা সম্ভব। এ জন্য প্রথমেই জমির মৌজা, দাগ নম্বর ও খতিয়ানের তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি।

বিশেষ করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি, পুরোনো জমি কেনাবেচা কিংবা জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে আগের মালিকের পরিচয় জানা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অনলাইনে বর্তমান খতিয়ান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের রেকর্ড ও নিবন্ধিত দলিল মিলিয়ে যাচাই করলে ভুলের আশঙ্কা কমে।

পুরনো জমির মালিকের তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে?

পুরনো জমির মালিকের পরিচয় জানতে মূলত চার ধরনের নথি কাজে আসে। এগুলো হলো বিভিন্ন জরিপের খতিয়ান, নিবন্ধিত দলিল, নামজারির নথি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমি অফিসে সংরক্ষিত পুরোনো রেকর্ড।

জমির অবস্থান, জরিপের সময়কাল এবং মালিকানা পরিবর্তনের ধরন অনুযায়ী একেকটি নথিতে আলাদা তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাই একটি নথির ওপর নির্ভর না করে একাধিক নথি মিলিয়ে দেখা ভালো।

১. অনলাইনে পুরোনো খতিয়ান খুঁজুন

পুরনো জমির মালিকের নাম খোঁজার প্রথম ধাপ হতে পারে সরকারি ভূমি রেকর্ডের অনলাইন সেবা। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অনলাইন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট এলাকার খতিয়ান এবং দাগসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের সুবিধা রয়েছে।

এ জন্য ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন:

[https://dlrms.land.gov.bd/](https://dlrms.land.gov.bd/)

এরপর সংশ্লিষ্ট বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা থানা, খতিয়ানের ধরন এবং মৌজার তথ্য নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন। খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি দিয়ে খোঁজা যায়। আবার সেবাটিতে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান সুবিধা থাকলে দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়েও রেকর্ড খুঁজে দেখা সম্ভব।

পুরনো মালিকের তথ্য পেতে শুধু সর্বশেষ রেকর্ড না দেখে জমিটির আগের জরিপের খতিয়ানও খুঁজতে হবে। যেমন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় পাওয়া গেলে সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস জরিপের খতিয়ান তুলনা করা যেতে পারে।

তবে সব এলাকার সব পুরোনো রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অনলাইনে তথ্য না মিললে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা রেকর্ড সংরক্ষণকারী দপ্তরে যোগাযোগ করতে হবে।

২. সাবেক দাগ ও হাল দাগের নম্বর মিলিয়ে দেখুন

পুরনো জমির তথ্য অনুসন্ধানে দাগ নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে নতুন জরিপ হলে একই জমির দাগ নম্বর পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে বর্তমান দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করেও পুরোনো রেকর্ড খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।

আরও পড়ুন:

পুরনো জমির মালিক কে ছিলেন? জানুন তথ্য বের করার উপায়

দলিল ও খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা? সঠিকটি জানবেন যেভাবে

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে করবেন কীভাবে?

এ ক্ষেত্রে সাবেক দাগ ও হাল দাগের নম্বরের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মৌজার মানচিত্র, পুরোনো খতিয়ান এবং নতুন জরিপের রেকর্ড মিলিয়ে জমিটি শনাক্ত করা যায়।

অনুসন্ধানের জন্য সাধারণত যেসব তথ্য কাজে লাগে:

- বিভাগ, জেলা ও উপজেলা বা থানা

- মৌজার নাম এবং সম্ভব হলে জেএল নম্বর

- বর্তমান দাগ নম্বর

- সাবেক দাগ নম্বর

- পুরোনো বা বর্তমান খতিয়ান নম্বর

- জমির আনুমানিক পরিমাণ ও অবস্থান

এসব তথ্য একসঙ্গে থাকলে একই জমির বিভিন্ন সময়ের রেকর্ড শনাক্ত করা সহজ হয়। বিশেষ করে পুরোনো জমির মালিকের নাম খুঁজতে সাবেক দাগ নম্বর অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে।

৩. সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পুরোনো দলিলের নকল সংগ্রহ করুন

জমিটি আগে কার কাছ থেকে কার কাছে হস্তান্তর হয়েছে, তা জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো নিবন্ধিত দলিল। জমি বিক্রি, দান বা অন্য কোনো নিবন্ধিত হস্তান্তরের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট দলিলের তথ্য থেকে আগের মালিক ও হস্তান্তরের বিবরণ পাওয়া যেতে পারে।

এ জন্য জমিটি যে এলাকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছিল, সেই অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। দলিল নম্বর, নিবন্ধনের সাল, দলিলদাতা ও গ্রহীতার নাম এবং জমির মৌজা ও দাগ নম্বর জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়।

দলিল নম্বর বা সাল জানা না থাকলে নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্ধারিত তল্লাশ ও নকলের আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অফিসে খোঁজ নিতে পারেন। প্রয়োজনীয় তথ্য ও নিয়ম অনুসারে পুরোনো দলিলের রেকর্ড তল্লাশ এবং নকল সংগ্রহের আবেদন করা যায়।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট:

[https://rd.gov.bd/](https://rd.gov.bd/)

মনে রাখতে হবে, পুরোনো দলিলের নকল পাওয়া যাবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের প্রাপ্যতা, সংরক্ষণ এবং অনুসন্ধানের তথ্যের ওপর নির্ভর করে। সব ক্ষেত্রে শুধু জমির বর্তমান মালিকের নাম জানিয়ে পুরোনো দলিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

৪. ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিসে পুরোনো রেকর্ড যাচাই করুন

অনলাইনে পুরোনো খতিয়ান না পাওয়া গেলে অথবা রেকর্ডের তথ্য অস্পষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। জমির ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসনের রেকর্ড রুম থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে জমির মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জানা থাকলে আগের মালিকের নাম উল্লেখ করুন। পুরোনো জরিপের খতিয়ান, নামজারি-সংক্রান্ত নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড কোথায় সংরক্ষিত আছে, তা জানতে চান।

তবে সব ধরনের পুরোনো নথি একই অফিসে থাকে না। কোন রেকর্ড কোথায় পাওয়া যাবে, তা সংশ্লিষ্ট জমি ও নথির ধরন অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।

৫. নামজারির নথি দেখে মালিকানা পরিবর্তনের সূত্র খুঁজুন

জমি কেনাবেচা বা উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পরিবর্তনের পর নামজারি করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার নথি থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

নামজারির নথিতে আবেদনকারী, পূর্ববর্তী রেকর্ড, জমির দাগ ও খতিয়ান এবং মালিকানা পরিবর্তনের ভিত্তি সম্পর্কে তথ্য থাকতে পারে। তবে নথির ধরন ও সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী বিবরণ ভিন্ন হতে পারে।

জমিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে ওয়ারিশ-সংক্রান্ত কাগজপত্র, বণ্টননামা বা প্রাসঙ্গিক দলিলও যাচাই করা প্রয়োজন হতে পারে। আবার বিক্রির মাধ্যমে জমি হস্তান্তর হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত দলিলের সঙ্গে নামজারির তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।

কেবল নামজারি হয়েছে বলেই মালিকানার সব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে মূল দলিলসহ সংশ্লিষ্ট নথি আইনগতভাবে যাচাই করা জরুরি।

পুরনো জমির মালিকের তথ্য বের করার সহজ পদ্ধতি

পুরো প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে এভাবে অনুসরণ করতে পারেন:

প্রথমে জমির মৌজা, দাগ নম্বর ও খতিয়ানের তথ্য সংগ্রহ করুন। এরপর সরকারি অনলাইন ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থায় বর্তমান ও পুরোনো খতিয়ান খুঁজুন। সাবেক ও হাল দাগের নম্বর মিলিয়ে একই জমি শনাক্ত করুন। তারপর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত দলিলের তথ্য অনুসন্ধান করুন এবং প্রয়োজনে নামজারির নথি ও ভূমি অফিসের রেকর্ড যাচাই করুন।

সবশেষে বিভিন্ন নথিতে পাওয়া নাম, জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, মালিকানার অংশ এবং হস্তান্তরের তারিখ মিলিয়ে দেখুন। কোনো তথ্যের মধ্যে অমিল থাকলে সেটি উপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করুন।

পুরনো জমির মালিক খুঁজতে গিয়ে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

জমি কেনার আগে বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পুরোনো মালিকের তথ্য খুঁজলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

প্রথমত, একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন। তাই শুধু নাম নয়, পিতার নাম, ঠিকানা, মৌজা, দাগ ও খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে পরিচয় যাচাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পুরোনো খতিয়ানে কারও নাম থাকা মানেই তিনি বর্তমানে জমিটির মালিক—এমন নয়। পরবর্তী সময়ে বিক্রি, দান, উত্তরাধিকার, বণ্টন বা অন্য কোনো কারণে মালিকানা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, দলিলের তথ্য ও খতিয়ানের মধ্যে অমিল থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, মালিকানার অংশ এবং জমির অবস্থানও যাচাই করা জরুরি।

চতুর্থত, জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মূল দলিল বা যথাযথ নকল, মালিকানার ধারাবাহিকতা, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য নথি পরীক্ষা করুন। প্রয়োজন হলে ভূমি আইনজীবীর সহায়তা নিন।

সবশেষে, অনলাইনে পাওয়া তথ্যকে প্রাথমিক অনুসন্ধানের উপায় হিসেবে ব্যবহার করুন। মালিকানা নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ, জালিয়াতির সন্দেহ বা আদালত-সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট মূল নথি যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সঠিকভাবে পুরোনো খতিয়ান, নিবন্ধিত দলিল ও নামজারির নথি মিলিয়ে দেখলে জমির আগের মালিক কে ছিলেন এবং কীভাবে জমিটির মালিকানা পরিবর্তিত হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা অনেক সহজ হয়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. শুধু দাগ নম্বর দিয়ে কি পুরনো জমির মালিকের নাম বের করা যায়?

কিছু ক্ষেত্রে যায়। দাগ নম্বরের সঙ্গে জেলা, উপজেলা, মৌজা ও জরিপের ধরন জানা থাকলে সরকারি ভূমি রেকর্ডে অনুসন্ধান করা যায়। পুরোনো রেকর্ড না পাওয়া গেলে সাবেক দাগ ও সংশ্লিষ্ট খতিয়ান খুঁজতে হবে।

২. অনলাইনে কি পুরনো জমির দলিল পাওয়া যায়?

সব পুরোনো দলিল অনলাইনে পাওয়া যায় না। নিবন্ধিত দলিলের তথ্য অনুসন্ধান বা নকল সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করতে হতে পারে।

৩. পুরোনো খতিয়ানে যার নাম আছে, তিনিই কি জমির প্রকৃত মালিক?

সব ক্ষেত্রে নয়। খতিয়ান নির্দিষ্ট জরিপ বা রেকর্ডের সময়কার তথ্য তুলে ধরে। পরবর্তী দলিল, উত্তরাধিকার, বণ্টন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করে মালিকানা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

৪. পুরোনো জমির মালিকের নাম খুঁজতে কী কী তথ্য প্রয়োজন?

জেলা, উপজেলা, মৌজার নাম, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং সম্ভব হলে সাবেক দাগ নম্বর কাজে লাগে। পুরোনো মালিকের নাম বা দলিল নম্বর জানা থাকলেও অনুসন্ধান সহজ হয়।

৫. অনলাইনে জমির রেকর্ড না পাওয়া গেলে কী করবেন?

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা উপজেলা ভূমি অফিস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করুন। নিবন্ধিত দলিলের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ