ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

জমির দলিল হারালে নকল তুলতে কত টাকা খরচ হবে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৫ ১১:৫৮:৫৪
জমির দলিল হারালে নকল তুলতে কত টাকা খরচ হবে?

জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে কিংবা জমির মালিকানা প্রমাণের জন্য পুরোনো দলিলের কপি প্রয়োজন হলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা যায়। তবে এই কপি তুলতে কত টাকা লাগবে, তা নির্ভর করে দলিলের পৃষ্ঠাসংখ্যা, প্রযোজ্য সরকারি ফি, নকলনবিশের পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য খরচের ওপর। ফলে এক পাতার দলিলের নকল আর ১০ বা ২০ পাতার দলিলের নকল তুলতে একই টাকা লাগে না।

বাংলাদেশের কয়েকটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত ফি তালিকা অনুযায়ী, বাংলায় লেখা প্রতি ৩০০ শব্দের এক পৃষ্ঠা বা তার অংশবিশেষের জন্য ২৪ টাকা নকল প্রস্তুতকরণ ফি এবং ৩৬ টাকা নকলনবিশের পারিশ্রমিক ধার্য রয়েছে। এর সঙ্গে আবেদনপত্রের কোর্ট ফি, প্রযোজ্য স্ট্যাম্প শুল্ক এবং জরুরি সেবার অতিরিক্ত ফি যোগ হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সর্বশেষ ফি তালিকা যাচাই করা জরুরি।

দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগে?

দলিলের নকল বা সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের খরচ কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভর করে। সরকারি অফিসের প্রকাশিত তালিকায় সাধারণত নকল প্রস্তুতকরণ ফি, নকলনবিশের পারিশ্রমিক এবং আবেদনপত্রের কোর্ট ফির উল্লেখ থাকে। কিছু ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প শুল্ক ও অন্যান্য প্রযোজ্য ফিও দিতে হয়।

প্রকাশিত একটি ফি তালিকায় বাংলায় লেখা প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠা বা তার অংশবিশেষের জন্য খরচের হিসাব এমন—

নকল প্রস্তুতকরণ ফি: প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা।

নকলনবিশের পারিশ্রমিক: প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ টাকা।

আবেদনপত্রের কোর্ট ফি: ২০ টাকা।

এই হিসাবে ১০ পৃষ্ঠার দলিলের নকল প্রস্তুতকরণ ফি হবে ২৪০ টাকা এবং নকলনবিশের পারিশ্রমিক হবে ৩৬০ টাকা। এর সঙ্গে ২০ টাকা কোর্ট ফি যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৬২০ টাকা।

তবে ৬২০ টাকা সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত খরচ নয়। এখানে স্ট্যাম্প শুল্ক, তল্লাশি বা পরিদর্শনের প্রযোজ্য ফি এবং জরুরি নকলের অতিরিক্ত খরচ ধরা হয়নি। এসব খাত প্রযোজ্য হলে মোট টাকা আরও বাড়তে পারে।

দলিলের নকলের খরচ কীভাবে হিসাব করবেন?

দলিলের পৃষ্ঠা যত বেশি হবে, নকল প্রস্তুত ও লেখার খরচও তত বাড়বে। নিচের হিসাবটি শুধু নকল প্রস্তুতকরণ ফি, নকলনবিশের পারিশ্রমিক ও ২০ টাকা কোর্ট ফি ধরে করা হয়েছে।

দলিলের পৃষ্ঠানকল প্রস্তুতকরণ ফিনকলনবিশের পারিশ্রমিককোর্ট ফিসহ মোট
১ পৃষ্ঠা ২৪ টাকা ৩৬ টাকা ৮০ টাকা
৫ পৃষ্ঠা ১২০ টাকা ১৮০ টাকা ৩২০ টাকা
১০ পৃষ্ঠা ২৪০ টাকা ৩৬০ টাকা ৬২০ টাকা
২০ পৃষ্ঠা ৪৮০ টাকা ৭২০ টাকা ১,২২০ টাকা

গুরুত্বপূর্ণ: এটি উদাহরণভিত্তিক হিসাব, চূড়ান্ত সরকারি বিল নয়। মূল দলিলের স্ট্যাম্প শুল্কের ভিত্তিতে নকলের স্ট্যাম্প ফি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য খরচ আলাদা হতে পারে। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট অফিসের হালনাগাদ ফি তালিকা অনুসারে অঙ্ক যাচাই করতে হবে।

জরুরি ভিত্তিতে দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগে?

সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্রুত নকল পেতে চাইলে জরুরি বা অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবার জন্য অতিরিক্ত ফি লাগতে পারে। কয়েকটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত তালিকায় অগ্রাধিকারভিত্তিক নকলের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা অথবা নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাসীমার বেশি হলে প্রতি অতিরিক্ত পৃষ্ঠার জন্য ১৫ টাকা হারে ফি দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে।

তবে জরুরি নকলের ফি ও সরবরাহের সময় সম্পর্কে সব অফিসের ওয়েবসাইটে একই তথ্য নেই। তাই দ্রুত কপি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়ে বর্তমান নিয়ম, অতিরিক্ত ফি এবং সম্ভাব্য সরবরাহের সময় জেনে নেওয়া উচিত।

দলিলের নকল কোথা থেকে তুলতে হবে?

সাধারণভাবে যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছিল, সেই অফিসের রেকর্ড থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের জন্য আবেদন করতে হয়। দলিলের তথ্য রেকর্ডে পাওয়া গেলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে নকল সরবরাহ করা হয়।

আবেদন করার আগে সম্ভব হলে নিচের তথ্যগুলো সংগ্রহ করুন—

দলিল নম্বর;

দলিল নিবন্ধনের সাল ও তারিখ;

ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম;

সংশ্লিষ্ট মৌজা ও জমির পরিচিতিমূলক তথ্য;

দলিলের ধরন এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য।

দলিল নম্বর বা সাল জানা থাকলে রেকর্ড খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। তবে পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে এসব তথ্য না থাকলে সূচিবহি তল্লাশি বা রেকর্ড যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

দলিলের নকল তুলতে আবেদন করবেন যেভাবে

দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের জন্য সাধারণত সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নির্ধারিত আবেদনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রথমে দলিলের তথ্য তল্লাশি ও রেকর্ড পরিদর্শনের আবেদন করা হয়। এরপর নকলের জন্য নির্ধারিত আবেদন জমা দিয়ে প্রযোজ্য ফি পরিশোধ করতে হয়।

আবেদনের সময় নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন—

প্রথম ধাপ: দলিলটি যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন হয়েছিল, সেই অফিস শনাক্ত করুন।

দ্বিতীয় ধাপ: দলিল নম্বর, নিবন্ধনের সাল, পক্ষগুলোর নাম ও জমির তথ্য সংগ্রহ করুন।

তৃতীয় ধাপ: সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে নকলের আবেদনপদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জেনে নিন। দলিলের তথ্য খুঁজে পেতে তল্লাশি বা পরিদর্শনের আবেদন লাগবে কি না, তা নিশ্চিত করুন।

চতুর্থ ধাপ: নির্ধারিত আবেদনপত্র পূরণ করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র জমা দিন।

পঞ্চম ধাপ: অফিসের নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে রসিদ সংগ্রহ করুন।

ষষ্ঠ ধাপ: নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষ হলে অফিস থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন।

প্রক্রিয়া ও সময় দলিলের বয়স, রেকর্ডের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অফিসের কাজের চাপের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই আবেদন করার সময় সম্ভাব্য সময়সীমা জেনে নেওয়া ভালো।

মূল দলিল হারিয়ে গেলে কি নকল কপি পাওয়া যায়?

মূল দলিল হারিয়ে গেলে নিবন্ধিত দলিলের রেকর্ড পাওয়া সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে মূল দলিল হাতে থাকা বাধ্যতামূলক—এমন নয়; তবে দলিলটি শনাক্ত করার মতো তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কপি সংগ্রহের পর সেটিতে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন ও সিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন। জমির মালিকানা, নামজারি, মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কাজে কপিটি ব্যবহার করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত শর্তও জেনে নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন:

জমি রেজিস্ট্রি করেই কি মূল দলিল পাওয়া যায়? জানুন সময়

জমির দাগ, খতিয়ান ও নকশা যাচাইয়ের সহজ নিয়ম

দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে

আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করলেই জমির মালিকানা বা জমির ওপর কোনো দায়-দেনার সম্পূর্ণ অবস্থা নিশ্চিত হয়ে যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও যাচাই করা উচিত।

সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে কি?

দলিলের নকল সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসের প্রকাশিত ফি তালিকা অনুসরণ করা উচিত। নকল প্রস্তুতকরণ ফি, নকলনবিশের পারিশ্রমিক, কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক এবং জরুরি সেবার ফি—যা প্রযোজ্য, তার হিসাব পরিষ্কারভাবে জেনে নিন।

কেউ নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ চাইলে তার কারণ ও হিসাব জানতে চান। সম্ভব হলে অফিসের সরকারি ফি তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নিন এবং প্রতিটি অর্থ পরিশোধের রসিদ সংগ্রহ করুন। নির্ধারিত ফির বাইরে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দেওয়া বাধ্যতামূলক—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

কোথায় ফি যাচাই করবেন?

দলিলের নকলের ফি সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নোটিশ বোর্ড, সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নাগরিক সনদ বা সেবা-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেখুন। বিভিন্ন সরকারি ওয়েবপেজে পুরোনো ও হালনাগাদ ফি তালিকার পার্থক্য থাকতে পারে। তাই অন্য জেলার অফিসের তালিকা দেখে নিজের এলাকার চূড়ান্ত খরচ ধরে নেবেন না।

উদাহরণ হিসেবে, সোনাতলা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত তালিকায় প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠার ভিত্তিতে নকল প্রস্তুতকরণ ফি ও নকলনবিশের পারিশ্রমিকের তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে, জুড়ী সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সেবা-সংক্রান্ত পাতায় নকলের আবেদন ও জরুরি সেবার ফি সম্পর্কে বিস্তারিত দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগবে তা নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো দলিলের পৃষ্ঠাসংখ্যা ও ধরন জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বর্তমান ফি হিসাব নেওয়া। এতে অপ্রত্যাশিত খরচ এড়ানো এবং নির্ধারিত সরকারি ফি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা সহজ হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: দলিলের নকল কপি তুলতে সর্বনিম্ন কত টাকা লাগে?

উত্তর: নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন মোট খরচ বলা কঠিন, কারণ পৃষ্ঠাসংখ্যা, প্রযোজ্য স্ট্যাম্প শুল্ক ও অন্যান্য ফির ওপর মোট খরচ নির্ভর করে। প্রকাশিত একটি ফি তালিকায় বাংলায় প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠার জন্য ২৪ টাকা নকল প্রস্তুতকরণ ফি, ৩৬ টাকা নকলনবিশের পারিশ্রমিক এবং ২০ টাকা কোর্ট ফির উল্লেখ রয়েছে।

প্রশ্ন ২: ১০ পৃষ্ঠার দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগবে?

উত্তর: প্রতি পৃষ্ঠায় ২৪ টাকা নকল প্রস্তুতকরণ ফি ও ৩৬ টাকা নকলনবিশের পারিশ্রমিক ধরে ১০ পৃষ্ঠার জন্য ৬০০ টাকা লাগে। এর সঙ্গে ২০ টাকা কোর্ট ফি যোগ করলে হয় ৬২০ টাকা। তবে স্ট্যাম্প শুল্ক ও অন্যান্য প্রযোজ্য ফি এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

প্রশ্ন ৩: মূল দলিল হারিয়ে গেলে কি নকল তোলা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, নিবন্ধিত দলিলের রেকর্ড শনাক্ত করা গেলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করা যায়।

প্রশ্ন ৪: জরুরি ভিত্তিতে দলিলের নকল পাওয়া যায় কি?

উত্তর: কিছু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে জরুরি বা অগ্রাধিকারভিত্তিক নকলের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ফি ও সরবরাহের সময় সংশ্লিষ্ট অফিসের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশ্ন ৫: দলিলের নকল তুলতে কোথায় আবেদন করতে হবে?

উত্তর: সাধারণত যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছিল, সেখানেই আবেদন করতে হয়। দলিল নম্বর, নিবন্ধনের সাল ও জমির তথ্য জানা থাকলে রেকর্ড শনাক্ত করতে সুবিধা হয়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: