ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

জমির নামজারি মঞ্জুর হয়েছে? ঘরে বসেই জেনে নিন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১১:১৪:২৩
জমির নামজারি মঞ্জুর হয়েছে? ঘরে বসেই জেনে নিন

জমি কেনার পর, উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়ার পর কিংবা বৈধভাবে জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর নামজারি করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নামজারির মাধ্যমে সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম ও জমির বিবরণ হালনাগাদ করা হয়। বাংলাদেশে অনলাইনে ই-নামজারি আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা দেখা যায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পোর্টালে। আবেদন নম্বর ও প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য হাতে থাকলে ঘরে বসেই এই যাচাই করা সম্ভব।

তবে আবেদন জমা দেওয়া, আবেদন মঞ্জুর হওয়া এবং চূড়ান্ত নামজারি খতিয়ান পাওয়া—এগুলো আলাদা ধাপ। তাই জমির নামজারি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আবেদনের স্ট্যাটাসের পাশাপাশি চূড়ান্ত খতিয়ান ও ডিসিআর (DCR) সংগ্রহের বিষয়টিও যাচাই করা উচিত।

অনলাইনে জমির নামজারি হয়েছে কি না দেখবেন যেভাবে

জমির নামজারির আবেদন করা থাকলে প্রথমে আবেদনটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করুন। এ জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে।

ধাপ ১: সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে প্রবেশ করুন। সেখানে আবেদনের অবস্থা যাচাই বা ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা পাওয়া যায়।

ধাপ ২: আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা দেখার অপশন নির্বাচন করুন

পোর্টালে থাকা আবেদন ট্র্যাকিং বা সর্বশেষ অবস্থা দেখার অপশনে প্রবেশ করুন। সেখানে নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।

ধাপ ৩: আবেদন নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিন

নামজারির আবেদন করার পর যে আবেদন নম্বর বা অ্যাপ্লিকেশন আইডি পাওয়া গিয়েছিল, সেটি লিখুন। পোর্টালে চাওয়া হলে আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, বিভাগ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যও দিন। ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই সম্পন্ন করুন।

ধাপ ৪: আবেদনের স্ট্যাটাস দেখুন

সঠিক তথ্য দেওয়ার পর অনুসন্ধান করলে আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা দেখা যাবে। আবেদনটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, মঞ্জুর হয়েছে নাকি নামঞ্জুর হয়েছে—সেই তথ্য যাচাই করুন।

ধাপ ৫: নামজারি খতিয়ান চূড়ান্ত হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন

আবেদন মঞ্জুর দেখালেই প্রক্রিয়ার সব কাজ শেষ হয়েছে ধরে নেবেন না। চূড়ান্ত নামজারি খতিয়ান প্রস্তুত হয়েছে কি না, নির্ধারিত ডিসিআর ফি পরিশোধ করা হয়েছে কি না এবং খতিয়ান ডাউনলোডের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।

সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত ধাপ ও তথ্যের ঘর সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন ট্র্যাকিংয়ের সময় ওয়েবসাইটে দেখানো বর্তমান নির্দেশনা অনুসরণ করাই ভালো।

নামজারির আবেদনের অবস্থা বুঝবেন কীভাবে?

অনলাইনে আবেদনের স্ট্যাটাস দেখার পর সেটির অর্থ বোঝা জরুরি। সাধারণভাবে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন।

আবেদন প্রক্রিয়াধীন: আবেদনটি এখনো যাচাই বা নিষ্পত্তির পর্যায়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন হলে পোর্টালে পরবর্তী নির্দেশনা দেখুন।

আবেদন মঞ্জুর: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নামজারির আবেদন অনুমোদন করেছেন। তবে চূড়ান্ত খতিয়ান প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটি আলাদাভাবে যাচাই করুন।

আবেদন নামঞ্জুর: আবেদনটি অনুমোদিত হয়নি। কেন নামঞ্জুর হয়েছে, তা পোর্টালে থাকা বিস্তারিত তথ্য, আদেশ বা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের মাধ্যমে জেনে নিন। কারণ বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

আরও পড়ুন:

জমি খুঁজে পাচ্ছেন না? দাগ নম্বর ও নকশা মিলিয়ে দেখুন

জমি দখল বা সীমানা নিয়ে বিরোধ হলে করণীয় কী?

খতিয়ান প্রস্তুত: নামজারি মঞ্জুর হওয়ার পর মিউটেশন খতিয়ান প্রস্তুত হলে আবেদনকারীকে পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য জানানো হতে পারে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ডিসিআর ফি পরিশোধ করে চূড়ান্ত খতিয়ান ও রসিদের কপি সংগ্রহ করা যায়।

নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর কীভাবে পাবেন?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, নামজারির আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর মিউটেশন খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়। খতিয়ান প্রস্তুত হলে আবেদনকারীকে মোবাইল বার্তার মাধ্যমে জানানো হতে পারে। এরপর প্রযোজ্য ডিসিআর ফি পরিশোধের সুযোগ পাওয়া যায়।

সরকারি ই-নামজারি নির্দেশিকায় অনলাইনে ডিসিআর ফি হিসেবে ১ হাজার ১০০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। তবে অর্থ পরিশোধের আগে নিজের আবেদনের জন্য পোর্টালে প্রদর্শিত বর্তমান ফি ও নির্দেশনা যাচাই করুন।

ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট পোর্টাল থেকে নামজারি খতিয়ান এবং ডিসিআরের কপি ডাউনলোড বা প্রিন্ট করা যায়। এগুলো সংরক্ষণ করে রাখা উচিত। ভবিষ্যতে ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়া, জমির রেকর্ড যাচাই কিংবা প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজে এসব নথি দরকার হতে পারে।

আবেদন নম্বর হারিয়ে গেলে কী করবেন?

নামজারির আবেদন নম্বর হারিয়ে গেলে প্রথমে আবেদন জমা দেওয়ার সময় পাওয়া SMS, রসিদ, আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি বা সংরক্ষিত নথি খুঁজে দেখুন। অনলাইনে আবেদন করার সময় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের বার্তাগুলোও যাচাই করতে পারেন।

তথ্য খুঁজে না পেলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। আবেদনকারীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জমির মৌজা, দাগ নম্বর এবং আবেদন করার আনুমানিক সময় জানাতে পারলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারেন। তবে এসব তথ্য দিলেই আবেদন নম্বর নিশ্চিতভাবে উদ্ধার করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

অনলাইনে নামজারির তথ্য না পেলে কী করবেন?

কখনো ভুল আবেদন নম্বর, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের অমিল বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে অনলাইনে আবেদনের তথ্য পাওয়া নাও যেতে পারে। এমন হলে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন—

আবেদন নম্বর ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে লিখেছেন কি না যাচাই করুন।

আবেদন করার সময় পাওয়া SMS বা রসিদ থেকে নম্বর মিলিয়ে নিন।

কিছু সময় পর আবার চেষ্টা করুন, বিশেষ করে ওয়েবসাইটে সাময়িক সমস্যা থাকলে।

প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।

ভূমিসেবা-সংক্রান্ত সহায়তার জন্য সরকারি ভূমিসেবা হটলাইন ১৬১২২ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।

অনলাইনে তথ্য দেখা যাচ্ছে না বলে নামজারির আবেদন অবশ্যই বাতিল হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের মাধ্যমে আবেদনের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।

নামজারি হয়েছে মানেই কি জমির মালিকানা পুরোপুরি নিশ্চিত?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নামজারি হলো জমি হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। নামজারি খতিয়ানে মালিকের নাম, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও প্রাপ্য অংশের মতো তথ্য থাকতে পারে।

তবে শুধু নামজারি হয়েছে বলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের অবসান হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া উচিত নয়। জমির মালিকানা যাচাইয়ের জন্য মূল দলিল, আগের খতিয়ান, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য নথিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। জমি কেনার আগে বা বিরোধ দেখা দিলে প্রয়োজনে ভূমি আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।

জমির নামজারি হয়েছে কি না জানার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে আবেদন ট্র্যাক করা। এ জন্য আবেদন নম্বর এবং পোর্টালে চাওয়া প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য হাতে রাখুন। আবেদন মঞ্জুর হয়েছে কি না দেখার পাশাপাশি চূড়ান্ত নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআরের কপি সংগ্রহের বিষয়টিও নিশ্চিত করুন। অনলাইনে তথ্য না পেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা সরকারি ভূমিসেবা হটলাইন ১৬১২২-এর সহায়তা নিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. জমির নামজারি হয়েছে কি না অনলাইনে কীভাবে দেখব?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে গিয়ে আবেদন ট্র্যাকিং অপশন নির্বাচন করুন। এরপর আবেদন নম্বর ও পোর্টালে চাওয়া প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করুন।

২. নামজারির আবেদন মঞ্জুর হলেই কি কাজ শেষ?

সব সময় নয়। আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর চূড়ান্ত নামজারি খতিয়ান প্রস্তুত এবং প্রযোজ্য ডিসিআর ফি পরিশোধের ধাপ বাকি থাকতে পারে। তাই চূড়ান্ত খতিয়ান সংগ্রহ হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।

৩. নামজারির আবেদন নম্বর হারিয়ে গেলে কী করব?

আবেদনের SMS, রসিদ বা সংরক্ষিত কপি খুঁজে দেখুন। না পেলে প্রয়োজনীয় পরিচয় ও জমির তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।

৪. নামজারির আবেদন নামঞ্জুর হলে কীভাবে কারণ জানব?

ই-নামজারি পোর্টালে আবেদনের বিস্তারিত অবস্থা ও আদেশ যাচাই করুন। তথ্য স্পষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে নামঞ্জুরের কারণ এবং পরবর্তী করণীয় জেনে নিন।

৫. নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর কোথা থেকে পাওয়া যায়?

আবেদন মঞ্জুর, খতিয়ান প্রস্তুত এবং প্রযোজ্য ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সরকারি ই-নামজারি পোর্টাল থেকে খতিয়ান ও ডিসিআরের কপি সংগ্রহ করা যায়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: