ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

বাজারে গিয়েই বেশি খরচ? বদলে ফেলুন এই ৭টি অভ্যাস

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১৬:৫৩:০৮
বাজারে গিয়েই বেশি খরচ? বদলে ফেলুন এই ৭টি অভ্যাস

মাসের বাজার করতে গিয়ে অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি এমন কিছু পণ্যও কেনা হয়ে যায়, যেগুলো না কিনলেও চলত। আবার বাজার শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়েছে। সংসারের এই বাড়তি ব্যয় কমাতে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। বাজারে যাওয়ার আগে ঘরে থাকা পণ্যের হিসাব নেওয়া, কয়েক দিনের খাবারের পরিকল্পনা করা এবং নির্দিষ্ট বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটার তালিকা তৈরি করলেই খরচ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।

বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস ও শাকসবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ওঠানামা করলে পরিকল্পনা করে বাজার করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সঠিক তালিকা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানোর পাশাপাশি খাবারের অপচয় রোধ এবং পরিবারের মাসিক বাজেট সামলাতেও সাহায্য করে।

বাজারে যাওয়ার আগে ঘরের হিসাব নিন

কেনাকাটার তালিকা তৈরির প্রথম কাজ হলো ঘরে কী আছে, তা যাচাই করা। রান্নাঘর, ফ্রিজ ও খাবার রাখার জায়গায় চাল, ডাল, তেল, লবণ, মসলা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের পরিমাণ দেখে নিন।

অনেক সময় আগের কেনা পণ্য শেষ হওয়ার আগেই আবার একই জিনিস কেনা হয়। এতে অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়ে, আবার কিছু খাবার দীর্ঘদিন পড়ে থেকে নষ্টও হতে পারে।

তাই তালিকা তৈরির আগে তিনটি বিষয় যাচাই করুন—কোন পণ্য শেষ হয়ে গেছে, কোনটি অল্প আছে এবং কোনটি এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। এই হিসাব থেকেই বোঝা যাবে, বাজারে আসলে কী কী কেনা প্রয়োজন।

আগে থেকে খাবারের পরিকল্পনা করুন

প্রতিদিন কী রান্না হবে, তা মোটামুটি ঠিক করে রাখলে বাজারের তালিকা করা সহজ হয়। যেমন, কোন দিন মাছ, কোন দিন ডিম বা মুরগি, আর কোন দিন ডাল ও সবজি রান্না করবেন—তা আগে থেকে ভেবে নিতে পারেন।

খাবারের পরিকল্পনা করার সময় পরিবারের সদস্যসংখ্যা, কারা বাড়িতে খাবেন এবং কোন দিন বাইরে খাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় রাখুন।

এতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাছ, মাংস বা সবজি কেনার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে কী রান্না করবেন, তা নিয়ে প্রতিদিন নতুন করে ভাবতে হবে না।

বাজারের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট রাখুন

বাজারে যাওয়ার আগে কত টাকা খরচ করবেন, তা ঠিক করে নেওয়া জরুরি। পরিবারের মাসিক আয়, অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ এবং খাবারের চাহিদা বিবেচনা করে বাজারের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বাজেট নির্ধারণ করুন।

মাসিক বাজেটকে সপ্তাহভিত্তিক ভাগ করে নিলে খরচের ওপর নজর রাখা সহজ হয়। তবে সব সপ্তাহে সমান টাকা খরচ হবে, এমন নয়। চাল, ডাল বা তেলের মতো পণ্য একবারে বেশি পরিমাণে কিনলে কোনো সপ্তাহে খরচ বাড়তে পারে, আবার পরের সপ্তাহে কমতে পারে।

তাই শুধু এক দিনের বাজারের হিসাব নয়, পুরো মাসে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে কত টাকা খরচ হচ্ছে, সেটিও খেয়াল রাখুন।

তালিকায় পণ্যের নামের পাশাপাশি পরিমাণ লিখুন

শুধু চাল, ডাল বা তেল লিখে রাখলে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনার আশঙ্কা থাকে। তাই তালিকায় প্রতিটি পণ্যের আনুমানিক পরিমাণ উল্লেখ করুন।

যেমন, কত কেজি চাল, কতটুকু ডাল বা কত লিটার তেল প্রয়োজন, তা আগেই ঠিক করুন। পরিমাণ নির্ধারণের সময় ঘরে থাকা মজুত এবং আগের সপ্তাহে কতটা ব্যবহার হয়েছে, তা বিবেচনায় নিন।

তবে সব পণ্য বেশি কিনলেই সাশ্রয় হয় না। বিশেষ করে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ও মাংসের ক্ষেত্রে পরিবারের চাহিদা এবং সংরক্ষণের সুবিধা অনুযায়ী কেনা ভালো।

প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা আলাদা করুন

তালিকা তৈরির সময় কোন পণ্য অবশ্যই কিনতে হবে আর কোনটি পরে কিনলেও চলবে, তা আলাদা করে রাখুন।

চাল, ডাল, রান্নার তেল কিংবা শেষ হয়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দিন। এরপর পরিবারের খাবারের পরিকল্পনা অনুযায়ী মাছ, ডিম, মাংস, শাকসবজি ও ফলমূলের পরিমাণ ঠিক করুন।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত নাশতা, মিষ্টি, কোমল পানীয় বা তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন নেই এমন পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বাজেট বিবেচনা করুন। তবে খরচ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হবে খাবারের মান ঠিক রেখে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো।

কম দামের পণ্য কেনার আগে যা দেখবেন

বাজারে একই ধরনের পণ্যের দাম দোকানভেদে আলাদা হতে পারে। তাই সম্ভব হলে কয়েকটি দোকানে দাম যাচাই করুন। চাল, ডাল, তেল, ডিমের মতো নিয়মিত কেনা পণ্যের দাম তুলনা করলে কোথায় কেনা সুবিধাজনক, তা বুঝতে পারবেন।

তবে শুধু কম দাম দেখে পণ্য কেনা ঠিক নয়। পণ্যের মান, ওজন, সতেজতা, মেয়াদ এবং সংরক্ষণের অবস্থা যাচাই করুন। দূরের বাজারে যেতে পরিবহন খরচ বাড়লে সেখান থেকে কেনার প্রকৃত সাশ্রয়ও কমে যেতে পারে।

একইভাবে, কোনো পণ্যে ছাড় থাকলেই সেটি কেনার প্রয়োজন নেই। যে পণ্য ব্যবহার করবেন না বা অতিরিক্ত কেনার কারণে নষ্ট হতে পারে, সেটি ছাড়ে কিনলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।

পচনশীল খাবার কিনুন প্রয়োজন বুঝে

শাকসবজি, ফলমূল, মাছ ও মাংসের মতো খাবার কতটা কিনবেন, তা নির্ধারণের সময় সংরক্ষণের সুবিধা বিবেচনা করা জরুরি।

ফ্রিজে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা সীমিত হলে একসঙ্গে অনেক খাবার না কিনে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে কেনা ভালো। এতে খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।

একই সঙ্গে ঘরে আগে থেকে থাকা খাবারগুলো আগে ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। ফ্রিজে রাখা খাবারের অবস্থাও নিয়মিত যাচাই করুন, যাতে ব্যবহারযোগ্য খাবার ভুলে গিয়ে নষ্ট না হয়।

বাজারে গিয়ে বাড়তি খরচ এড়ানোর সহজ কৌশল

কেনাকাটার তালিকা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; বাজারে গিয়ে সেটি অনুসরণ করাও জরুরি। কিছু অভ্যাস এ ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

তালিকার বাইরে কেনার আগে ভাবুন: কোনো পণ্য কিনতে ইচ্ছা হলে সেটি সত্যিই প্রয়োজন কি না, যাচাই করুন।

সম্ভব হলে খাওয়ার পর বাজারে যান: ক্ষুধার্ত অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে খাবার বা নাশতা কেনার প্রবণতা বাড়তে পারে।

কেনাকাটার হিসাব রাখুন: প্রতিটি পণ্যের দাম লিখে রাখলে মোট খরচ সহজে বোঝা যায়।

অফারের ফাঁদে পড়বেন না: প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কেনার আগে সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হবে কি না, ভাবুন।

বাজারে যাওয়ার আগে তালিকা দেখে নিন: ঘরে থাকা পণ্য ভুলে গিয়ে আবার কিনছেন কি না, তা যাচাই করুন।

বাজারের খরচ কমাতে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

অনেকেই খরচ কমানোর জন্য একবারে অনেক পণ্য কিনে রাখেন। কিন্তু সংরক্ষণের ব্যবস্থা ঠিক না থাকলে খাবার নষ্ট হয়ে সাশ্রয়ের বদলে ক্ষতি হতে পারে। আবার শুধু সস্তা পণ্য কেনার কারণে মান বা পুষ্টির বিষয়ে আপস করাও ঠিক নয়।

আরেকটি সাধারণ ভুল হলো আগের বাজারের হিসাব না রাখা। কোন পণ্য বেশি কেনা হয়েছে, কোনটি অব্যবহৃত রয়েছে এবং কোন খাতে বেশি টাকা খরচ হয়েছে—এসব তথ্য পরবর্তী বাজারের পরিকল্পনা আরও ভালো করতে সাহায্য করে।

প্রতি সপ্তাহে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে বাজারের হিসাব পর্যালোচনা করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় খরচের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।

সহজে ব্যবহারযোগ্য সাপ্তাহিক বাজারের তালিকা

বাজারে যাওয়ার আগে নিচের তালিকাটি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পূরণ করে নিতে পারেন।

চাল ও আটা

ডাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শুকনা খাবার

রান্নার তেল, লবণ ও মসলা

মৌসুমি শাকসবজি

ফলমূল

মাছ, ডিম, মুরগি বা অন্য প্রোটিনের উৎস

দুধ বা বিকল্প পুষ্টিকর খাবার

সাবান, ডিটারজেন্ট ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি পণ্য

প্রতিটি পণ্যের পাশে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ও আনুমানিক দাম লিখুন। বাজার শেষে প্রকৃত খরচও যোগ করুন। কয়েক সপ্তাহ এভাবে হিসাব রাখলে কোন পণ্যে বেশি ব্যয় হচ্ছে এবং কোথায় খরচ কমানো সম্ভব, তা স্পষ্ট হবে।

বাজারের খরচ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় খাবার বাদ দেওয়া বা সব সময় সবচেয়ে সস্তা পণ্য কেনাই একমাত্র উপায় নয়। বরং ঘরে থাকা পণ্যের হিসাব রাখা, খাবারের পরিকল্পনা করা, কেনাকাটার আগে বাজেট নির্ধারণ এবং তালিকা অনুযায়ী বাজার করার অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর।

শুরুতে এই কাজগুলো করতে কয়েক মিনিট বেশি সময় লাগতে পারে। কিন্তু নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানো, খাবারের অপচয় রোধ এবং সংসারের খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সহজ হবে।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. বাজারের খরচ কমাতে কেনাকাটার তালিকা কেন জরুরি?

তালিকা থাকলে প্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিমাণ আগে থেকে নির্ধারণ করা যায়। এতে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এবং ঘরে থাকা পণ্য আবার কেনার প্রবণতা কমতে পারে।

২. মাসের বাজার একসঙ্গে করা ভালো, নাকি সপ্তাহে সপ্তাহে?

চাল ও ডালের মতো সংরক্ষণযোগ্য পণ্য প্রয়োজন অনুযায়ী একসঙ্গে কেনা যায়। তবে শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য পচনশীল খাবার সংরক্ষণের সুবিধা ও ব্যবহারের পরিকল্পনা অনুযায়ী কেনা ভালো।

৩. বাজারে গিয়ে বাড়তি খরচ কীভাবে এড়াবেন?

আগে থেকে তালিকা তৈরি করুন, বাজেট নির্ধারণ করুন, বিভিন্ন দোকানের দাম তুলনা করুন এবং তালিকার বাইরে কোনো পণ্য কেনার আগে সেটির প্রয়োজনীয়তা যাচাই করুন।

৪. ছাড়ে পণ্য কিনলেই কি টাকা সাশ্রয় হয়?

না। প্রয়োজন নেই এমন পণ্য ছাড়ে কিনলেও মোট খরচ বাড়তে পারে। পণ্যের প্রকৃত দাম, মান এবং সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হবে কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি।

৫. বাজারের খরচের হিসাব কীভাবে রাখবেন?

কেনাকাটার রসিদ সংরক্ষণ করুন অথবা মোবাইলে পণ্যের নাম ও দাম লিখে রাখুন। কয়েক সপ্তাহের হিসাব তুলনা করলে কোন খাতে বেশি খরচ হচ্ছে, তা বোঝা সহজ হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: