মানিক পশারী কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন? জানুন তাঁর পরিচয়
আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর পিরোজপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া ও দাফন নিয়ে বিরোধের মধ্যে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। একদিকে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁকে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্যদিকে তাঁর স্বীকৃতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—মানিক পশারী কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, নাকি তাঁর পরিচয় নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনও বাকি?
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিরোধ এবং মৃত্যুর পর দাফন ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির বিস্তারিত উঠে আসে।
সরকারি গেজেটে নাম থাকার কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম
আজকের পত্রিকা ও অন্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে মানিক পশারীকে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে তাঁর পরিচয় নিয়ে আপত্তি ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন এবং বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে।
তবে সংবাদমাধ্যমে গেজেটে নাম থাকার কথা উল্লেখ করা আর সেই গেজেটের মূল নথি পরীক্ষা করা এক বিষয় নয়। মানিক পশারীর নাম সংশ্লিষ্ট সরকারি তালিকায় রয়েছে কি না, তাঁর অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি কী ছিল এবং স্বীকৃতির বিষয়ে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে কি না—এসব নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কেন তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে?
মানিক পশারীর পরিচয় নিয়ে আপত্তি জানান পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় মানিক পশারী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কথা বলেছিলেন। এ বক্তব্যের ভিত্তিতে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তি কীভাবে হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। ডেইলি বাংলাদেশের প্রতিবেদন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা এবং সরকারি নিয়মে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া—এগুলো সম্পর্কিত হলেও এক বিষয় নয়। কারও স্বীকৃতি বৈধ ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রযোজ্য বিধি, তালিকাভুক্তির নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত দেখতে হবে।
মাসুদ সাঈদীর অভিযোগ বা বক্তব্যকে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে, কোনো সংবাদে গেজেটভুক্ত বলা হয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই না করে সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না।
মৃত্যুর পর দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান নিয়ে কী ঘটেছিল?
মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে আনা হলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া এবং দাফন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মরদেহ নিয়ে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে পৌঁছানোর পর তাঁরা বাধার মুখে পড়েন। পরে পুলিশ মরদেহটি পুলিশ লাইনসে নিয়ে যায় এবং বিকেল ৫টার দিকে সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
এরপর রাত ১টার দিকে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানো হয়। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। পরিবারের নারী সদস্যরা কবর খোঁড়া ও দাফনের কাজে অংশ নেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অবশ্য পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য, জেলা জামায়াত ও অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতা দাফনে বাধা দেননি এবং দাফনের কাজে পুলিশকে সহযোগিতা করা হয়েছে। ফলে ঘটনাটি নিয়ে পরিবারের অভিযোগ এবং জামায়াত নেতার বক্তব্য আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি।
তাহলে মানিক পশারী কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদনগুলো থেকে বলা যায়, মানিক পশারীকে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাঁর স্বীকৃতি নিয়ে আপত্তি তুলে তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে। কিন্তু তাঁর তালিকাভুক্তির বৈধতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
তাই প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে নিশ্চিতভাবে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলা যেমন দায়িত্বশীল হবে না, তেমনি সব বিতর্ক নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও দাবি করা যাবে না। সরকারি গেজেট, তালিকাভুক্তির ভিত্তি এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকলে সেটিই হবে বিষয়টি নিশ্চিত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
সারকথা: মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে সত্য যাচাই, সততা ও ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করে এই বিতর্কের তথ্যভিত্তিক নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
প্রাসঙ্গিক FAQ
১. মানিক পশারী কি সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁকে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তাঁর স্বীকৃতি নিয়ে আপত্তি উঠেছে। চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে সরকারি গেজেট ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
২. মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কে?
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
৩. মানিক পশারী কেন পরিচিত ছিলেন?
তিনি আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ছিলেন।
৪. কোরআনে সংবাদ যাচাই সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
সুরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে সংবাদ যাচাই করার নির্দেশ রয়েছে, যাতে ভুল তথ্যের কারণে কারও ক্ষতি না হয়।
৫. হাদিসের আলোকে এ ধরনের বিতর্ক কীভাবে দেখা উচিত?
সহিহ মুসলিমের ১০১ নম্বর হাদিসে প্রতারণার নিন্দা করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত কি না, তা নির্ধারণ করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও যথাযথ প্রমাণ প্রয়োজন।
আল-মামুন/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে
- ওয়ানডে দলে ফিরবেন মুশফিক-রিয়াদ? ব্যাটিং কোচ হচ্ছেন ডি ভিলিয়ার্স?
- জমির দাগ, খতিয়ান ও নকশা যাচাইয়ের সহজ নিয়ম
- জমির দলিল হারালে নকল তুলতে কত টাকা খরচ হবে?
- টেক্সটাইল খাতে সংকট, বন্ধ ১৪ কোম্পানির কারখানা,বিপাকে বিনিয়োগকারীরা
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ৯টি দেশের টাকার মান
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ৬টি দেশের টাকার মান