ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে নেই? জমির কী হবে জানুন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১২:১৮:০৩
সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে নেই? জমির কী হবে জানুন

জমির খতিয়ানে কয়েকজন ওয়ারিশের নাম রয়েছে, কিন্তু অন্য উত্তরাধিকারীদের নাম নেই—এমন পরিস্থিতিতে জমিটির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর জমি নিজেদের নামে নামজারি করার সময় কোনো ভাই, বোন বা অন্য বৈধ ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে ভবিষ্যতে জমি ভাগাভাগি, বিক্রি কিংবা মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে খতিয়ানে নাম না থাকলেই কোনো বৈধ ওয়ারিশের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তাঁর ওপর প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুসারে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়। অন্যদিকে জমির রেকর্ডে নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা নামজারি করা হলো ভূমি প্রশাসনের একটি প্রক্রিয়া। তাই কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে কেন বাদ পড়েছে, জমিটি কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে এবং প্রত্যেকের আইনগত অংশ কত—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।

সব ওয়ারিশের নাম না থাকলে জমির কী হবে, বাদ পড়া ব্যক্তি কীভাবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন এবং জমি বিক্রির ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে, তা জানা প্রয়োজন।

খতিয়ানে নাম না থাকলে কি ওয়ারিশের জমির অধিকার হারিয়ে যায়?

সাধারণভাবে, শুধু খতিয়ানে নাম না থাকার কারণে কোনো বৈধ ওয়ারিশের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায় না। তবে তিনি আদৌ ওয়ারিশ কি না এবং সম্পত্তিতে তাঁর কতটুকু অংশ রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার আইন ও নথির ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া জমিতে আইন অনুযায়ী একাধিক ওয়ারিশের অধিকার সৃষ্টি হলো। পরে তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের নামে নামজারি করা হলেও অন্য একজনের নাম বাদ পড়ল। এ অবস্থায় বাদ পড়া ব্যক্তির অধিকার শুধু নামজারি না হওয়ার কারণে শেষ হয়ে যায় না। তিনি প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নিজের প্রাপ্য অংশ দাবি করতে পারেন।

তবে প্রত্যেক আত্মীয়ই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তরাধিকারী হবেন, তা নয়। কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন, তা নির্ভর করে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, প্রযোজ্য ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার আইন, জীবিত উত্তরাধিকারীদের পরিচয় এবং সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থার ওপর।

সব ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে বা অসম্পূর্ণ থাকলে কীভাবে নামজারি করবেন?

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করার সময় সব বৈধ ওয়ারিশের তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ওয়ারিশদের যৌথ নামজারি করার সুযোগ রয়েছে। এতে প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ উল্লেখ করে একই খতিয়ানে তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করে আবেদন করতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির আগের খতিয়ান, জমির দলিল, পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি জমা দিতে হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সব ওয়ারিশের যৌথ নামজারি এবং জমি ভাগ করে প্রত্যেকের পৃথক নামে খতিয়ান তৈরি করা এক বিষয় নয়। জমি নির্দিষ্ট অংশে ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে আইন অনুযায়ী বণ্টন ও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতে পারে।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩বি ধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পত্তি আপসের মাধ্যমে বণ্টন, বণ্টননামা প্রস্তুত ও নিবন্ধন এবং সেই অনুযায়ী খতিয়ান সংশোধনের বিধান রয়েছে।

কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে কী করবেন?

জমির খতিয়ান বা নামজারিতে নিজের নাম নেই—এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই জমির আগের ও বর্তমান রেকর্ড সংগ্রহ করা উচিত। এরপর মৃত মালিকের পরিচয়, ওয়ারিশ সনদ এবং অন্য উত্তরাধিকারীদের নাম যাচাই করে দেখতে হবে, কী কারণে নাম বাদ পড়েছে।

সমস্যা সমাধানে সাধারণত নিচের পদক্ষেপগুলো কাজে আসতে পারে।

প্রথমত, মৃত ব্যক্তির সর্বশেষ খতিয়ান, দলিল ও জমির দাগ নম্বর সংগ্রহ করুন। এতে কোন সম্পত্তি নিয়ে দাবি করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট হবে।

আরও পড়ুন:

পুরনো জমির মালিক কে ছিলেন? জানুন তথ্য বের করার উপায়

দলিল ও খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা? সঠিকটি জানবেন যেভাবে

অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে করবেন কীভাবে?

দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করে সব বৈধ উত্তরাধিকারীর পরিচয় যাচাই করুন। প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী কার কতটুকু অংশ রয়েছে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, নামজারির আবেদন বা পূর্ববর্তী আদেশের কপি সংগ্রহ করুন। এতে কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়ার কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

চতুর্থত, প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে নামজারি বা রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করুন। আবেদন নিয়ে আপত্তি বা বিরোধ থাকলে কর্তৃপক্ষের শুনানি ও সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

পঞ্চমত, মালিকানা বা উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ জটিল হলে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নিন। পরিস্থিতি অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হতে পারে।

সব ক্ষেত্রে একই ধরনের আবেদন যথেষ্ট হবে না। ভুল তথ্য সংশোধন, বাদ পড়া ওয়ারিশের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আইনগত পথ এক নাও হতে পারে।

কয়েকজন ওয়ারিশের নামে জমি থাকলে তাঁরা কি পুরো জমি বিক্রি করতে পারবেন?

এটি নির্ভর করে তাঁদের মালিকানার পরিমাণ, জমির বণ্টন এবং অন্য ওয়ারিশদের অধিকার কী অবস্থায় রয়েছে, তার ওপর।

কয়েকজন ওয়ারিশের নামে খতিয়ান তৈরি হয়েছে বলেই তাঁরা অন্য বৈধ ওয়ারিশদের অংশসহ পুরো জমির একক মালিক হয়ে যান না। সাধারণভাবে, কোনো সহমালিক নিজের আইনগত অংশ হস্তান্তর করতে পারলেও অন্য সহমালিকের অংশ তাঁর সম্মতি বা যথাযথ আইনগত ভিত্তি ছাড়া হস্তান্তর করতে পারেন না।

আবার জমির বণ্টন সম্পন্ন হয়েছে কি না, কোনো নিবন্ধিত বণ্টননামা রয়েছে কি না, আদালতের কোনো আদেশ আছে কি না এবং দলিলের তফসিলে কী উল্লেখ রয়েছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

তাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি কেনা বা বিক্রির আগে শুধু নামজারি খতিয়ান দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা, মূল দলিল, ওয়ারিশদের প্রাপ্য অংশ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।

ওয়ারিশদের মধ্যে বিরোধ হলে কীভাবে সমাধান হবে?

সব ওয়ারিশের মধ্যে জমি বণ্টন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। সবাই একমত হলে আইনসম্মত বণ্টননামা তৈরি ও নিবন্ধনের মাধ্যমে জমি ভাগ করার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

কিন্তু কোনো ওয়ারিশ নিজের প্রাপ্য অংশ অস্বীকার করা, জমি এককভাবে দখল করা বা অন্যদের অধিকার অস্বীকার করার অভিযোগ তুললে বিষয়টি জটিল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জমির দলিল, খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদ ও অন্যান্য প্রমাণ নিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পরিস্থিতি অনুযায়ী বাটোয়ারা মামলা, স্বত্ব ঘোষণার মামলা অথবা অন্য উপযুক্ত আইনগত প্রতিকার প্রয়োজন হতে পারে। কোন প্রতিকার প্রযোজ্য হবে, তা বিরোধের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।

এ ধরনের বিরোধে নিজেরা জোর করে জমি দখল করা বা অন্য ওয়ারিশের অধিকার উপেক্ষা করে জমি বিক্রি করার চেষ্টা করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

জমির ওয়ারিশসংক্রান্ত সমস্যা এড়াতে যা মনে রাখবেন

উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়ার পর সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয় ও প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করুন। নামজারির সময় প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে দিন এবং আবেদন ও আদেশের কপি সংরক্ষণ করুন। জমি ভাগ করলে আইনসম্মত বণ্টননামা ও নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করুন।

মনে রাখতে হবে, খতিয়ান জমির রেকর্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়, কিন্তু একে একমাত্র ও চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। উত্তরাধিকার, দলিল, বণ্টন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি একসঙ্গে যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

সব ওয়ারিশের নাম না থাকলে জমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারের হয়ে যায় না কিংবা নাম থাকা ব্যক্তিরাই পুরো জমির মালিক হয়ে যান না। জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন, মালিকানার প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের ভিত্তিতে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. সব ওয়ারিশের নাম খতিয়ানে না থাকলে কি বাদ পড়া ওয়ারিশ জমি পাবেন?

প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী তিনি বৈধ ওয়ারিশ হলে শুধু খতিয়ানে নাম না থাকার কারণে তাঁর অধিকার শেষ হয় না। তবে তাঁর প্রাপ্য অংশ ও দাবি সংশ্লিষ্ট নথি এবং আইন অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।

২. একজন ওয়ারিশ কি অন্যদের বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারি করতে পারবেন?

শুধু নিজের নামে নামজারি করলেই অন্য বৈধ ওয়ারিশদের অধিকার বিলুপ্ত হয় না। নামজারির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করে আইনগত প্রতিকার নিতে হতে পারে।

৩. সব ওয়ারিশের নামে কি একসঙ্গে নামজারি করা যায়?

হ্যাঁ। প্রয়োজনীয় ওয়ারিশ সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র দিয়ে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে যৌথ নামজারির আবেদন করা যায়। জমি আলাদা ভাগে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে বণ্টনসংক্রান্ত অতিরিক্ত প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হতে পারে।

৪. ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে কোথায় আবেদন করতে হবে?

নামজারি বা রেকর্ডের সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে প্রযোজ্য সংশোধন বা নামজারির আবেদন করতে পারেন। জটিল মালিকানা বিরোধ হলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৫. সব ওয়ারিশের সম্মতি ছাড়া কি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করা যায়?

কোনো সহমালিক সাধারণভাবে নিজের আইনগত অংশ হস্তান্তর করতে পারেন, তবে অন্যদের অংশ নিজের বলে বিক্রি করতে পারেন না। জমির অবস্থা, বণ্টন ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ