ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

জমির পর্চা অনলাইনে কীভাবে বের করবেন? জেনে নিন নিয়ম

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১১:২২:৩৩
জমির পর্চা অনলাইনে কীভাবে বের করবেন? জেনে নিন নিয়ম

জমির পর্চা বা খতিয়ান বের করতে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে অনুসন্ধান করা যায়। জমির মালিকের নাম, দাগ নম্বর কিংবা খতিয়ান নম্বরের তথ্য জানা থাকলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-পর্চা পোর্টালে প্রয়োজনীয় রেকর্ড খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন কপি বা সত্যায়িত কপির জন্য আবেদন করা যায়। তবে সঠিক পর্চা খুঁজে পেতে জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা, মৌজা এবং জরিপের ধরন ঠিকভাবে নির্বাচন করা জরুরি।

জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড যাচাই কিংবা জমির তথ্য মিলিয়ে দেখার ক্ষেত্রে পর্চা গুরুত্বপূর্ণ নথি। তাই শুধু অনলাইনে খতিয়ান খুঁজে পেলেই হবে না; সেখানে উল্লেখ করা মালিকের নাম, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণও যাচাই করা প্রয়োজন।

জমির পর্চা অনলাইনে বের করার সরকারি ওয়েবসাইট

বাংলাদেশে জমির খতিয়ান বা পর্চা অনুসন্ধান এবং কপির জন্য আবেদন করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ই-পর্চা সেবা ব্যবহার করা যায়।

ই-পর্চা পোর্টাল: https://www.eporcha.gov.bd/

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ও ম্যাপ সেবা: https://dlrms.land.gov.bd/

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট: https://land.gov.bd/

ওয়েবসাইটে প্রবেশের পর খতিয়ান অনুসন্ধান বা সার্ভে খতিয়ানের অপশন নির্বাচন করতে হবে। জমিটি কোন জরিপের আওতাভুক্ত, সেটি জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়। যেমন—সিএস (CS), এসএ (SA), আরএস (RS), বিএস (BS) বা সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্য কোনো জরিপের খতিয়ান।

অনলাইনে জমির পর্চা বের করার নিয়ম

মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করেই পর্চা অনুসন্ধান করা যায়। প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করতে হবে।

ধাপ ১: সরকারি পোর্টালে প্রবেশ করুন

প্রথমে ই-পর্চার সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। এরপর খতিয়ান অনুসন্ধান বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড দেখার অপশন নির্বাচন করুন।

ধাপ ২: জমির অবস্থান নির্বাচন করুন

অনুসন্ধানের জন্য জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা থানা এবং মৌজার নাম নির্বাচন করতে হবে। জমিটি যে মৌজায় অবস্থিত, সেই মৌজার তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া জরুরি। একই এলাকার কাছাকাছি নামের একাধিক মৌজা থাকলে ভুল রেকর্ড নির্বাচন হয়ে যেতে পারে।

ধাপ ৩: খতিয়ানের ধরন নির্বাচন করুন

জমিটি কোন জরিপের খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত, তা নির্বাচন করুন। পুরোনো দলিল বা আগের পর্চায় জরিপের ধরন উল্লেখ থাকলে সেখান থেকে তথ্যটি মিলিয়ে নেওয়া যায়।

ধাপ ৪: খতিয়ান নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করুন

খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে সেটি নির্দিষ্ট ঘরে লিখে অনুসন্ধান করুন। সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের রেকর্ড বা তালিকা দেখা যাবে।

ধাপ ৫: খতিয়ান নম্বর না জানলে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করুন

খতিয়ান নম্বর জানা না থাকলে পোর্টালে অতিরিক্ত অনুসন্ধান বা ‘অধিকতর অনুসন্ধান’ অপশন থাকলে সেটি ব্যবহার করুন। সেখানে নির্দেশনা অনুযায়ী দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে খোঁজার সুযোগ থাকতে পারে।

অনুসন্ধানে একাধিক ফলাফল এলে শুধু নাম দেখে কোনো একটি খতিয়ান নির্বাচন করবেন না। মৌজা, দাগ নম্বর, মালিকের নাম এবং জমির বিবরণ মিলিয়ে সঠিক রেকর্ডটি শনাক্ত করুন।

ধাপ ৬: প্রয়োজনীয় কপির জন্য আবেদন করুন

সংশ্লিষ্ট খতিয়ান পাওয়া গেলে কী ধরনের কপি প্রয়োজন, তা নির্বাচন করুন। সাধারণ অনলাইন কপি এবং সরকারি সত্যায়িত কপির সেবার ধরন আলাদা। প্রয়োজন অনুযায়ী আবেদন সম্পন্ন করে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে।

জমির পর্চা বের করতে কী কী তথ্য প্রয়োজন?

অনলাইনে পর্চা খোঁজার আগে জমির কয়েকটি তথ্য সংগ্রহ করে রাখলে কাজ সহজ হয়। সাধারণত নিচের তথ্যগুলো কাজে লাগে—

জমির বিভাগ ও জেলার নাম

উপজেলা বা থানার নাম

মৌজার নাম

জরিপের ধরন—যেমন সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস

খতিয়ান নম্বর, যদি জানা থাকে

দাগ নম্বর অথবা রেকর্ডে থাকা মালিকের নাম

সব তথ্য একসঙ্গে জানা বাধ্যতামূলক নয়। পোর্টালে যে অনুসন্ধান পদ্ধতি পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। তবে জমির অবস্থান ও মৌজার নাম ভুল হলে সঠিক রেকর্ড খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।

জমির পর্চা তুলতে কত টাকা লাগে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ভূমিসেবার ফি তালিকা অনুযায়ী, খতিয়ান বা পর্চার কপির জন্য ফি নির্ভর করে কোন ধরনের সেবা নেওয়া হচ্ছে তার ওপর।

আরও পড়ুন:

জমির নামজারি মঞ্জুর হয়েছে? ঘরে বসেই জেনে নিন

জমি খুঁজে পাচ্ছেন না? দাগ নম্বর ও নকশা মিলিয়ে দেখুন

অনলাইন কপি: প্রতি খতিয়ানের জন্য আবেদন ফি ১০০ টাকা।

সত্যায়িত কপি: প্রতি খতিয়ানের আবেদন ফি ১০০ টাকা। ডাকযোগে দেশের মধ্যে কপি নিতে হলে এর সঙ্গে ৪০ টাকা ডাক মাশুল যোগ হয়। সে হিসাবে মোট ১৪০ টাকা।

এই ফি সরকারি প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে। ফি পরিবর্তন হতে পারে বা সেবার ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত নির্দেশনা থাকতে পারে। তাই টাকা পরিশোধের আগে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ফি তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট পোর্টালে প্রদর্শিত পরিমাণ যাচাই করুন।

অনলাইন পর্চা ও সত্যায়িত পর্চার মধ্যে পার্থক্য কী?

অনলাইনে পাওয়া সাধারণ খতিয়ান কপি এবং সত্যায়িত কপির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

অনলাইন কপি: সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইন কপি সংগ্রহ করা যায়। জমির রেকর্ডের তথ্য দেখা, নিজের কাছে সংরক্ষণ এবং প্রাথমিক যাচাইয়ের কাজে এটি সহায়ক।

সত্যায়িত কপি: সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সত্যায়িত খতিয়ান কপি সংগ্রহের জন্য আলাদা আবেদন করতে হয়। আদালত, প্রশাসনিক কাজ বা অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনে কোন ধরনের কপি গ্রহণযোগ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।

তাই শুধু তথ্য দেখার প্রয়োজন হলে অনলাইন কপি যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু কোনো দাপ্তরিক বা আইনি কাজে জমা দিতে হলে আগে জেনে নিন সত্যায়িত কপি প্রয়োজন কি না।

অনলাইনে জমির পর্চা না পেলে কী করবেন?

অনলাইনে অনুসন্ধান করেও খতিয়ান না পাওয়া মানেই জমির কোনো রেকর্ড নেই—এমন নয়। পুরোনো রেকর্ডের তথ্য ডিজিটাল পোর্টালে না থাকা, ভুল মৌজা নির্বাচন, খতিয়ান নম্বরে ভুল কিংবা জরিপের ধরন ভুল হওয়ার কারণে অনুসন্ধানে ফলাফল নাও আসতে পারে।

এমন হলে প্রথমে নিচের বিষয়গুলো যাচাই করুন—

১. বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজার নাম সঠিকভাবে নির্বাচন করেছেন কি না।

২. সিএস, এসএ, আরএস বা বিএসের মধ্যে সঠিক জরিপ নির্বাচন করেছেন কি না।

৩. খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর লিখতে ভুল হয়েছে কি না।

৪. মালিকের নামের বানান বা অন্যান্য তথ্য রেকর্ডের সঙ্গে মিলছে কি না।

তারপরও তথ্য না পেলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুম, ই-সেবা কেন্দ্র বা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রয়োজন হলে সরকারি ভূমিসেবা হটলাইন ১৬১২২ নম্বরে সহায়তা চাইতে পারেন।

জমির পর্চা দেখে কোন তথ্যগুলো মিলিয়ে নেবেন?

পর্চা হাতে পাওয়ার পর শুধু মালিকের নাম দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। জমির বিবরণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মালিকের নাম: রেকর্ডে উল্লেখ করা মালিকের নাম ও পরিচয় সংশ্লিষ্ট দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।

খতিয়ান ও দাগ নম্বর: জমির অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড শনাক্ত করতে এই নম্বরগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

জমির পরিমাণ: পর্চায় উল্লেখ করা জমির পরিমাণ দলিল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির সঙ্গে তুলনা করুন।

মৌজা ও জরিপের ধরন: একই এলাকার বিভিন্ন জরিপে আলাদা খতিয়ান নম্বর থাকতে পারে। তাই কোন জরিপের রেকর্ড দেখছেন, তা নিশ্চিত করুন।

মালিকানার ধারাবাহিকতা: জমি কেনার ক্ষেত্রে বর্তমান পর্চার পাশাপাশি আগের দলিল, প্রাসঙ্গিক খতিয়ান এবং অন্যান্য মালিকানাসংক্রান্ত নথিও যাচাই করা উচিত।

মনে রাখতে হবে, পর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমি রেকর্ড হলেও শুধু একটি খতিয়ান দেখে জমির মালিকানা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। জমির দলিল, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্যও যাচাই করা জরুরি।

জমির পর্চা অনলাইনে বের করতে প্রথমে সরকারি ই-পর্চা পোর্টালে প্রবেশ করে জমির অবস্থান, মৌজা ও জরিপের ধরন নির্বাচন করুন। এরপর খতিয়ান নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করুন; নম্বর জানা না থাকলে পোর্টালের বিকল্প অনুসন্ধান সুবিধায় দাগ নম্বর বা মালিকের নাম ব্যবহার করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইন কপি অথবা সত্যায়িত কপির জন্য আবেদন করুন।

অনলাইনে রেকর্ড না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা রেকর্ড রুমের সহায়তা নিন। আর জমি কেনাবেচা বা আইনি কাজে ব্যবহার করার আগে পর্চার তথ্যের সঙ্গে দলিল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি মিলিয়ে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. জমির পর্চা অনলাইনে কোথায় পাওয়া যাবে?

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ই-পর্চা পোর্টালে জমির খতিয়ান অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কপির জন্য আবেদন করা যায়।

২. খতিয়ান নম্বর না জানলে কি জমির পর্চা বের করা সম্ভব?

পোর্টালে বিকল্প বা অধিকতর অনুসন্ধানের সুবিধা থাকলে দাগ নম্বর বা মালিকের নাম দিয়ে খোঁজার সুযোগ রয়েছে। তবে জমির মৌজা ও জরিপের তথ্য সঠিক হওয়া জরুরি।

৩. অনলাইনে জমির পর্চা তুলতে কত টাকা লাগে?

সরকারি ফি তালিকা অনুযায়ী অনলাইন খতিয়ান কপির আবেদন ফি ১০০ টাকা। ডাকযোগে সত্যায়িত কপি নিতে ১০০ টাকা আবেদন ফি ও ৪০ টাকা ডাক মাশুল, মোট ১৪০ টাকা। টাকা দেওয়ার আগে বর্তমান ফি যাচাই করুন।

৪. অনলাইন পর্চা কি সত্যায়িত পর্চার সমান?

না, দুটির সেবার ধরন আলাদা। আনুষ্ঠানিক কাজে কোন কপি গ্রহণযোগ্য, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।

৫. অনলাইনে জমির খতিয়ান না পাওয়া গেলে কী করব?

প্রথমে মৌজা, জরিপের ধরন ও খতিয়ান বা দাগ নম্বরের তথ্য যাচাই করুন। এরপরও না পেলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুম বা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে ১৬১২২ নম্বরে ভূমিসেবা-সংক্রান্ত সহায়তা চাইতে পারেন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: