ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

জন্মনিবন্ধন সংশোধন না করলে পাসপোর্ট করতে কী সমস্যা হবে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৬ ২০:১১:০৯
জন্মনিবন্ধন সংশোধন না করলে পাসপোর্ট করতে কী সমস্যা হবে?

জন্মনিবন্ধন সনদে নামের বানান, জন্মতারিখ কিংবা বাবা-মায়ের নাম ভুল থাকলে পাসপোর্ট তৈরির সময় সেই ভুলের প্রভাব পড়তে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) না থাকলে জন্মনিবন্ধনের তথ্যের ভিত্তিতে ই-পাসপোর্টের আবেদন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সনদের তথ্যের সঙ্গে আবেদনপত্র বা অন্যান্য সরকারি নথির অমিল থাকলে তথ্য যাচাই, সংশোধন কিংবা অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট আবেদনের সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আবেদনপত্র পূরণ করতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদের ইংরেজি সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী। তাই পাসপোর্টের আবেদন করার আগে জন্মনিবন্ধনের তথ্য ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে যাঁদের জন্মনিবন্ধনই পরিচয় ও জন্মতারিখের প্রধান প্রমাণ, তাঁদের ভুল তথ্য নিয়ে আবেদন না করাই ভালো।

জন্মনিবন্ধনে ভুল থাকলে পাসপোর্ট করতে কী কী সমস্যা হতে পারে?

জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংশোধন না করে পাসপোর্টের আবেদন করলে কয়েক ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই সমস্যা হবে, এমন নয়। ভুলের ধরন, বয়স, জাতীয় পরিচয়পত্রের উপস্থিতি এবং অন্যান্য নথির তথ্যের ওপর পরিস্থিতি নির্ভর করে।

১. নামের বানান নিয়ে জটিলতা

জন্মনিবন্ধনে নিজের নামের বানান এক রকম, অথচ শিক্ষাগত সনদ বা অন্য সরকারি নথিতে আরেক রকম হলে পরিচয় যাচাইয়ের সময় প্রশ্ন উঠতে পারে। বাংলা ও ইংরেজি নামের বানানে অসামঞ্জস্য থাকলেও আবেদনকারীর তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণে পাসপোর্টের আবেদন করার আগে নিজের নাম এবং ইংরেজি বানান সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

২. জন্মতারিখের অমিল

জন্মনিবন্ধনে উল্লেখ করা জন্মতারিখের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্য গ্রহণযোগ্য নথির জন্মতারিখ না মিললে আবেদন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। জন্মতারিখ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য হওয়ায় এ ধরনের ভুল অবহেলা করা ঠিক নয়।

বিশেষ করে বয়সের হিসাব, শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি কিংবা অন্যান্য পরিচয়পত্রে ভিন্ন জন্মতারিখ থাকলে আবেদন করার আগে কোন তথ্যটি সঠিক, তা প্রমাণসহ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

৩. বাবা-মায়ের নাম ভুল থাকলে

জন্মনিবন্ধনে বাবা বা মায়ের নামের বানান ভুল, নামের অংশ বাদ পড়া কিংবা অন্য নথির সঙ্গে অমিল থাকলেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। কারণ, পাসপোর্টের আবেদন ও যাচাইয়ের সময় বাবা-মায়ের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

এ ধরনের ভুল থাকলে জন্মনিবন্ধন এবং বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রাসঙ্গিক নথির তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।

৪. অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে

আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সঠিক তথ্যের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, আগের পাসপোর্ট বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সরকারি নথি চাওয়া হতে পারে। কোন কাগজপত্র প্রয়োজন হবে, তা সংশ্লিষ্ট ভুল এবং আবেদনকারীর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

ই-পাসপোর্টের সরকারি নির্দেশনায় নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান এবং বাবা-মায়ের নামের মতো তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নথি যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের পরিবর্তনে আবেদন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময়ও লাগতে পারে।

৫. পাসপোর্ট পেতে দেরি হতে পারে

সব তথ্য সঠিক থাকা সাপেক্ষে পাসপোর্ট আবেদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়। কিন্তু পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের অমিল থাকলে সংশোধন, নথি যাচাই কিংবা প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের কারণে নিষ্পত্তিতে বাড়তি সময় লাগতে পারে।

তাই বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি, চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় নথি আগেই যাচাই করে নেওয়া ভালো।

জন্মনিবন্ধনে ভুল থাকলেই কি পাসপোর্ট আবেদন বাতিল হবে?

না, জন্মনিবন্ধনে ভুল থাকলেই পাসপোর্টের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে—এমন সাধারণ নিয়ম ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ভুল তথ্য কী ধরনের, অন্য নথিতে সঠিক তথ্যের প্রমাণ আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ে কী পাওয়া যাচ্ছে, সেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ভুল তথ্য জেনেও আবেদনপত্রে অসংগত তথ্য দেওয়া উচিত নয়। পাসপোর্টের আবেদন ফরমে জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী তথ্য পূরণ করতে হয়। সঠিক তথ্যের প্রমাণ দিতে না পারলে আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলে কি জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা জরুরি?

এটি নির্ভর করে জন্মনিবন্ধনের ভুলটি কোথায় এবং কোন নথির ভিত্তিতে পাসপোর্টের আবেদন করা হচ্ছে তার ওপর।

ই-পাসপোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনপত্র পূরণ করতে হয় জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদের ইংরেজি সংস্করণ অনুযায়ী। প্রাপ্তবয়স্ক আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলে সেটির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, যাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধনের তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য সঠিক থাকলেও জন্মনিবন্ধনের ভুলকে সব ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ভবিষ্যতে অন্য সরকারি সেবা বা নথি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তথ্যের অমিল সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ভুলটি প্রকৃত হলে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া যুক্তিযুক্ত।

জন্মনিবন্ধনের ভুল কীভাবে সংশোধন করবেন?

জন্মনিবন্ধন সনদে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট জন্মনিবন্ধক কার্যালয়ে যোগাযোগ করে সংশোধনের আবেদন করতে হবে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ১৫ ধারায় নিবন্ধন বহি বা জন্মসনদে ভুল তথ্য থাকলে সংশোধনের জন্য নির্ধারিত ফিসহ আবেদন করার বিধান রয়েছে।

সংশোধনের ক্ষেত্রে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করা যেতে পারে—

প্রথম ধাপ: জন্মনিবন্ধন সনদে কোন তথ্য ভুল রয়েছে, তা চিহ্নিত করুন। নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম এবং ইংরেজি বানান ভালোভাবে যাচাই করুন।

দ্বিতীয় ধাপ: ভুল তথ্যের সঠিকতা প্রমাণ করে—এমন প্রাসঙ্গিক নথি প্রস্তুত করুন। ভুলের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র ভিন্ন হতে পারে।

তৃতীয় ধাপ: সংশ্লিষ্ট জন্মনিবন্ধক কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধনের আবেদন করুন। আবেদন অনুমোদিত হলে সংশোধিত সনদ সংগ্রহ করুন।

চতুর্থ ধাপ: সংশোধিত জন্মনিবন্ধনের ইংরেজি সংস্করণসহ প্রয়োজনীয় নথির তথ্য মিলিয়ে ই-পাসপোর্টের আবেদন করুন।

মনে রাখতে হবে, সংশোধনের আবেদন করলেই তা অনুমোদিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথি যাচাই করে আবেদন বিবেচনা করবে।

পাসপোর্টের আবেদন ইতিমধ্যে জমা দিলে কী করবেন?

অনলাইনে ই-পাসপোর্টের আবেদন জমা দেওয়ার পর কোনো তথ্য ভুল হয়েছে বুঝতে পারলে নিজে থেকে নতুন করে আরেকটি আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো।

ই-পাসপোর্টের সরকারি অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়ার পর তথ্য ভুল ধরা পড়লে আবেদনকারীর প্রিন্ট করা ‘Application Summary’ নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে। সঠিক তথ্যের প্রমাণ হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, আগের পাসপোর্ট (যদি থাকে) বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি সঙ্গে রাখতে হবে। যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।

তবে জন্মনিবন্ধনের মূল তথ্যই ভুল হলে শুধু পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে সেটি দেখানো যথেষ্ট নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সংশোধনের প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হতে পারে।

পাসপোর্ট করার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন

আবেদন জমা দেওয়ার আগে নিজের নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান, জন্মতারিখ, জন্মস্থান এবং বাবা-মায়ের নাম সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিন। জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলে সেটির তথ্যও যাচাই করুন। আগের পাসপোর্ট থাকলে নতুন আবেদনের তথ্যের সঙ্গে তার কোনো অমিল আছে কি না, সেটিও খেয়াল করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে তথ্য সঠিক তার পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রস্তুত রাখা। ভুল তথ্য গোপন করে বা অনুমাননির্ভর তথ্য দিয়ে আবেদন করলে পরবর্তী সময়ে সংশোধন ও যাচাইয়ের জটিলতা বাড়তে পারে।

শেষ কথা: জন্মনিবন্ধনে ভুল থাকলে পাসপোর্ট করা অসম্ভব—এমন নয়। তবে ভুল তথ্য রেখে আবেদন করলে বাড়তি যাচাই, নথি সংশোধন এবং সময়ক্ষেপণের ঝুঁকি থাকে। তাই পাসপোর্টের আবেদন করার আগেই জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্পন্ন করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. জন্মনিবন্ধনে নাম ভুল থাকলে কি পাসপোর্ট করা যাবে?

ভুল তথ্য থাকলে আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। আগে ভুলটি সংশোধন করে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে আবেদন করা ভালো।

২. জন্মনিবন্ধনে জন্মতারিখ ভুল থাকলে কী করতে হবে?

সংশ্লিষ্ট জন্মনিবন্ধক কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রসহ সংশোধনের আবেদন করতে হবে। সংশোধন সম্পন্ন হওয়ার পর পাসপোর্টের আবেদন করা উচিত।

৩. জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলে কি জন্মনিবন্ধনের ভুল সংশোধন করতে হবে?

পাসপোর্টের আবেদন জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী করা যেতে পারে। তবে জন্মনিবন্ধনে প্রকৃত ভুল থাকলে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়াতে সেটিও সংশোধন করা ভালো।

৪. পাসপোর্টের আবেদন জমা দেওয়ার পর ভুল ধরা পড়লে কী করবেন?

প্রিন্ট করা Application Summary এবং সঠিক তথ্যের প্রমাণপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তা সংশোধনের ব্যবস্থা জানাবেন।

৫. জন্মনিবন্ধন সংশোধন করতে কোথায় আবেদন করতে হয়?

যে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয়ের অধীনে জন্মনিবন্ধনটি করা হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ করে নির্ধারিত নিয়মে সংশোধনের আবেদন করতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: