ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

চার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়া মায়ের শেষ ঠিকানা ছিল ভাড়া বাসা

সারাদেশ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৬:২৯:৩৬
চার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়া মায়ের শেষ ঠিকানা ছিল ভাড়া বাসা

বরিশালের বাবুগঞ্জে একটি ভাড়া বাসার কক্ষে পাওয়া গেল ৬৫ বছর বয়সী তাহমিনা বেগমের পচনধরা মরদেহ। প্রায় তিন মাস ধরে নতুন হাট এলাকার ওই বাসায় একাই থাকছিলেন তিনি। শনিবার বিকেল থেকে বাসার আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়ালেও প্রথমে বিষয়টি অন্য কারণে হয়েছে বলে ধারণা করেছিলেন বাড়ির মালিক। রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে মৃত্যুর ঘটনা। দুপুরে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।

তাহমিনা বেগমের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মরদেহ উদ্ধারের এক থেকে দুই দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

তাহমিনার জীবনের শেষ সময় কাটছিল নিঃসঙ্গতায়। অথচ স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে তিনি সৌদি আরবে গিয়ে প্রায় ১০ বছর কাজ করেছিলেন। তাঁর বড় ছেলে সুমনের ঢাকার উত্তরায় রয়েছে ছয়তলা ভবন ও বৈদ্যুতিক বোর্ড তৈরির কারখানা। ছোট ছেলে আওলাদও ঢাকায় কাজ করেন। দুই মেয়ে হিরা ও মুক্তার বিয়েও দিয়েছেন ভালো পাত্রের সঙ্গে।

দুর্গন্ধের সূত্র ধরে সামনে আসে মৃত্যুর ঘটনা

বাড়ির মালিক আব্দুর বারেকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন মাস আগে তাহমিনাকে বাসাটিতে ভাড়া রাখেন তাঁর বড় ভাই রমিজ। এরপর থেকে ওই কক্ষেই একা থাকছিলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে মাঝেমধ্যে বাইরে বের হতেন এবং স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন দোকানে ঘোরাফেরা করতেন।

তবে গত দুই দিন তাঁকে বাইরে দেখা যায়নি। শনিবার বিকেল থেকে বাসাটির আশপাশে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথমে আব্দুর বারেকের ধারণা হয়, পাশের কোনো কক্ষে ইঁদুর মারা যাওয়ায় গন্ধ ছড়িয়েছে। রোববার সকালে দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, গন্ধ আসছে তাহমিনার কক্ষ থেকে।

এরপর খবর দেওয়া হয় তাঁর বড় ভাইকে। তিনি বাসায় এসে কক্ষের দরজা কিছুটা খোলা দেখতে পান। ভেতরে ঢুকে বোনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।

বাড়ির মালিক আব্দুর বারেক আরও জানিয়েছেন, ওই তিন মাসে তাহমিনার ছেলে-মেয়েদের কাউকে মাকে দেখতে আসতে দেখেননি তিনি।

অসুস্থতা ও একাকিত্বের কথা জানালেন প্রতিবেশীরা

তাহমিনা বেগমের শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী শাহানা বেগম জানান, তাহমিনা কয়েকবার স্ট্রোক করেছিলেন বলে তাঁরা শুনেছেন। তাঁর পা প্রায়ই ফুলে থাকত। হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগতেন তিনি। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করতেন না।

শাহানা বেগমের ভাষ্য, অসুস্থতার মধ্যেও তাহমিনাকে দিনের বেশির ভাগ সময় বাজারের বিভিন্ন দোকানে ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। বাড়ির মালিকের বক্তব্যেও তাঁর মাঝেমধ্যে বাজারে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রতিবেশী আব্দুর রহিম হাওলাদার জানান, শনিবার রাতে তাহমিনার ছেলে মায়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে তিনি ছোট মামার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনিও বোনকে ফোনে না পেয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরদিন সকালে বড় ভাই বাসায় গিয়ে তাহমিনার মরদেহ দেখতে পান।

স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশে যান

তাহমিনা বেগমের বাড়ি বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের রাকুদিয়া গ্রামে। তিনি মৃত কদম আলী হাওলাদারের স্ত্রী। স্থানীয় ও নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর চার সন্তানকে নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েন তিনি।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে স্বামীর বসতঘর বিক্রি করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তাহমিনা। সেখানে প্রায় ১০ বছর কাজ করে যে অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়ে সন্তানদের লালন-পালন ও প্রতিষ্ঠিত করেন।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বড় ছেলে সুমন ঢাকার উত্তরায় থাকেন। সেখানে তাঁর ছয়তলা ভবন ও বৈদ্যুতিক বোর্ড তৈরির কারখানা রয়েছে। ছোট ছেলে আওলাদও ঢাকায় কর্মরত। দুই মেয়ে হিরা ও মুক্তার বিয়ে দিয়েছেন ভালো পাত্রের সঙ্গে।

সন্তানদের জীবন গুছিয়ে দেওয়ার পর জীবনের শেষ পর্যায়ে বাবুগঞ্জের নতুন হাট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় একাই বসবাস করছিলেন তাহমিনা। তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসার পরও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে জানা যাবে মৃত্যুর কারণ

বাবুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, নিহত নারীর বড় ভাই সকালে মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

ওসি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এক থেকে দুই দিন আগে ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণের জন্য মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে তাহমিনার ছেলে ও মেয়েদের কেউ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মরদেহ উদ্ধারের পর তা ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রথমে পুলিশকে বাধা দেন স্বজনেরা। গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য সংগ্রহেও বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

তাহমিনা বেগমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো অজানা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের পরবর্তী তদন্তেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. তাহমিনা বেগমের মরদেহ কোথায় পাওয়া যায়?

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার নতুন হাট এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

২. তাহমিনা বেগমের বয়স কত ছিল?

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৬৫ বছর।

৩. কত দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ?

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মরদেহ উদ্ধারের এক থেকে দুই দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

৪. তাহমিনা বেগমের মৃত্যুর কারণ কি জানা গেছে?

না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি জানা যাবে।

৫. তাহমিনা বেগমের পরিবারের সদস্য কারা?

তাঁর দুই ছেলে সুমন ও আওলাদ এবং দুই মেয়ে হিরা ও মুক্তা। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বড় ছেলে সুমনের ঢাকার উত্তরায় ছয়তলা ভবন ও বৈদ্যুতিক বোর্ড তৈরির কারখানা রয়েছে। ছোট ছেলে আওলাদও ঢাকায় কাজ করেন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: