ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

অনলাইনে জুতা কিনলে সঠিক সাইজ বাছবেন যেভাবে

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৩:২৫:৫৯
অনলাইনে জুতা কিনলে সঠিক সাইজ বাছবেন যেভাবে

জুতা কেনার সময় শুধু ৪০, ৪১ বা ৪২—এমন সাইজ নম্বর দেখে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল মাপের জুতা কেনার আশঙ্কা থাকে। কারণ একই সাইজের জুতা একেক ব্র্যান্ড বা নকশায় ভিন্নভাবে ফিট হতে পারে। আবার দুই পায়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থেও সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। তাই জুতা কেনার আগে পায়ের সঠিক মাপ নেওয়া, আঙুলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা এবং পরে কয়েক কদম হেঁটে ফিট পরীক্ষা করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, জুতা এমন হতে হবে যাতে পা স্বাভাবিকভাবে রাখা যায়, আঙুল চেপে না থাকে এবং হাঁটার সময় গোড়ালি বারবার পিছলে না যায়। দোকানে সরাসরি জুতা কেনার পাশাপাশি অনলাইনে কেনার ক্ষেত্রেও কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললে ভুল সাইজ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। আমেরিকান একাডেমি অব অর্থোপেডিক সার্জনসের নির্দেশনা অনুযায়ী, জুতার গায়ে লেখা সাইজের চেয়ে পায়ে সেটি কতটা ভালোভাবে ফিট করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়িতে বসেই পায়ের সঠিক মাপ নেবেন যেভাবে

জুতার মাপ বুঝতে সব সময় দোকানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি কাগজ, কলম, স্কেল বা মাপার ফিতা ব্যবহার করে বাড়িতেই পায়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের ধারণা পাওয়া যায়।

প্রথমে মেঝেতে একটি কাগজ বিছিয়ে তার ওপর সোজা হয়ে দাঁড়ান। বসে পায়ের মাপ নেওয়ার বদলে দাঁড়িয়ে মাপ নেওয়া ভালো, কারণ শরীরের ওজন পড়লে পায়ের আকার কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।

এরপর গোড়ালি থেকে সবচেয়ে লম্বা আঙুলের আগা পর্যন্ত কাগজে চিহ্ন দিন। দুই পায়ের জন্য আলাদাভাবে একই কাজ করুন। চিহ্ন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব স্কেল দিয়ে মেপে সেন্টিমিটারে লিখে রাখুন।

শুধু দৈর্ঘ্য নয়, পায়ের সামনের সবচেয়ে চওড়া অংশের মাপও নিন। কারও পায়ের দৈর্ঘ্য কম হলেও সামনের অংশ চওড়া হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে শুধু বড় সাইজের জুতা কিনলে আঙুলের সামনে অতিরিক্ত জায়গা তৈরি হতে পারে, অথচ পায়ের পাশের চাপের সমস্যা পুরোপুরি দূর নাও হতে পারে।

মাপ নেওয়ার সময় সাধারণত যে ধরনের মোজা পরে জুতা ব্যবহার করেন, সেই মোজা পরলে আরও বাস্তবসম্মত ধারণা পাওয়া যায়। দুই পায়ের মধ্যে যেটি বড়, জুতা বাছাইয়ের সময় সেটির মাপকে অগ্রাধিকার দিন। ব্র্যাডফোর্ড ডিস্ট্রিক্ট কেয়ার এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের নির্দেশনাতেও দুই পায়ের মাপ নিয়ে বড় পায়ের ভিত্তিতে জুতা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জুতার সামনে কতটুকু জায়গা থাকা উচিত

সঠিক মাপের জুতা চেনার অন্যতম সহজ উপায় হলো সামনের অংশে আঙুলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আছে কি না, তা পরীক্ষা করা।

আমেরিকান একাডেমি অব অর্থোপেডিক সার্জনসের পরামর্শ অনুযায়ী, জুতার ভেতরে সবচেয়ে লম্বা আঙুলের আগা থেকে জুতার সামনের প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় আধা ইঞ্চি বা ১ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার জায়গা রাখা ভালো। তবে জুতার ধরন, নকশা এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফিটের অনুভূতি ভিন্ন হতে পারে। তাই এই দূরত্বকে একমাত্র মাপকাঠি না ধরে আঙুল স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে পারছে কি না, সেটিও দেখুন।

জুতার সামনের অংশ সরু হলে আঙুল একসঙ্গে চেপে যেতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় হাঁটা, দাঁড়িয়ে কাজ করা বা নিয়মিত ব্যায়ামের জন্য এমন জুতা অস্বস্তিকর হতে পারে।

আবার সামনে অতিরিক্ত জায়গা থাকলে হাঁটার সময় পা জুতার ভেতরে সরে যেতে পারে। এতে ঘর্ষণ, ফোসকা বা অস্বস্তির ঝুঁকি বাড়ে। তাই লক্ষ্য হবে—আঙুলের জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকবে, কিন্তু পা জুতার ভেতরে ঢিলেঢালাভাবে নড়বে না।

জুতার সাইজ নম্বর একেক ব্র্যান্ডে একেক রকম কেন

অনেকে দীর্ঘদিন ধরে ৪১ বা ৪২ সাইজের জুতা পরেন বলে নতুন জুতা কেনার সময়ও একই নম্বর খোঁজেন। কিন্তু এই অভ্যাস সব সময় কাজে আসে না।

জুতার সাইজ নির্ধারণের পদ্ধতি, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাপের চার্ট, জুতার নকশা এবং সামনের অংশের গঠন একেক ব্র্যান্ডে একেক রকম হতে পারে। একই ব্র্যান্ডের দুই ধরনের জুতার ফিটও আলাদা অনুভূত হতে পারে।

তাই নতুন ব্র্যান্ডের জুতা কেনার আগে তাদের নিজস্ব সাইজ চার্ট দেখুন। আপনার পায়ের দৈর্ঘ্য সেন্টিমিটারে মেপে সেই চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। সাইজ চার্টে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আলাদাভাবে দেওয়া থাকলে দুইটিই যাচাই করুন।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পায়ের মাপের সঙ্গে জুতার বাইরের দৈর্ঘ্য বা ইনসোলের দৈর্ঘ্য সব সময় সরাসরি এক নয়। তাই শুধু জুতার ভেতরের সোল মেপে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রস্তুতকারকের দেওয়া নির্দেশনা ও জুতা পরে ফিটের পরীক্ষা—দুটিই কাজে লাগান।

জুতা কেনার সবচেয়ে ভালো সময় কখন

দিনের বিভিন্ন সময়ে পায়ের আকারে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। হাঁটাচলা ও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অনেকের পা দিনের শেষ দিকে কিছুটা ফুলে যায়। এ কারণে বিকেল বা সন্ধ্যায় জুতা পরখ করে কেনা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সকালে পা তুলনামূলক ছোট থাকা অবস্থায় কেনা জুতা দিনের শেষে আঁটসাঁট মনে হতে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকেন, তাদের জুতা কেনার সময় দিনের শেষ ভাগে ফিট পরীক্ষা করা উপকারী।

তবে সবার পা একইভাবে ফুলবে, এমন নয়। যদি নিয়মিত অস্বাভাবিক ফোলা বা ব্যথা থাকে, তাহলে সেটিকে শুধু জুতার মাপের সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

জুতা কেনার আগে পরে হাঁটুন

দোকানে জুতা পরে শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে সব সমস্যা ধরা নাও পড়তে পারে। তাই কেনার আগে দুই পায়েই জুতা পরে কয়েক মিনিট হাঁটুন। সম্ভব হলে দোকানের শক্ত মেঝে ও অন্য উপযুক্ত পৃষ্ঠে হেঁটে দেখুন।

এ সময় কয়েকটি বিষয় লক্ষ করুন—

আঙুলে চাপ লাগছে কি না বা কোনো আঙুল অন্যটির ওপর উঠে যাচ্ছে কি না।

পায়ের সামনের চওড়া অংশে টান বা চাপ অনুভূত হচ্ছে কি না।

গোড়ালি হাঁটার সময় বারবার জুতার বাইরে উঠে আসছে কি না।

জুতার ভেতরে কোনো শক্ত সেলাই, উঁচু অংশ বা অস্বস্তিকর উপাদান আছে কি না।

পা স্বাভাবিকভাবে বাঁকাতে ও আঙুল নড়াতে পারছেন কি না।

নতুন জুতা পরে শুরু থেকেই ব্যথা, চাপ বা ঘষা লাগলে শুধু এই আশায় কিনবেন না যে পরে জুতাটি নিজে থেকেই আরামদায়ক হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, জুতা কেনার সময়ই সেটি আরামদায়ক হওয়া উচিত।

অনলাইনে জুতা কেনার সময় যে ভুল এড়াবেন

অনলাইনে জুতা কেনার সুবিধা থাকলেও সঠিক মাপ বেছে নেওয়া তুলনামূলক কঠিন। কারণ ছবি দেখে জুতার প্রকৃত প্রস্থ, সামনের অংশের গভীরতা বা পায়ে পরার পর কেমন লাগবে—তা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

অর্ডার দেওয়ার আগে প্রথমে নিজের দুই পায়ের দৈর্ঘ্য মেপে নিন। এরপর বিক্রেতা বা ব্র্যান্ডের সাইজ চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। শুধু আগের জুতার সাইজ দেখে অর্ডার না করাই ভালো।

পণ্যের বিবরণে জুতার প্রস্থ, ফিটের ধরন, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং ফেরত বা বদলের নিয়ম আছে কি না, সেটিও দেখুন। একই ব্র্যান্ডের অন্য মডেলের সাইজ আপনার পায়ে মানালেও নতুন মডেলটি একইভাবে ফিট করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

যদি সম্ভব হয়, আগে দোকানে একই মডেল পরে পরীক্ষা করুন। অনলাইনে কেনার ক্ষেত্রে মাপের বিষয়ে সন্দেহ থাকলে বিক্রেতার কাছ থেকে সাইজ সংক্রান্ত নির্দেশনা জেনে নিন।

হাঁটা, দৌড়ানো ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জুতা কি একই রকম হবে

সব ধরনের জুতার প্রয়োজন এক নয়। প্রতিদিনের কাজ, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁটা কিংবা দৌড়ানোর জন্য জুতার নকশা ও সাপোর্টের চাহিদা আলাদা হতে পারে।

দৌড়ানোর জুতা কিনলে সাধারণত আঙুলের সামনে পর্যাপ্ত জায়গা, গোড়ালির স্থিতিশীলতা এবং পায়ের সঙ্গে মানানসই কুশনিং পরীক্ষা করা জরুরি। খেলাধুলার সময় যে ধরনের মোজা ব্যবহার করেন, জুতা পরখ করার সময়ও সেই ধরনের মোজা ব্যবহার করুন।

অন্যদিকে, ফ্যাশনের জন্য সরু বা সামনের দিকে সূচালো জুতা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও তা যদি আঙুল চেপে ধরে, তাহলে সেটি এড়িয়ে চলা ভালো। বিশেষ করে যাদের পায়ের সামনের অংশ চওড়া বা আঙুলের গঠনগত সমস্যা রয়েছে, তাদের পর্যাপ্ত গভীরতা ও প্রস্থের জুতা বেছে নেওয়া প্রয়োজন।

সঠিক জুতা মানে শুধু আরাম নয়; পায়ের আকৃতি ও ব্যবহারের প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই জুতা বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল মাপের জুতা পরলে কী সমস্যা হতে পারে

খুব ছোট বা সরু জুতা পায়ের আঙুলে চাপ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন এমন জুতা পরলে ব্যথা, ফোসকা, কড়া বা কিছু ক্ষেত্রে আঙুলের গঠনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার অতিরিক্ত ঢিলা জুতায় পা বারবার সরে গিয়ে ঘর্ষণ ও ফোসকার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে সব পায়ের সমস্যার কারণই জুতা নয়। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, পায়ে ক্ষত তৈরি হলে বা হাঁটতে অসুবিধা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিস বা পায়ের অনুভূতি কমে যাওয়ার সমস্যা থাকলে জুতা বাছাইয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ ছোট ক্ষতও জটিল হতে পারে।

জুতা কেনার আগে মনে রাখুন

সঠিক মাপের জুতা বেছে নেওয়ার জন্য সাইজ নম্বরের চেয়ে পায়ের প্রকৃত মাপ ও জুতার ফিটকে গুরুত্ব দিন। দুই পায়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মাপুন, বড় পায়ের সঙ্গে মিলিয়ে জুতা বাছুন, আঙুলের সামনে যথেষ্ট জায়গা রাখুন এবং কেনার আগে দুই পায়ে জুতা পরে হাঁটুন।

অনলাইনে কেনার সময় ব্র্যান্ডের সাইজ চার্ট ও বদলের নিয়ম যাচাই করুন। জুতা দেখতে সুন্দর হলেও যদি পায়ে চাপ দেয় বা হাঁটার সময় অস্বস্তি তৈরি করে, তাহলে সেটি আপনার জন্য সঠিক পছন্দ নয়।

FAQ: সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. জুতার সঠিক মাপ কীভাবে বুঝব?

দুই পায়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মেপে নিন। জুতা পরে দেখুন আঙুল নড়াতে পারছেন কি না, সামনের অংশে চাপ লাগছে কি না এবং হাঁটার সময় গোড়ালি অতিরিক্ত পিছলে যাচ্ছে কি না।

২. জুতার সামনে কতটুকু ফাঁকা জায়গা রাখা উচিত?

একটি প্রচলিত অর্থোপেডিক নির্দেশনা অনুযায়ী, সবচেয়ে লম্বা আঙুল ও জুতার সামনের প্রান্তের মধ্যে প্রায় আধা ইঞ্চি বা ১ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার জায়গা রাখা ভালো। তবে জুতার ধরন ও ফিটও পরীক্ষা করতে হবে।

৩. দুই পায়ের সাইজ আলাদা হলে কোন মাপের জুতা কিনব?

সাধারণত বড় পায়ের সঙ্গে মানানসই জুতা বেছে নেওয়া উচিত। তবে জুতাটি যেন ছোট পায়ে অতিরিক্ত ঢিলা না হয়, সেটিও পরীক্ষা করুন।

৪. জুতা কি পরে ব্যবহার করতে করতে আরামদায়ক হয়ে যায়?

কিছু উপাদান সময়ের সঙ্গে কিছুটা নমনীয় হতে পারে, কিন্তু শুরু থেকেই চাপ, ব্যথা বা আঙুল চেপে যাওয়ার সমস্যা থাকলে জুতা কেনা উচিত নয়। প্রথমবার পরেই যথেষ্ট আরামদায়ক হওয়া প্রয়োজন।

৫. অনলাইনে জুতা কেনার সময় কোন বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি?

নিজের পায়ের মাপের সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও মডেলের সাইজ চার্ট মিলিয়ে দেখা সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি পণ্যের ফিট, প্রস্থ এবং ফেরত বা বদলের নিয়মও যাচাই করুন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: