ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

শক্তি বাড়াচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, বুধবার স্থলভাগে আঘাতের আশঙ্কা

সারাদেশ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১৭:৪৭:৪৬
শক্তি বাড়াচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, বুধবার স্থলভাগে আঘাতের আশঙ্কা

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’কে ঘিরে অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় এলাকায় সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এই ঘূর্ণিঝড় আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র থেকে অতি তীব্র রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ ও পুদুচেরির ইয়ানাম উপকূলের বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী কোনও অংশ দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে এটি। সে সময় ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে পারে, দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ পৌঁছাতে পারে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব ইতিমধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের চার জেলায় দেখা দিতে শুরু করেছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ সামাল দিতে উদ্ধারকারী দল মোতায়েন, ট্রেন বাতিল এবং বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে মঙ্গলবার থেকে উপকূলীয় সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশেও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।

অর্ণবের সম্ভাব্য গতিপথ, কোথায় আঘাত হানতে পারে

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার হিসাব অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির অবস্থান ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম থেকে ২৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে। ওড়িশার গোপালপুর থেকে এর দূরত্ব ছিল ৩৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ১২ ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড়টির শক্তি আরও বাড়তে পারে।

আবহাওয়াবিদদের ধারণা, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমমুখী অগ্রগতির পর মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে গতিপথে কিছুটা পরিবর্তন ঘটতে পারে। এরপর উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে উপকূলে আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্ভাব্য স্থলভাগে প্রবেশের এলাকা হিসেবে অন্ধ্রপ্রদেশ ও পুদুচেরির ইয়ানাম উপকূলের বাপটলা এবং বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী অংশের কথা বলা হয়েছে। ওই সময় ঘণ্টায় ১১৫-১২৫ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বইতে পারে। দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্ধ্রপ্রদেশে আগাম প্রস্তুতি, বাতিল ৫৩টি ট্রেন

অর্ণবের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের অনকাপল্লী, শ্রীকাকুলম, বিশাখাপত্তনম ও বিজয়নগরমে ইতিমধ্যে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফের একাধিক দল বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে।

কাকীনাডা, কোনাসীমা, রাজামুন্দ্রি, এলুরু, মছলিপত্তনম ও নাকাপল্লীতে উদ্ধারকাজের জন্য দল মোতায়েন করা হয়েছে। একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ইয়ানাম, কৃষ্ণা ও বিশাখাপত্তনমেও।

সম্ভাব্য দুর্যোগের কারণে রেল চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। মঙ্গলবার ও বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশে মোট ৫৩টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। ফলে বিজয়ওয়াড়া, রাজামুন্দ্রি, কাকীনাডা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যে চলাচলকারী একাধিক ট্রেন এই দুই দিন চলবে না।

ওড়িশাতেও মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৮টি ট্রেনের পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশাখাপত্তনম-কোরাপুট প্যাসেঞ্জার এবং বিশাখাপত্তনম-কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জার। যাত্রীদের সহায়তার জন্য বিশাখাপত্তনমে বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করেছে দক্ষিণ উপকূলীয় রেলওয়ে।

দক্ষিণ ওড়িশার ছয় জেলায় বন্ধ স্কুল-কলেজ

অন্ধ্রপ্রদেশের লাগোয়া দক্ষিণ ওড়িশায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বেশি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, মালকানগিরি, কোরাপুট ও নবরংপুর—এই ছয় জেলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার ও বুধবার ওই জেলাগুলোতে স্কুল, কলেজ এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে ত্রাণশিবিরে নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ওড়িশা রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও এনডিআরএফের সদস্যদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

প্রস্তুতির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব আট মন্ত্রীকে দিয়েছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন। এদিকে আবহাওয়া পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে মঙ্গলবার ও বুধবার আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনও সব স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলায় মঙ্গলবার থেকেই আবহাওয়ার পরিবর্তনের পূর্বাভাস

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকাতেও পড়তে পারে। উপকূল সংলগ্ন জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টি, বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সমুদ্রের পরিস্থিতিও খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আলিপুর আবহাওয়া দফতর।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকেই পশ্চিমবঙ্গের উপকূলের সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। ঢেউয়ের পরিস্থিতি অতি উত্তাল পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। এ কারণে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে। ওই জেলাগুলোতে ঘণ্টায় ৩০-৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া ও হুগলিতে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

বুধবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বৃষ্টির পরিমাণ ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার হতে পারে। এই চার জেলায় ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলোতেও দমকা হাওয়ার সঙ্গে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

এরপর বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ধস নামার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর।

নামখানা ও সাগরে মাইকে সতর্কবার্তা, সমুদ্রে যেতে নিষেধ

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পাশাপাশি নদী ও সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাও রয়েছে। গভীর নিম্নচাপ এবং পূর্ণিমার কটাল এই পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানা-সহ উপকূলবর্তী এলাকায় বাসিন্দাদের সতর্ক করতে মাইকে প্রচার শুরু করেছে ফ্রেজারগঞ্জ উপকূল থানা, গঙ্গাসাগর কোস্টাল থানা এবং গোবর্ধনপুর কোস্টাল থানা।

মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যাঁরা ইতিমধ্যে মাছ ধরতে গিয়েছেন, তাঁদের নিরাপদ স্থানে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামাল দিতে সাগর, নামখানা-সহ উপকূলীয় এলাকায় সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে।

বিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশেও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব শুধু উপকূলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও বিহারেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতি সম্পর্কে দুই রাজ্যকে সতর্ক করেছেন ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথন।

অন্ধ্রপ্রদেশে সম্ভাব্য স্থলভাগে আঘাতের আগে থেকেই উদ্ধারকারী দল মোতায়েন, রেল পরিষেবা বাতিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের উপকূল ও দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় সতর্কতা জারি রয়েছে।

পাঠকদের সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. ঘূর্ণিঝড় অর্ণব কবে স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে?

প্রদত্ত পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ ও পুদুচেরির ইয়ানাম উপকূলের বাপটলা এবং বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী কোনও এলাকায় স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি।

২. ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের বাতাসের গতিবেগ কত হতে পারে?

স্থলভাগে আঘাতের সময় ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫-১২৫ কিলোমিটার থাকতে পারে। দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ হতে পারে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার।

৩. পশ্চিমবঙ্গের কোন জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে?

বুধবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

৪. ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কতটি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে?

অন্ধ্রপ্রদেশে মঙ্গলবার ও বুধবার ৫৩টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। ওড়িশায় মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে ৮টি ট্রেন।

৫. পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবীদের জন্য কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?

সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে মাছ ধরতে সমুদ্রে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সমুদ্রে থাকা মৎস্যজীবীদের নিরাপদ স্থানে ফিরে আসতে বলা হয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: